শেয়ারবাজারে নজরদারি বাড়াল বিএফআইইউ, মানতে হবে নতুন নিয়ম
শেয়ারবাজারে কার অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে, সেই অর্থের প্রকৃত মালিক কে এবং লেনদেনের ধরন স্বাভাবিক কি না—এসব বিষয়ে এখন থেকে আরও কঠোরভাবে নজর দিতে হবে বাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। অবৈধ অর্থের প্রবেশ ও অর্থপাচার ঠেকানোর লক্ষ্যে এমনই একগুচ্ছ বাধ্যবাধকতা সামনে এনে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জারি করা ‘সার্কুলার নং-৩১’-এ ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, পোর্টফোলিও ম্যানেজারসহ শেয়ারবাজারের সব মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
শুরুতেই নজরে আসবে গ্রাহকের পরিচয় ও মালিকানা
নতুন গ্রাহকের হিসাব খোলার ক্ষেত্রে শুধু হিসাব খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেই হবে না; পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য নির্ভরযোগ্য নথিপত্রের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট কিংবা জন্মনিবন্ধন সনদের মতো নথি এ কাজে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য ই-কেওয়াইসি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
কোম্পানির ক্ষেত্রে নজর থাকবে মালিকানার প্রকৃত চিত্রের দিকেও। কোনো প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারের মালিক এবং প্রতিষ্ঠানের মূল নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, তাদের প্রকৃত সুবিধাভোগী বা ‘বেনিফিশিয়ারি ওনার’ হিসেবে শনাক্ত করতে হবে। তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণও বাধ্যতামূলক।
অর্থাৎ কোম্পানির মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণের আসল তথ্য আড়ালে রেখে লেনদেন করার সুযোগ কমানোর লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লেনদেনে বাড়তি যাচাই
শেয়ারবাজারে লেনদেন করা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি (পিইপি), দেশীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি (আইপি), আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে সাধারণ যাচাইয়ের পাশাপাশি অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ধরনের হিসাব পরিচালনায় ‘এনহ্যান্সড ডিউ ডিলিজেন্স’ বা ইডিডি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। একই ধরনের বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন হবে আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ কিংবা অফশোর কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের ক্ষেত্রেও।
এ ছাড়া কোনো গ্রাহকের সঙ্গে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ অথবা বাংলাদেশ সরকারের তালিকাভুক্ত নিষিদ্ধ কিংবা সন্ত্রাসী সত্তার সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই তৈরি করতে হবে নজরদারি কাঠামো
বিএফআইইউর নির্দেশনায় শুধু গ্রাহক যাচাইয়ের বিষয়টি নয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব পরিপালন কাঠামোকেও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ নীতিমালা প্রণয়ন করে পরিচালনা পর্ষদ অথবা সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন নিতে হবে। এরপর সেই নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রধান কার্যালয়ে চিফ অ্যান্টি মানিলন্ডারিং কমপ্লায়েন্স অফিসারের (ক্যামলকো) নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট (সিসিইউ) রাখতে হবে। শাখা পর্যায়েও আলাদা দায়িত্ব নির্ধারণ করে শাখা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা (বিএএমএলকো) নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
অস্বাভাবিক লেনদেন ধরা পড়লে শুরু হবে পরবর্তী প্রক্রিয়া
লেনদেনের ধরনেও নজরদারি বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো লেনদেন অস্বাভাবিক, জটিল অথবা আর্থিকভাবে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে হলে বিষয়টি আটকে না রেখে শাখা পরিপালন কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিটকে জানাতে হবে।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পর্যালোচনার পর যদি সেটি সন্দেহজনক লেনদেন হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে ‘গো-এএমএল’ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিএফআইইউতে সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট বা এসটিআর পাঠাতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখার নির্দেশ রয়েছে।
ছয় মাস পরপর নিজেদের ব্যবস্থাও পরীক্ষা করতে হবে
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে নেওয়া ব্যবস্থাগুলো কাগজে-কলমে থাকলেই চলবে না—সেগুলো যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটিও প্রতিষ্ঠানকে যাচাই করতে হবে। এজন্য প্রতি ছয় মাসে স্ব-মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর—এই দুটি মেয়াদ ধরে মূল্যায়ন করতে হবে। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই মূল্যায়নের সারসংক্ষেপ বিএফআইইউতে জমা দিতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগকে স্বাধীনভাবে এসব কার্যক্রম যাচাই করতে হবে।
কর্মী নিয়োগ থেকে নথি সংরক্ষণ—সবখানেই নির্দেশনা
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থার আওতা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ক্ষেত্রেও রাখা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের আগে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করতে হবে। কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে নতুন নির্দেশনায়।
ব্যবসায়িক সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও গ্রাহকের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় লেনদেনের নথি সঙ্গে সঙ্গে বাদ দেওয়া যাবে না। এসব তথ্য ও নথিপত্র কমপক্ষে পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।
শেয়ারবাজারে কী পরিবর্তন আসতে পারে
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নির্দেশনাগুলো কার্যকর হলে শেয়ারবাজারে বেনামে লেনদেন, অবৈধ অর্থের প্রবাহ এবং অর্থপাচারের ঝুঁকি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নজরদারি আরও বাড়বে।
তাদের মতে, গ্রাহক কে—এটি জানার পাশাপাশি অর্থের প্রকৃত মালিকানা এবং লেনদেনে ব্যবহৃত অর্থের উৎস যাচাইয়ের ওপরও আরও বেশি গুরুত্ব তৈরি হবে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- মাত্র দুই দিন শেয়ার কিনলেই শেয়ারপ্রতি ১৮ টাকা বোনাস পাচ্ছে বিনিয়োগকারীরা
- শেয়ারবাজারের সংকট কাটাতে নতুন উদ্যোগ, একগুচ্ছ প্রস্তাব
- কারিগরি ত্রুটি কাটিয়ে ছয় মাস পর উৎপাদনে ফিরল এক কোম্পানি
- সালমান এফ রহমান মুক্ত হচ্ছে শেয়ারবাজার!
- ২১ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় যে ব্যাংক
- শেয়ার বাজারের পতন থামাতে অবকাঠামো সংস্কারের তাগিদ, সিসিপি নিয়ে প্রশ্ন
- দরপতন থামছে না, শীর্ষ ব্রোকারদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে ডিএসই
- ব্রাজিলের পরবর্তী ম্যাচ কবে, জেনে নিন পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি ও প্রতিপক্ষ
- বাংলাদেশ বনাম উত্তর কোরিয়া: গোল বন্যায় শেষ হলো ম্যাচ
- এজিএমে ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্সের নগদ লভ্যাংশ অনুমোদন
- দুর্গাপূজার সরকারি ছুটি ২০২৬: কবে থেকে, কত দিন জানুন এক নজরে
- বিক্রির চাপে ডিএসই, কমেছে প্রধান তিন সূচক
- আবারও বাড়লো তেলের দাম, জানুন নতুন মুল্য তালিকা
- পে-স্কেলের গেজেট কবে প্রকাশ, জানা গেল দিন তারিখ
- আজ বাংলাদেশে ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে কত জেনে নিন