ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Md Razib Ali

Senior Reporter

সৌদিতে পরিবার নিয়ে থাকতে মাসে কত টাকা লাগে?

প্রবাসী ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৮ ২১:৩৬:৪৯
সৌদিতে পরিবার নিয়ে থাকতে মাসে কত টাকা লাগে?

সৌদি আরবে পরিবার নিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত শুধু মাসিক আয়ের হিসাব দিয়ে নেওয়া যায় না। স্বামী, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে রিয়াদে বসবাসের ক্ষেত্রে ডিপেন্ডেন্ট ফি, বাসা, স্কুল, যাতায়াত ও স্বাস্থ্যবিমার মতো খরচ যুক্ত হওয়ার পর মাসিক ব্যয়ই দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার রিয়াল। এর বাইরে খাবার, বিদ্যুৎ-পানি, গাড়ি বা যাতায়াত এবং বছরে একবার দেশে যাওয়ার বিমানভাড়ার হিসাব রয়েছে।

তবে পরিবার নিয়ে সৌদিতে দীর্ঘমেয়াদে থাকার পরিকল্পনায় শুধু খরচ জানলেই হবে না। এর সঙ্গে যুক্ত আছে বৈধ আবাসন বা ইকামার অবস্থান, চাকরির ওপর নির্ভরশীলতা, নিজের ব্যবসা করার সুযোগ, ভবিষ্যতের সঞ্চয় এবং পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ফলে পরিবার আনার আগে আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি লিগ্যাল স্ট্যাটাস ও ভবিষ্যৎ আয়ের পথও পরিষ্কার করা জরুরি।

পরিবার নিয়ে রিয়াদে থাকলে মাসে কত খরচ

একটি সাধারণ পরিবারের উদাহরণ ধরা হয়েছে—স্বামী, স্ত্রী ও দুই সন্তান। তাঁরা থাকবেন রিয়াদে। এই পরিবারকে কেন্দ্র করে প্রাথমিক কয়েকটি বড় ব্যয়ের হিসাব করলে মোট অঙ্কটি সহজেই ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার রিয়ালের মধ্যে চলে যায়।

এর মধ্যে সবচেয়ে আগে আসে ডিপেন্ডেন্ট ফি। প্রত্যেক ডিপেন্ডেন্টের জন্য মাসে ৪০০ রিয়াল হিসেবে স্ত্রী ও দুই সন্তানের ক্ষেত্রে তিনজনের জন্য মোট ১ হাজার ২০০ রিয়াল প্রয়োজন হবে। বছরে এই খরচ দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৪০০ রিয়াল।

এরপর বাসার খরচ। একা থাকলে শেয়ারড রুমে থাকার সুযোগ থাকলেও পরিবার নিয়ে থাকার ক্ষেত্রে সাধারণত আলাদা বাসার প্রয়োজন হয়। রিয়াদের তুলনামূলক কম দামের এলাকায় দুই বেডরুমের একটি ফ্ল্যাটের বার্ষিক ভাড়া মোটামুটি ৩০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার রিয়াল। মাসিক হিসাবে তা প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার রিয়াল। উত্তর রিয়াদের ভালো এলাকায় ভাড়া আরও বেশি হতে পারে। আবার দাম্মামের মতো শহর বা শহরের বাইরের দিকে অনেক সময় তুলনামূলক কম খরচে বাসা পাওয়া যায়।

আরেকটি বিষয় হলো ভাড়া পরিশোধের ধরন। অনেক বাড়িওয়ালা মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া না নিয়ে ছয় মাস বা এক বছরের অর্থ একসঙ্গে চান।

রিয়াদে ভাড়াটিয়াদের জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পাঁচ বছরের জন্য ভাড়া বাড়ানো বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান ভাড়াটিয়ার ভাড়া বাড়িওয়ালা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়াতে পারবেন না।

সন্তানদের পড়াশোনায় ব্যয়ের পার্থক্য অনেক

পরিবার নিয়ে সৌদিতে বসবাসের ক্ষেত্রে বড় খরচের আরেকটি জায়গা সন্তানের শিক্ষা। স্কুলের ধরন অনুযায়ী এই ব্যয়ের ব্যবধান অনেক বেশি।

রিয়াদের অনেক কমিউনিটি স্কুলে বছরে টিউশন ফি মোটামুটি ৪ হাজার থেকে ১২ হাজার রিয়াল। তবে স্কুলভেদে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে ব্রিটিশ বা আমেরিকান কারিকুলামের ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বার্ষিক ফি ৩৫ হাজার রিয়াল থেকে শুরু হয়ে লাখ রিয়াল ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এর সঙ্গে রয়েছে স্কুল বাসের খরচ। রিয়াদের একটি কমিউনিটি স্কুলের যাওয়া-আসার বাসের মাসিক খরচ ২৬০ রিয়াল। ভর্তি হওয়ার সময় অ্যাডমিশন ফি ও ডেভেলপমেন্ট ফিও আলাদাভাবে দিতে হয়।

দুই সন্তান কমিউনিটি স্কুলে পড়লে টিউশন ও বাস মিলিয়ে মাসিক ব্যয় মোটামুটি ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ রিয়াল হতে পারে।

স্বাস্থ্যবিমার বিষয়টিও আগে নিশ্চিত করা দরকার

সৌদিতে ইকামা নবায়নের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরিবারের স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় সব চাকরিদাতা বহন করে না। কোনো কোম্পানি পরিবারের জন্য ইনস্যুরেন্স দেয়, আবার কোনো কোম্পানি দেয় না।

তাই চাকরির চুক্তিতে পরিবারের স্বাস্থ্যবিমার বিষয়টি লিখিতভাবে আছে কি না, আগে দেখে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। নিজে ইনস্যুরেন্স কিনলে বেসিক প্ল্যানে জনপ্রতি বছরে মোটামুটি ৬০০ থেকে ১ হাজার ২০০ রিয়াল খরচ হতে পারে। ভালো হাসপাতাল নেটওয়ার্কের প্ল্যান হলে খরচ কয়েক গুণ বাড়তে পারে।

তিনজনের বেসিক ইনস্যুরেন্সের হিসাব ধরলে মাসে প্রায় ১৫০ থেকে ৩০০ রিয়াল ব্যয় হতে পারে। নিজের কোম্পানি থাকলে নিজের ও পরিবারের সবার ইনস্যুরেন্সের খরচ নিজেকেই বহন করতে হবে।

প্রাথমিক খরচের বাইরে আরও যে ব্যয় আছে

ডিপেন্ডেন্ট ফি, বাসা, সন্তানদের স্কুল ও বাস এবং ইনস্যুরেন্স—এই চারটি খাত ধরেই মাসে প্রায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার রিয়ালের হিসাব পাওয়া যায়। কিন্তু এই অঙ্কের মধ্যে দৈনন্দিন সংসারের আরও কয়েকটি বড় খরচ ধরা হয়নি।

খাবার, বিদ্যুৎ-পানি, গাড়ি বা যাতায়াত এবং বছরে একবার দেশে যাওয়ার টিকিট এই হিসাবের বাইরে। বিশেষ করে গরমের মাসে এসি ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেড়ে যেতে পারে। এসব ব্যয় যোগ হলে পরিবারের প্রকৃত মাসিক খরচ আরও বাড়বে।

পরিবার আনার আগে ইকামার ভবিষ্যৎ বুঝতে হবে

সৌদিতে দীর্ঘদিন পরিবার নিয়ে থাকার পরিকল্পনায় আর্থিক হিসাবের পাশাপাশি একটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ—বর্তমান ইকামা কীভাবে নবায়ন হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত কার হাতে?

নিজের ইকামার এক্সপায়ারি ডেট জানা এবং সেটি ভবিষ্যতে নবায়নের নিশ্চয়তা কোথা থেকে আসবে, তা বোঝা জরুরি। কারণ বাসা ভাড়া, সন্তানের স্কুলে ভর্তি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, স্বাস্থ্যবিমা ও মোবাইল সিম—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ইকামা প্রয়োজন হয়।

তাই পরিবার নিয়ে থাকার পরিকল্পনায় প্রথম বিবেচনা শুধু মাসিক আয় নয়; বৈধভাবে সৌদিতে থাকার অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ।

সৌদিতে দীর্ঘমেয়াদি থাকার তিন পথ

দীর্ঘমেয়াদে সৌদিতে থাকার ক্ষেত্রে লেখাটিতে তিনটি সম্ভাব্য পথ তুলে ধরা হয়েছে—চাকরি, নিজের কোম্পানি এবং প্রিমিয়াম রেসিডেন্সি।

চাকরির ইকামা সবচেয়ে পরিচিত পথ। বহু মানুষ বছরের পর বছর এই ব্যবস্থায় থাকছেন। তবে এই ক্ষেত্রে বসবাসের ধারাবাহিকতা চাকরির সঙ্গে যুক্ত। কোম্পানি বন্ধ হওয়া, প্রজেক্ট শেষ হওয়া বা ম্যানেজমেন্ট পরিবর্তনের মতো পরিস্থিতিতে চাকরির পাশাপাশি থাকার বিষয়টিও সামনে চলে আসে। পরিবার আনার সুযোগও অনেক সময় পেশা ও বেতনের ওপর নির্ভর করে।

এই ব্যবস্থায় নিজের দক্ষতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা হিসেবে ধরা হয়েছে। কারণ চাকরির সঙ্গে যুক্ত থাকার অবস্থান ধরে রাখতে স্কিলের গুরুত্ব রয়েছে।

নিজের কোম্পানি করলে দায়িত্বও নিজের

দ্বিতীয় পথ হিসেবে নিজের কোম্পানি করার বিষয়টি এসেছে। লেখাটিতে বলা হয়েছে, একজন বিদেশি MISA লাইসেন্স নিয়ে সৌদিতে শতভাগ নিজের মালিকানায় কোম্পানি খুলতে পারেন এবং এর জন্য কোনো সৌদি পার্টনার প্রয়োজন হয় না।

এক্ষেত্রে নিজের কোম্পানির মালিক হিসেবে থাকা সম্ভব হলেও এর সঙ্গে ব্যবসায়িক দায়িত্বও যুক্ত। লাইসেন্স নবায়ন, অ্যাকাউন্টস, VAT, কর্মী এবং কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলো সামলাতে হয়।

ভুল লাইসেন্স দিয়ে ব্যবসা শুরু করলে যে প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তার ভিত্তি হওয়ার কথা, সেটিই পরে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রিমিয়াম রেসিডেন্সি সবার জন্য একই পথ নয়

তৃতীয় পথ হিসেবে প্রিমিয়াম রেসিডেন্সির কথা বলা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় কোনো কফিল লাগে না। তবে এটি মূলত বড় ইনভেস্টর, হাই-স্কিলড প্রফেশনাল ও বিশেষ ট্যালেন্টদের জন্য বিবেচিত পথ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

তাই সবার বর্তমান অবস্থার সঙ্গে এই পথ সরাসরি মিলবে এমন নয়। কারও জন্য এটি ভবিষ্যতের লক্ষ্য হতে পারে।

চাকরি থেকে ব্যবসায় যাওয়ার পরিকল্পনাও হতে পারে

সৌদিতে দীর্ঘমেয়াদি থাকার জন্য সবার একই পথ বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের স্কিল, সেভিংস, ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা এবং পরিবার কখন আসবে—এসবের ওপর পরিকল্পনা নির্ভর করতে পারে।

অনেকে চাকরি দিয়ে শুরু করে পরে স্কিল ও সেভিংস তৈরি করেন, বাজার বোঝেন এবং এরপর নিজের কোম্পানি করার দিকে এগোন। এই পরিবর্তন ধাপে ধাপে করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

পরিবার আনার আগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি

পরিবারকে সঙ্গে নেওয়ার পর লিগ্যাল স্ট্যাটাস বা আয়ের পথ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ কমে যায়। একা থাকলে কোনো ব্যবসায় ভুল হলে সেটি বন্ধ করে আবার শুরু করার সুযোগ তুলনামূলক বেশি থাকে। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে একই পরিস্থিতিতে বাসাভাড়া, স্কুল, খাবার, স্বাস্থ্যসেবা ও দৈনন্দিন ব্যয়ের মতো দায়িত্বও যুক্ত থাকে।

এ কারণে পরিবার নিয়ে সৌদিতে বসবাসের পরিকল্পনা শুধু আবাসনের সিদ্ধান্ত নয়; এটি বড় একটি আর্থিক পরিকল্পনার বিষয় হিসেবেও উঠে এসেছে।

শুধু আজকের আয় নয়, দেখতে হবে আগামী দশ বছর

দীর্ঘমেয়াদে সৌদিতে থাকতে চাইলে ভবিষ্যৎ নিয়েও কয়েকটি প্রশ্ন বিবেচনায় রাখতে বলা হয়েছে। সন্তানের শিক্ষা কোথায় হবে, ক্যারিয়ার কোন দিকে যাবে, ব্যবসা কতটা স্থিতিশীল, সেভিংস ও ইনভেস্টমেন্ট কত, লিগ্যাল রেসিডেন্সির পথ কী এবং অবসরের পরিকল্পনা কী—এসব বিষয় আগেই ভাবতে হবে।

এই পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে স্কিল, স্থায়ী আয়, পরিষ্কার আর্থিক পরিকল্পনা, বৈধ অবস্থান এবং ধীরে ধীরে মূলধন তৈরির কথা বলা হয়েছে। এরপর ইনভেস্টমেন্ট ও ব্যবসার দিকে এগিয়ে পরিবার নিয়ে আসার পরিকল্পনা করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তব হিসাবও জরুরি

সৌদিতে পরিবার নিয়ে থাকা, সন্তানদের বড় করা, নিজের ব্যবসা তৈরি করা কিংবা নতুন পরিচয় গড়ে তোলার স্বপ্ন থাকতে পারে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আগে প্রয়োজন প্রস্তুতি।

লেখাটির মূল বার্তা হলো—শুধু আয় নয়, স্কিল, সঞ্চয়, পরিকল্পনা, লিগ্যাল স্ট্যাটাস এবং ধৈর্যকে একসঙ্গে বিবেচনা করেই পরিবার নিয়ে নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ একা নতুন কোনো পরিকল্পনা পরীক্ষা করা আর পরিবারকে নিয়ে একই সিদ্ধান্ত নেওয়া এক নয়।

সৌদিতে জীবন গড়ার পরিকল্পনায় তাই কোথায় থাকা হবে, তার পাশাপাশি কীভাবে সেই জীবন পরিচালনা করা হবে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ