ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

Md Razib Ali

Senior Reporter

জমি কিনছেন? প্রতারণা এড়াতে আগে দেখুন এই কাগজগুলো

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৮ ১৭:০৫:১৪
জমি কিনছেন? প্রতারণা এড়াতে আগে দেখুন এই কাগজগুলো

জমি কেনা অনেকের জীবনের সবচেয়ে বড় আর্থিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি। কিন্তু শুধু জমি দেখে পছন্দ করা, মালিকের কথায় বিশ্বাস করা কিংবা দলিলের কপি হাতে পেয়েই টাকা পরিশোধ করা নিরাপদ পদ্ধতি নয়। জমির মালিকানা, খতিয়ান, দাগ নম্বর, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর, আগের দলিল, দখল, মামলা কিংবা সরকারি অধিগ্রহণের মতো বিষয় যাচাই না করলে ভবিষ্যতে জটিলতায় পড়ার ঝুঁকি থাকে।

বাংলাদেশে জমি কেনার ক্ষেত্রে তাই ‘জমি ভালো লাগছে’—এর চেয়ে ‘জমির কাগজপত্র ঠিক আছে কি না’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি জমি বাস্তবে কার দখলে আছে, রেকর্ডে কার নাম রয়েছে এবং বিক্রেতার আইনগতভাবে সেটি বিক্রি করার অধিকার আছে কি না—এসব বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

জমি কেনার আগে প্রথমেই কী করবেন?

কোনো জমির জন্য বায়না বা বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার আগে জমিটির পূর্ণ পরিচয় সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে থাকবে—

জেলা

উপজেলা/থানা

মৌজা

জে.এল. নম্বর

খতিয়ান নম্বর

দাগ নম্বর

জমির পরিমাণ

জমির শ্রেণি

বর্তমান মালিকের নাম

পূর্ববর্তী মালিকের তথ্য

সর্বশেষ নামজারি বা খারিজের তথ্য

সরকারি ভূমি পোর্টাল জানিয়েছে, ভূমির মালিকানা বা স্বত্বের ইতিবৃত্ত এবং দাগের ইতিহাস অনলাইনে জানার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে অনলাইন তথ্য দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মিলিয়ে দেখা উচিত।

১. বিক্রেতাই প্রকৃত মালিক কি না যাচাই করুন

জমি কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যিনি জমি বিক্রি করছেন, তিনি সত্যিই ওই জমির বৈধ মালিক কি না।

বিক্রেতার কাছ থেকে বর্তমান খতিয়ান, নামজারি খতিয়ান, আগের দলিল এবং মালিকানার ধারাবাহিকতার কাগজ দেখতে হবে। শুধু সর্বশেষ দলিলে বিক্রেতার নাম থাকলেই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। আগের মালিক থেকে বর্তমান মালিক পর্যন্ত মালিকানার ধারাবাহিকতা মিলিয়ে দেখা দরকার।

বিশেষ করে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি হলে বিষয়টি আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ একজন উত্তরাধিকারী একা পুরো জমি বিক্রি করার অধিকারী কি না, তার অংশ কতটুকু—এসব আলাদা করে নিশ্চিত করতে হবে।

২. খতিয়ান ও দাগ নম্বর মিলিয়ে দেখুন

জমির কাগজে থাকা খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও মৌজার তথ্য বাস্তব জমির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি জমির পুরোনো ও নতুন রেকর্ডে তথ্যের পরিবর্তন থাকতে পারে। তাই বিক্রেতার দেওয়া একটি কাগজের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা উচিত।

সরকারি ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় জমির দাগভিত্তিক তথ্য ও মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

৩. সর্বশেষ নামজারি বা খারিজ হয়েছে কি না দেখুন

জমি কেনার আগে বর্তমান বিক্রেতার নামে নামজারি বা খারিজের অবস্থা যাচাই করা জরুরি। নামজারি হচ্ছে রেজিস্ট্রি, উত্তরাধিকার বা অন্য বৈধ হস্তান্তরের পর ভূমি রেকর্ডে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন সিস্টেমে অনলাইনে নামজারি আবেদনের ব্যবস্থা রয়েছে এবং আবেদন ও খতিয়ান-সংক্রান্ত তথ্যের ব্যবস্থাপনাও করা হয়।

তবে নামজারি আছে বলেই জমির মালিকানা নিয়ে অন্য কোনো সমস্যা নেই—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। দলিল ও পূর্ববর্তী মালিকানার ইতিহাসও মিলিয়ে দেখতে হবে।

৪. আগের সব দলিলের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করুন

বর্তমান মালিক কীভাবে জমিটি পেয়েছেন, সেটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমিটি তিনি—

ক্রয় করেছেন,

উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন,

হেবা/দান পেয়েছেন,

বণ্টনের মাধ্যমে পেয়েছেন,

নাকি অন্য কোনো বৈধ উপায়ে পেয়েছেন—

তা জানতে হবে।

প্রয়োজনে পূর্ববর্তী দলিলগুলোর কপি সংগ্রহ করে ধারাবাহিকতা যাচাই করতে হবে। দলিলে থাকা দাগ, খতিয়ান, জমির পরিমাণ ও মালিকের তথ্য পরবর্তী দলিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না দেখতে হবে।

৫. জমির দখল কার হাতে, সেটি সরেজমিনে দেখুন

কাগজপত্র ঠিক থাকার পাশাপাশি বাস্তবে জমিটি কার দখলে আছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জমিতে গিয়ে দেখতে হবে—

বিক্রেতা নিজে দখলে আছেন কি না

অন্য কেউ জমি ব্যবহার করছেন কি না

জমিতে ঘর, দোকান, চাষাবাদ বা অন্য স্থাপনা আছে কি না

জমির সীমানা কোথায়

পাশের জমির মালিকেরা কী বলছেন

জমির রাস্তা বা প্রবেশপথ আছে কি না

বিশেষ করে অন্য কেউ দীর্ঘদিন ধরে জমি ব্যবহার করলে বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে টাকা দেওয়ার আগে আইনজীবীর মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা নিরাপদ।

৬. জমির মাপ ও সীমানা সরেজমিনে যাচাই করুন

দলিলে যতটুকু জমি লেখা আছে, বাস্তবে তার পরিমাণ ও অবস্থান একই কি না তা যাচাই করা দরকার।

প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপিয়ে নিতে পারেন। চারদিকের সীমানা, দাগের অবস্থান এবং দলিলের বিবরণ বাস্তব জমির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।

শুধু বিক্রেতা যে জায়গাটি দেখাচ্ছেন সেটিই দলিলের জমি—এমন ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

৭. ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের তথ্য দেখুন

জমির ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা নিয়মিত পরিশোধ করা হয়েছে কি না, তার দাখিলা যাচাই করা উচিত।

সরকারি ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থায় দাখিলা/খারিজ খতিয়ানের তথ্য ব্যবহার করা হয়। সরকারি FAQ-তে দাখিলাকে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নামজারি ও কেনাবেচাসহ বিভিন্ন কাজে প্রয়োজন হতে পারে।

তবে শুধু খাজনার দাখিলা দেখেই জমির মালিকানা নিশ্চিত করা যাবে না। এটি অন্যান্য মালিকানা ও রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

৮. জমিটি কোনো মামলা বা বিরোধে আছে কি না খোঁজ নিন

জমি কেনার আগে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। জমিটি নিয়ে—

দেওয়ানি মামলা

মালিকানা বিরোধ

বণ্টন বিরোধ

দখল নিয়ে বিরোধ

উত্তরাধিকার বিরোধ

বন্ধক বা অন্য দাবি

আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

প্রয়োজনে স্থানীয় আদালতের নথি, সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের তথ্য এবং আইনজীবীর মাধ্যমে অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

কোনো মামলা আছে কি না নিশ্চিত না হয়ে বড় অঙ্কের টাকা দেওয়া উচিত নয়।

৯. জমি সরকারি অধিগ্রহণের আওতায় আছে কি না দেখুন

কোনো জমি ভবিষ্যৎ সড়ক, সরকারি প্রকল্প বা অন্য কোনো কারণে অধিগ্রহণের প্রক্রিয়ায় আছে কি না—এটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি ভূমি পোর্টালে অধিগ্রহণকৃত জমির তথ্য পাওয়ার সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই জমির অবস্থান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর বা ভূমি অফিসে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত।

১০. জমির শ্রেণি ও ব্যবহার যাচাই করুন

জমিটি কাগজে কী শ্রেণির—তা জানা দরকার। কৃষিজমি, বসতভিটা বা অন্য শ্রেণির জমি হলে ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ক্ষেত্রে আলাদা বিষয় থাকতে পারে।

ক্রেতা যদি বাড়ি, দোকান, কারখানা বা অন্য কোনো স্থাপনা করার উদ্দেশ্যে জমি কেনেন, তাহলে শুধু মালিকানা নয়, ওই জমিতে কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার করা যাবে কি না সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী যাচাই করা উচিত।

১১. রাস্তা ও প্রবেশাধিকারের বিষয়টি আগে দেখুন

অনেক সময় জমির কাগজ ঠিক থাকলেও বাস্তবে জমিতে যাওয়ার উপযুক্ত রাস্তা থাকে না।

তাই জমি কেনার আগে দেখে নিন—

সরকারি রাস্তা আছে কি না

রাস্তার প্রস্থ কত

জমিতে সরাসরি প্রবেশ করা যায় কি না

রাস্তা নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ আছে কি না

দলিলে রাস্তা বা যাতায়াতের অধিকার উল্লেখ আছে কি না

জমি ভবিষ্যতে বাড়ি নির্মাণ বা ব্যবসার কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকলে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

১২. বন্ধক আছে কি না যাচাই করুন

জমি কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য ব্যক্তির কাছে বন্ধক রাখা হয়েছে কি না, সেটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

বিক্রেতা যদি বলেন, ‘সব ঠিক আছে, পরে কাগজ দেব’—শুধু মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে টাকা দেওয়া উচিত নয়।

বন্ধক বা দায় থাকলে সেটি কীভাবে মুক্ত হবে এবং মুক্তির প্রমাণ কী—এসব স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত লেনদেন স্থগিত রাখা নিরাপদ।

১৩. একাধিক মালিক থাকলে সবার অধিকার যাচাই করুন

জমিটি যৌথ মালিকানাধীন হলে শুধু একজন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে পুরো জমি কেনার চেষ্টা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

প্রথমে জানতে হবে—

মোট মালিক কতজন

প্রত্যেকের অংশ কত

নামজারিতে কার কার নাম আছে

উত্তরাধিকারী কারা

বিক্রির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের প্রয়োজনীয় সম্মতি আছে কি না

বিশেষ করে ওয়ারিশি জমিতে এই যাচাই আরও গুরুত্বপূর্ণ।

১৪. শুধু বায়না বা স্ট্যাম্পে লিখে জমির মালিকানা ধরে নেবেন না

বাংলাদেশের Transfer of Property Act, 1882 অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয় নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। একই আইনে বিক্রয়-চুক্তি সম্পর্কে লিখিত ও নিবন্ধনের বিধানও রয়েছে।

অন্যদিকে Registration Act, 1908-এর ১৭A ধারায় স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয়-চুক্তি লিখিত, সম্পাদিত ও নিবন্ধিত হওয়ার বিধান রয়েছে; ২০২৬ সালের সংশোধনের পর এ ধরনের চুক্তি নিবন্ধনের জন্য উপস্থাপনের সময়সীমা ৬০ দিন করা হয়েছে।

তাই স্থানীয় প্রচলিত ধারণা বা শুধু সাদা কাগজে লিখিত সমঝোতার ওপর নির্ভর না করে আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে যথাযথ নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত।

১৫. দলিলে বিক্রেতার পরিচয় ও জমির বিবরণ ভালোভাবে মিলিয়ে নিন

নিবন্ধনের আগে দলিলে থাকা—

বিক্রেতার নাম

পিতা/মাতার নাম

ঠিকানা

জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য

ক্রেতার পরিচয়

জমির মৌজা

খতিয়ান

দাগ

জমির পরিমাণ

সীমানা

মূল্য

ইত্যাদি তথ্য ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।

Registration Act-এর 52A ধারায় স্থাবর সম্পত্তির বিক্রয় দলিল নিবন্ধনের সময় সর্বশেষ খতিয়ানসহ নির্দিষ্ট তথ্য অন্তর্ভুক্ত ও সংযুক্ত করার বিধান রয়েছে।

১৬. টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকুন

জমির কাগজ যাচাই শেষ হওয়ার আগেই পুরো টাকা পরিশোধ না করাই নিরাপদ পদ্ধতি।

যদি অগ্রিম বা বায়নার টাকা দিতে হয়, তাহলে লিখিত ও আইনসম্মত চুক্তিতে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা উচিত—

মোট মূল্য

অগ্রিমের পরিমাণ

বাকি টাকার পরিমাণ

রেজিস্ট্রির সময়

জমির পূর্ণ বিবরণ

কোনো সমস্যা পাওয়া গেলে টাকা ফেরতের শর্ত

কে কোন খরচ বহন করবে

নির্ধারিত সময়ে দলিল না হলে করণীয়

বড় অঙ্কের লেনদেনে সম্ভব হলে ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে অর্থ প্রদানের প্রমাণ সংরক্ষণ করা ভালো।

১৭. একজন অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবী দিয়ে কাগজ পরীক্ষা করান

জমির কাগজ নিজে দেখে সব সমস্যা শনাক্ত করা সবসময় সহজ নয়। বিশেষ করে পুরোনো দলিল, উত্তরাধিকার, অংশীদারি মালিকানা, মামলা, বন্ধক বা একাধিকবার হস্তান্তরের ইতিহাস থাকলে অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবীর মতামত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

আইনজীবীকে শুধু বর্তমান দলিল নয়, মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ডও পরীক্ষা করতে দেওয়া উচিত।

১৮. রেজিস্ট্রির পর নামজারি করতে ভুলবেন না

জমি কেনার পর কাজ শেষ হয়ে যায় না। নিবন্ধনের পর নিজের নামে নামজারি/মিউটেশনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন সিস্টেমে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর মিউটেশনের আবেদন করার প্রক্রিয়া উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া পরবর্তী সময়ে নিজের নামে ভূমি উন্নয়ন করের রেকর্ডও ঠিক আছে কি না নিশ্চিত করা উচিত।

জমি কেনার আগে এই চেকলিস্টটি মিলিয়ে নিন

যাচাইয়ের বিষয়কী নিশ্চিত করবেন
মালিকানা বিক্রেতার বৈধ মালিকানা আছে কি না
খতিয়ান সর্বশেষ খতিয়ান ও তথ্য সঠিক কি না
দাগ দলিল, খতিয়ান ও বাস্তব জমির দাগ একই কি না
নামজারি বিক্রেতার নামে বর্তমান রেকর্ড আছে কি না
দলিল আগের মালিক থেকে বর্তমান মালিক পর্যন্ত ধারাবাহিকতা
দাখিলা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের তথ্য
দখল বাস্তবে জমি কার দখলে
মাপ কাগজের পরিমাণ ও বাস্তব পরিমাণ মিলছে কি না
সীমানা চারদিকের সীমানা ঠিক আছে কি না
মামলা জমি নিয়ে মামলা বা বিরোধ আছে কি না
বন্ধক ব্যাংক বা অন্য কারও কাছে দায় আছে কি না
অধিগ্রহণ সরকারি অধিগ্রহণের আওতায় আছে কি না
রাস্তা বৈধ ও বাস্তব যাতায়াতের পথ আছে কি না
জমির শ্রেণি বর্তমান শ্রেণি ও কাঙ্ক্ষিত ব্যবহার সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না
নিবন্ধন আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে দলিল নিবন্ধন হচ্ছে কি না
পরবর্তী কাজ রেজিস্ট্রির পর নিজের নামে নামজারি ও করের রেকর্ড ঠিক করা

পরবর্তী কাজ রেজিস্ট্রির পর নিজের নামে নামজারি ও করের রেকর্ড ঠিক করা

জমি কেনার সময় সবচেয়ে বড় ভুল হলো দাম ও জায়গা দেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া। জমির মালিকানা, রেকর্ড, দলিল, দখল, মামলা, কর, বন্ধক, অধিগ্রহণ এবং সীমানা—সবকিছু আলাদা করে যাচাই করা প্রয়োজন।

সরকারি ভূমি পোর্টাল নাগরিকদের জন্য অনলাইনে ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা, মালিকানা/স্বত্বের ইতিহাস ও দাগের তথ্য পাওয়ার সুবিধার কথা জানিয়েছে।

তবে কোনো অনলাইন রেকর্ড বা একটি মাত্র কাগজকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে না নিয়ে প্রয়োজনীয় মূল নথি, সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ড এবং বাস্তব দখল মিলিয়ে দেখা উচিত। বিশেষ করে বড় অঙ্কের অর্থ জড়িত থাকলে টাকা দেওয়ার আগে অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবী ও প্রয়োজনে সার্ভেয়ার দিয়ে যাচাই করানোই বাস্তবসম্মত সতর্কতা।

মনে রাখতে হবে, কোনো একটি চেকলিস্ট অনুসরণ করলেই ভবিষ্যতের সব ধরনের বিরোধের ঝুঁকি শূন্য হয়ে যায় না। কিন্তু মালিকানা ও রেকর্ডের ধারাবাহিকতা, দখল, মামলা, দায়, সরকারি রেকর্ড এবং নিবন্ধন—এসব বিষয়ে আগে থেকেই যথাযথ যাচাই করলে প্রতারণা ও ভবিষ্যৎ বিরোধের ঝুঁকি অনেকটাই শনাক্ত করা সম্ভব।

FAQ

১. জমি কেনার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয়টি যাচাই করতে হবে?

প্রথমে বিক্রেতার মালিকানা ও জমি বিক্রির বৈধ অধিকার যাচাই করতে হবে। এরপর খতিয়ান, নামজারি, পূর্ববর্তী দলিল, দাগ, জমির পরিমাণ ও বাস্তব দখল মিলিয়ে দেখা উচিত।

২. শুধু খতিয়ানে বিক্রেতার নাম থাকলেই কি জমি কেনা নিরাপদ?

না। খতিয়ানে নাম থাকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই একমাত্র যাচাই নয়। পূর্ববর্তী দলিল, মালিকানার ধারাবাহিকতা, নামজারি, দখল, মামলা, বন্ধক ও সরকারি রেকর্ডও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

৩. জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা কি মালিকানার প্রমাণ?

দাখিলা গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং জমি কেনাবেচা ও নামজারির মতো কাজে প্রয়োজন হতে পারে। তবে শুধু দাখিলা দেখে মালিকানা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা উচিত নয়; অন্যান্য মালিকানা নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

৪. জমি কেনার পর নামজারি করা কি প্রয়োজন?

রেজিস্ট্রির পর নিজের নামে নামজারি/মিউটেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের মিউটেশন সিস্টেমে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর মিউটেশনের আবেদন প্রক্রিয়া রয়েছে।

৫. জমি কেনার আগে আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া উচিত কি?

জমির মালিকানার ইতিহাস জটিল হলে, একাধিক ওয়ারিশ থাকলে, পুরোনো দলিল থাকলে, মামলা বা বন্ধকের সন্দেহ থাকলে অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবীর মাধ্যমে কাগজপত্র যাচাই করানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আইনের প্রযোজ্য বিধান ও দলিলের বিষয়ও পেশাদারের মাধ্যমে পরীক্ষা করা ভালো।

আল-সাদ/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ