ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকারি চাকরিতে বদলাচ্ছে ৭ নিয়ম, কী পাবেন কর্মীরা?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৮ ২১:০৩:৫৬
সরকারি চাকরিতে বদলাচ্ছে ৭ নিয়ম, কী পাবেন কর্মীরা?

সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে মাস শেষে আসা অর্থের হিসাব নতুন করে বদলে যেতে পারে। কারণ প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬-এ শুধু মূল বেতন বাড়ানোর প্রস্তাবই নেই, বরং ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা, মোবাইল সুবিধা এবং উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা—বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রেই পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বর্তমানে পাওয়া ১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা নতুন বেতন কাঠামো এখন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় আরও এগিয়েছে। এর প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, খসড়ার ভেটিংয়ের অধিকাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে খসড়ার ভাষা, প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য এবং কোনো আইনি অসংগতি রয়েছে কি না, সেসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। ফলে বর্তমানে সামনে থাকা তথ্যগুলো প্রস্তাবিত কাঠামোর চিত্র দিলেও চূড়ান্ত নিয়ম জানতে সরকারি প্রজ্ঞাপন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

বেতনের অঙ্কে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব

নতুন কাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে মূল বেতনে। বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতন বাড়ানোর হার ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

কিছু গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতনের হিসাব দেখলেই পরিবর্তনের পরিমাণ বোঝা যায়। নবম গ্রেডে শুরুতে ২২ হাজার টাকার পরিবর্তে ৪৪ হাজার টাকা, দশম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকার পরিবর্তে ৩২ হাজার টাকা এবং দ্বাদশ গ্রেডে ১১ হাজার টাকার জায়গায় ২২ হাজার টাকা করার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। এই গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার তথ্য এসেছে।

তবে বাড়তি বেতন পুরোটা একসঙ্গে কার্যকর হবে না। প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় নির্ধারিত অংশ কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

এক নিয়মে নয়, গ্রেড অনুযায়ী হবে ইনক্রিমেন্ট

মূল বেতন বাড়লেও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের চিত্র সবার জন্য এক থাকবে না। বর্তমানে সব গ্রেডে মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়।

নতুন ব্যবস্থায় গ্রেডের ওপর ভিত্তি করে এই হার আলাদা করার প্রস্তাব রয়েছে। ২০তম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল থাকতে পারে। পঞ্চম গ্রেডে হার হতে পারে ৪ শতাংশ।

এর পরের গ্রেডগুলোতে হার আরও কমার প্রস্তাব রয়েছে। চতুর্থ ও তৃতীয় গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ উচ্চতর গ্রেডে মূল বেতনের অঙ্ক বড় হলেও প্রতিবছর বেতন বৃদ্ধির শতাংশ বর্তমান ব্যবস্থার তুলনায় কম হতে পারে।

বাড়িভাড়ার শতাংশ কমবে, কিন্তু টাকার অঙ্ক বাড়তে পারে

বেতন কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাড়িভাড়া ভাতা। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া দেওয়া হয়।

প্রস্তাবিত কাঠামোয় এই হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার তথ্য রয়েছে। ঢাকা সিটির বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকার বাড়িভাড়ার হারেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

তবে শতাংশ কমে যাওয়াকে সরাসরি ভাতা কমে যাওয়া হিসেবে দেখলে হিসাবটি অসম্পূর্ণ হবে। কারণ নতুন কাঠামোয় মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে কম শতাংশে হিসাব হলেও নতুন মূল বেতনের ভিত্তিতে অনেক ক্ষেত্রে বাড়িভাড়া হিসেবে পাওয়া প্রকৃত টাকার পরিমাণ আগের চেয়ে বেশি হতে পারে।

চিকিৎসা ভাতায় বয়সভেদে আলাদা অঙ্ক

চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন নয়; বয়স অনুযায়ী আলাদা অঙ্ক নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে।

৫০ বছর পর্যন্ত বয়সীদের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা, ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের ৪ হাজার টাকা, ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়ার তথ্য রয়েছে।

শুধু চাকরিজীবীর চিকিৎসা সুবিধাই নয়, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্যও নতুন ভাতার প্রস্তাব এসেছে। এ ক্ষেত্রে মাসে ৩ হাজার টাকা করে দেওয়া হতে পারে। সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য এই সুবিধা প্রযোজ্য হওয়ার তথ্য রয়েছে।

কয়েকটি ভাতায়ও বাড়তে পারে টাকা

নতুন কাঠামোয় মূল বেতনের বাইরের কিছু ভাতার অঙ্কও পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী—

যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা হতে পারে।

টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা হতে পারে।

ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার কথা রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে মোবাইল ভাতা। নতুন পে-স্কেলে সব গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য এই সুবিধা চালুর উদ্যোগের তথ্য সামনে এসেছে।

প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের জন্য মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য মাসে ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

উচ্চতর গ্রেডের অপেক্ষা কমানোর প্রস্তাব

শুধু মাসিক বেতন বা ভাতায় নয়, পদোন্নতির সঙ্গে সম্পর্কিত সুবিধার সময়সীমাতেও পরিবর্তন আনার প্রস্তাব রয়েছে।

বর্তমানে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে ১০ বছরের সময়সীমা রয়েছে। নতুন কাঠামোয় সেটি কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাবের কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এই পরিবর্তন কার্যকর হলে একই গ্রেডে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ আগের চেয়ে দুই বছর আগে আসতে পারে। তবে কোন পদে এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, কী শর্ত থাকবে এবং বাস্তবে কী পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে—সেটি চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনেই পরিষ্কার হবে।

১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা থাকছে না?

নতুন বেতন কাঠামোর হিসাব করতে গিয়ে বর্তমান একটি সুবিধার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, পে-স্কেল কার্যকর হলে বর্তমানে চালু থাকা ১০ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা বা বিশেষ সুবিধা বাতিল হতে পারে।

এই সুবিধা ২০২৪ সালে চালু হয়েছিল। পরে তা মূল বেতনের ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়।

ফলে নতুন মূল বেতন কত বাড়ছে, শুধু সেটি দেখলে চাকরিজীবীর প্রকৃত আর্থিক পরিবর্তন বোঝা যাবে না। নতুন বেতনের সঙ্গে নতুন ও পরিবর্তিত ভাতাগুলো যোগ করার পাশাপাশি বর্তমান ১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা বাদ যাওয়ার বিষয়টিও হিসাব করতে হবে।

পুরো বেতন এক ধাপে মিলবে না

প্রস্তাবিত পে-স্কেলের আর্থিক সুবিধা কার্যকর করার পদ্ধতিতেও পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

প্রথম থেকে নবম গ্রেডের জন্য জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম ধাপে বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ কার্যকর হতে পারে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৩০ শতাংশ এবং তৃতীয় পর্যায়ে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ কার্যকর করার তথ্য রয়েছে।

দশম থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রে ধাপের অনুপাত আলাদা। প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৫ শতাংশ এবং শেষ ধাপে বাকি ২৫ শতাংশ কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে।

বাড়িভাড়া ও বিভিন্ন ভাতার পূর্ণাঙ্গ সুবিধাও পর্যায়ক্রমে কার্যকর করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

সাত পরিবর্তনের সারকথা

প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একই সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সামনে আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মূল বেতন বৃদ্ধি, গ্রেডভেদে নতুন ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া ভাতার কাঠামো পরিবর্তন, বয়স অনুযায়ী চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত-টিফিন-ধোলাই ও মোবাইল ভাতায় পরিবর্তন, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়সীমা কমানো এবং ১০ শতাংশ বিশেষ সুবিধা বাতিলের সম্ভাবনা।

তবে এসব পরিবর্তনের কোনটি কী শর্তে এবং ঠিক কীভাবে কার্যকর হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত নয়। খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে। তাই প্রস্তাবিত হিসাব ও নিয়মের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিশ্চিত হবে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পর।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ