ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

Md Razib Ali

Senior Reporter

আইপিওর অর্থে অনিয়ম, ডমিনেজ স্টিলের ৭ জনকে জরিমানা বিএসইসির

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৭ ১০:৫১:২২
আইপিওর অর্থে অনিয়ম, ডমিনেজ স্টিলের ৭ জনকে জরিমানা বিএসইসির

আইপিও থেকে তোলা অর্থের ব্যবহার নিয়ে তদন্তে একাধিক অনিয়মের তথ্য পাওয়ার পর ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস লিমিটেডের পাঁচ পরিচালক ও সাবেক দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সাতজনের ওপর আরোপ করা হয়েছে মোট ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা। এর মধ্যে পাঁচ পরিচালককে পৃথকভাবে ১ কোটি টাকা এবং সাবেক দুই কর্মকর্তাকে ৫ লাখ টাকা করে দিতে হবে।

কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে আইপিওর অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম, বিনিয়োগকারীদের কাছে তথ্য গোপন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা। বিএসইসির পরিদর্শন ও তদন্তে এসব বিষয় উঠে এসেছে।

অনুমোদন ছাড়াই কেনা হয় ১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকার ড্রেজার

ডমিনেজ স্টিলের আইপিও অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে বিষয়টি তদন্তে এসেছে, তার একটি হলো ড্রেজার কেনা। ‘সিএসডি ডমিনেজ-৩’ নামের ড্রেজারটি ২০২১ সালে ১৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনে কোম্পানিটি।

কিন্তু এই কেনাকাটার আগে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে বিএসইসির তদন্তে উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ড্রেজারটি কোনো ব্যবসায়িক আয় করতে পারেনি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেনার পর সেটিকে কোনো ব্যবসায়িক কাজেও ব্যবহার করা হয়নি।

ড্রেজারটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেও তদন্তে অসঙ্গতি পাওয়া যায়। ডমিনেজ স্টিলের নথিতে প্রস্তুতকারক হিসেবে সুন্দরবন শিপবিল্ডার্সের নাম ছিল। তবে সুন্দরবন শিপবিল্ডার্স লিখিতভাবে বিএসইসিকে জানিয়েছে, ড্রেজারটি তারা তৈরি করেনি। ফলে কোম্পানির নথিতে উল্লেখ করা প্রস্তুতকারকের তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

৩০ কোটি টাকা তুলেছিল ডমিনেজ স্টিল

২০২০ সালে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে ডমিনেজ স্টিল। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের ৩ কোটি শেয়ার ইস্যু করে এই অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল।

কোম্পানির প্রসপেক্টাসে আইপিও থেকে পাওয়া অর্থ ব্যয়ের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি খাত নির্ধারণ করা ছিল। এর মধ্যে ছিল ভবন নির্মাণ, ইলেকট্রিক্যাল ইনস্টলেশন, প্ল্যান্ট ও মেশিনারিজ কেনা এবং আইপিও-সংক্রান্ত খরচ।

বিএসইসির তদন্তে অবশ্য দেখা গেছে, নির্ধারিত খাতের বাইরে অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

জাল স্বাক্ষর ও প্রক্সি ভোটের অভিযোগ

তদন্ত প্রতিবেদনে অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। বিএসইসির ভাষ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ না করে এবং জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করে প্রক্সি ভোট সংগ্রহের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

অর্থাৎ আইপিওর অর্থ কোন খাতে ব্যবহার করা হবে, সেই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন পাওয়ার প্রক্রিয়াটিই তদন্তের আওতায় আসে।

বন্ধ ছিল আশুলিয়া ও পলাশের কারখানা

কোম্পানিটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অবস্থাও তদন্তে পর্যালোচনা করা হয়। এতে সাভারের আশুলিয়া এবং নরসিংদীর পলাশে থাকা ডমিনেজ স্টিলের দুটি কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া যায়।

বিএসইসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানা দুটি বন্ধ থাকার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জানানো হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতে, এ ধরনের তথ্য মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের বিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এ ছাড়া আশুলিয়ার কারখানার শেড সম্প্রসারণের নির্মাণ ব্যয় নিয়েও তদন্তে অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্মাণ ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখিয়ে আইপিওর অর্থ থেকে প্রায় ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

পাঁচ পরিচালক ও দুই সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তি

বিএসইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডমিনেজ স্টিলের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামসুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, পরিচালক সুজিত সাহা, পরিচালক রকিবুল ইসলাম এবং পরিচালক আবুল কালাম ভূঁইয়ার প্রত্যেককে ১ কোটি টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

অন্যদিকে কোম্পানিটির সাবেক প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. জিল্লুর রহমান এবং সাবেক কোম্পানি সচিব মো. জামির হোসেন চৌধুরীর প্রত্যেকের ওপর আরোপ করা হয়েছে ৫ লাখ টাকা জরিমানা।

বিএসইসির আদেশে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্টদের ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানার টাকা ব্যাংক ড্রাফট অথবা পে-অর্ডারের মাধ্যমে কমিশনে জমা দিতে হবে।

সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৬১.৭০ শতাংশ শেয়ার

ডমিনেজ স্টিলের পরিশোধিত মূলধন ১০২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। মোট শেয়ারের সংখ্যা ১০ কোটি ২৬ লাখ।

২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মালিকানার হিসাবে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে কোম্পানিটির ৩০ দশমিক ২০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মালিকানায় ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে দশমিক ০২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। সবচেয়ে বড় অংশ, ৬১ দশমিক ৭০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

বিএসইসির তদন্তে পাওয়া অনিয়মের ভিত্তিতেই কোম্পানিটির সংশ্লিষ্ট পাঁচ পরিচালক ও সাবেক দুই কর্মকর্তার ওপর মোট ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ