ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Md Razib Ali

Senior Reporter

টাকা-পয়সার অভাব কাটাতে কী আমল করবেন, জানুন ইসলামের নির্দেশ

ধর্ম ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২১ ১৯:০০:৪৯
টাকা-পয়সার অভাব কাটাতে কী আমল করবেন, জানুন ইসলামের নির্দেশ

দ্রুত ধনী হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দোয়া পড়লেই নির্দিষ্ট সময়ে বিপুল অর্থ-সম্পদ পাওয়া যাবে—কোরআন বা সহিহ হাদিসে এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে ইসলাম রিজিক, স্বচ্ছলতা ও অভাব দূর হওয়ার জন্য কিছু দোয়া ও আমলের শিক্ষা দিয়েছে। একই সঙ্গে হালাল উপার্জন, তাকওয়া, ইস্তিগফার, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং সৎকাজকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু অর্থ বেশি হওয়াই সফলতার মাপকাঠি নয়; বরং হালাল ও বরকতময় রিজিক চাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন-হাদিসে রিজিকের জন্য যেসব দোয়া ও আমলের কথা এসেছে, সেগুলো নিয়মিত পালন করা যেতে পারে।

রিজিকের জন্য কোরআনের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া

১. হজরত মুসা (আ.)-এর দোয়া

কোরআনে হজরত মুসা (আ.)-এর একটি দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে। মিসরে পালিয়ে যাওয়ার পর তিনি যখন মাদইয়ানে পৌঁছান, তখন নিজের প্রয়োজন ও আল্লাহর দেওয়া কল্যাণের প্রতি মুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করে বলেন—

رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ

উচ্চারণ: ‘রব্বি ইন্নি লিমা আনজালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকির।’

অর্থ: ‘হে আমার রব, আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবেন, আমি অবশ্যই তার মুখাপেক্ষী।’

এটি সূরা আল-কাসাসের ২৪ নম্বর আয়াত। আয়াতটির মূল বক্তব্য হলো—মানুষ তার প্রয়োজন ও অভাব নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে এবং তাঁর কাছ থেকেই কল্যাণ চাইবে।

রিজিক ও স্বচ্ছলতার জন্য এই দোয়াটি করা যেতে পারে। তবে এটিকে এমন কোনো ‘দ্রুত ধনী হওয়ার ফর্মুলা’ হিসেবে দেখা ঠিক নয়, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ পাওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে।

২. ইস্তিগফার ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া

রিজিক বৃদ্ধির সঙ্গে ইস্তিগফারের সম্পর্ক কোরআনে বিশেষভাবে এসেছে। সূরা নুহতে হজরত নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন। এরপর বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান, বাগান ও নদীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কোরআনের ভাষায়, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার পর তিনি আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং সম্পদ ও সন্তান দিয়ে সাহায্য করবেন—এমন বক্তব্য রয়েছে।

তাই নিয়মিত ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা একজন মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমল। তবে ইস্তিগফারকে শুধু অর্থ পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে না দেখে গুনাহ থেকে ফিরে আসা ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার ইবাদত হিসেবেই পালন করা উচিত।

৩. ফজরের নামাজের পর রিজিকের দোয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি দোয়া হাদিসে এসেছে, যা তিনি ফজরের নামাজের পর পড়তেন। সেখানে তিনটি বিষয় চাওয়া হয়েছে—উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল।

দোয়াটি হলো—

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআন, ওয়া রিজকান তইয়্যিবান, ওয়া আমালান মুতাকাব্বালান।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল চাই।’

সুনান ইবনে মাজাহর ৯২৫ নম্বর হাদিসে উম্মে সালামা (রা.) থেকে এই দোয়ার বর্ণনা রয়েছে। হাদিসটির গ্রেড সেখানে সহিহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

লক্ষ করার বিষয় হলো, দোয়াটিতে শুধু অর্থ চাওয়া হয়নি; বরং উপকারী জ্ঞান ও কবুলযোগ্য আমলও চাওয়া হয়েছে। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে রিজিকের পাশাপাশি সঠিক জ্ঞান ও নেক আমলের গুরুত্বও তাই স্পষ্ট।

৪. হালাল উপার্জনের জন্য বিশেষ দোয়া

ঋণ, আর্থিক সংকট ও হালাল উপার্জনের ক্ষেত্রে একটি বহুল আলোচিত দোয়া রয়েছে—

اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ

উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিক, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আপনার হালাল দ্বারা আমাকে আপনার হারাম থেকে বাঁচিয়ে যথেষ্ট করে দিন এবং আপনার অনুগ্রহে আপনি ছাড়া অন্য সবার থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দিন।’

জামি‘ আত-তিরমিজি ৩৫৬৩ নম্বর হাদিসে হজরত আলী (রা.) থেকে এই দোয়াটি বর্ণিত হয়েছে। সেখানে ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান গরিব বলেছেন।

এই দোয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখানে শুধু সম্পদ চাওয়া হয়নি; বরং হারাম থেকে বেঁচে হালালের মাধ্যমে স্বচ্ছলতা চাওয়া হয়েছে।

৫. আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল

রিজিকের ক্ষেত্রে কোরআন আল্লাহর ওপর ভরসা করার কথাও বলেছে। সূরা আত-তালাকের ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। একই আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর কাজ সম্পন্ন করেন এবং সবকিছুর জন্য একটি নির্ধারিত পরিমাণ রেখেছেন।

এর অর্থ এই নয় যে মানুষ কাজকর্ম ছেড়ে শুধু দোয়া করবে। বরং একজন মুসলিম আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বৈধ ও হালাল উপায়ে চেষ্টা করবে এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে।

৬. দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দোয়া

কোরআনের অন্যতম পরিচিত দোয়া হলো—

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ: ‘রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাঁও ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়া কিনা আজাবান নার।’

অর্থ: ‘হে আমাদের রব, আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।’

এটি সূরা আল-বাকারার ২০১ নম্বর আয়াতের দোয়া।

এখানে ‘দুনিয়ার কল্যাণ’ চাওয়া হয়েছে। তাই আর্থিক স্বচ্ছলতা, শান্তি, নিরাপত্তা ও অন্যান্য বৈধ কল্যাণের জন্যও একজন মুসলিম আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারেন।

শুধু দোয়া নয়, হালাল উপার্জনের চেষ্টাও জরুরি

কোরআন-হাদিসের আলোচনায় রিজিককে শুধু মুখে দোয়া পড়ার বিষয় হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ইসলাম হালাল-হারামের সীমা মেনে চলা, আল্লাহকে ভয় করা, সৎ থাকা এবং বৈধ পথে উপার্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

তাই রিজিকের জন্য দোয়া করার পাশাপাশি নিজের পেশা বা ব্যবসায় সততা বজায় রাখা, প্রতারণা ও হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকা এবং বৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করা জরুরি।

বিশেষ করে ‘একটি দোয়া পড়লেই কয়েক দিনে লাখপতি বা কোটিপতি হওয়া যাবে’—এ ধরনের দাবির ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোরআন বা সহিহ হাদিসের নামে এমন নির্দিষ্ট আর্থিক নিশ্চয়তা দেওয়া হলে তার দলিল যাচাই করা উচিত।

রিজিক বাড়ানোর আমল কীভাবে করবেন?

একটি সহজ আমল-রুটিন হতে পারে—

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসম্ভব সময়মতো আদায় করা।

নিয়মিত ইস্তিগফার ও তওবা করা।

ফজরের নামাজের পর উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক ও কবুল আমলের দোয়া পড়া।

হালাল উপার্জনের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা।

হজরত মুসা (আ.)-এর ‘রব্বি ইন্নি লিমা আনজালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকির’ দোয়াটি করা।

হারাম উপার্জন, প্রতারণা ও অন্যের অধিকার নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা।

নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বৈধ কাজে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

সম্পদের পাশাপাশি দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ চাওয়া।

‘দ্রুত ধনী’ হওয়ার বদলে ‘বরকতময় রিজিক’ চাওয়াই মূল শিক্ষা

কোরআন-হাদিসে এমন কোনো আমলকে নির্দিষ্টভাবে ‘দ্রুত ধনী হওয়ার আমল’ বলা হয়নি, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পদশালী হওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। বরং ইসলাম মানুষকে আল্লাহর কাছে রিজিক ও কল্যাণ চাইতে, ক্ষমা প্রার্থনা করতে, হালাল পথে উপার্জন করতে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শিক্ষা দিয়েছে।

তাই দোয়ার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শুধু বেশি টাকা পাওয়া নয়; হালাল, পবিত্র, পর্যাপ্ত ও বরকতময় রিজিক চাওয়া। কারণ বেশি সম্পদ থাকলেই যে তা মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে—ইসলাম এমন ধারণা দেয় না।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ