সকালে নাশতা না করার অভ্যাস নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সকালে ঘুম থেকে উঠে নাশতা না করেই দিনের কাজ শুরু করেন অনেকেই। কেউ সময়ের অভাবে, কেউ ওজন কমানোর আশায় আবার কেউ সকালে ক্ষুধা না লাগায় নিয়মিত সকালের খাবার এড়িয়ে চলেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন নাশতা বাদ দেওয়ার অভ্যাসকে সবার জন্য ক্ষতিকর বা সবার জন্য উপকারী—কোনোটিই সরাসরি বলা যায় না। বরং একজন মানুষ সারাদিন কী খাচ্ছেন, খাবারের মান কেমন, কতটা নিয়ম মেনে খাচ্ছেন এবং তার শারীরিক অবস্থা কেমন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় অবশ্য নিয়মিত নাশতা বাদ দেওয়ার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগসহ কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব গবেষণার বড় অংশ পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় নাশতা না খাওয়াই সরাসরি এসব রোগের কারণ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। অন্যদিকে, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে শুধু নাশতা খাওয়াকে বাধ্যতামূলক করার পক্ষেও শক্তিশালী প্রমাণ নেই।
নাশতা বাদ দিলে কী হতে পারে?
সকালের খাবার বাদ দেওয়ার অভ্যাস নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় বিপাকীয় স্বাস্থ্যকে ঘিরে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় খাবারের সময় ও অনিয়মিত খাওয়ার ধরনকে শরীরের ওজন, ইনসুলিন প্রতিরোধ এবং রক্তচাপের মতো কার্ডিওমেটাবলিক সূচকের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো দিন নাশতা না খেলেই শরীরে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে। বরং দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস, খাবারের গুণমান, শারীরিক সক্রিয়তা, ঘুম এবং অন্যান্য জীবনযাপনও স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কী জানা গেছে?
নাশতা বাদ দেওয়ার অভ্যাস এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। ২০১৯ সালের একটি সিস্টেমেটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসে ছয়টি prospective cohort study এবং ৯৬ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে নাশতা বাদ দেওয়ার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া যায়। শরীরের ওজন বা BMI হিসাবের পরও এই সম্পর্ক পুরোপুরি দূর হয়নি।
আরেকটি মেটা-অ্যানালাইসিসেও নাশতা বাদ দেওয়ার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এসব গবেষণা মূলত মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও রোগের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করেছে। তাই নাশতা বাদ দেওয়াই ডায়াবেটিসের সরাসরি কারণ—এমন দাবি করা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়।
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া এবং ব্যক্তির জন্য উপযোগী meal pattern ঠিক করার ওপর গুরুত্ব দেয়। বিশেষ করে ইনসুলিন বা কিছু ধরনের ডায়াবেটিসের ওষুধ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে খাবার বাদ দিলে রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
হৃদ্স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কি বাড়ে?
নাশতা না খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগের সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ২৩ লাখের বেশি অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে নিয়মিত নাশতা বাদ দেওয়ার সঙ্গে কার্ডিওভাসকুলার রোগের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া যায়।
এর আগে প্রকাশিত গবেষণাগুলোতেও একই ধরনের সম্পর্ক দেখা গেছে। ২০১৯ সালের একটি systematic review-তে প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে নিয়মিত নাশতা বাদ দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে হৃদ্রোগজনিত ঘটনা বা মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি দেখা গিয়েছিল। তবে গবেষকেরা একই সঙ্গে সতর্ক করেছিলেন যে গবেষণাগুলোর মধ্যে নাশতা বাদ দেওয়ার সংজ্ঞা ও অন্যান্য বিভ্রান্তিকর কারণের সমন্বয় এক ছিল না। ফলে ফলাফল ব্যাখ্যায় সতর্কতা প্রয়োজন।
অর্থাৎ, নাশতা বাদ দেওয়া ও হৃদ্রোগের মধ্যে একটি সম্পর্ক গবেষণায় দেখা গেলেও এটিকে সরাসরি কারণ-ফল হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ওজন কমাতে নাশতা বাদ দেওয়া কি কার্যকর?
এখানেই বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। অনেকের ধারণা, সকালে না খেলে সারাদিনে কম ক্যালরি গ্রহণ হবে এবং দ্রুত ওজন কমবে। কিন্তু এ বিষয়ে গবেষণার ফল একেবারে সরল নয়।
দ্য BMJ-তে প্রকাশিত একটি systematic review ও meta-analysis-এ ১৩টি randomized controlled trial পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে নাশতা খাওয়াকে ওজন কমানোর কার্যকর কৌশল হিসেবে সমর্থন করার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং নাশতা খাওয়া দলগুলোর দৈনিক মোট ক্যালরি গ্রহণ কিছুটা বেশি ছিল। তবে গবেষণাগুলোর সময়কাল ছোট ছিল এবং অধিকাংশ গবেষণার মানও খুব শক্তিশালী ছিল না—তাই ফলাফল সতর্কতার সঙ্গে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে।
তাই শুধু ওজন কমানোর জন্য সবাইকে নাশতা খেতেই হবে কিংবা সবাইকে নাশতা বাদ দিতে হবে—দুই ধরনের দাবিই অতিরঞ্জিত।
তাহলে সকালে কী খাওয়া ভালো?
নাশতা করলে কী খাচ্ছেন, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে বেশি আঁশযুক্ত শস্য, ফল, সবজি, প্রোটিনের উৎস এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দুধ বা দুধের বিকল্প খাবার রাখা যেতে পারে। NHS-এর স্বাস্থ্য নির্দেশনায় আঁশসমৃদ্ধ খাবার, ফল ও সবজি এবং সুষম খাদ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সকালের খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবারের বদলে তুলনামূলক পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া ভালো। যেমন—ওটস বা অন্য কোনো পূর্ণশস্য, ডিম, টক বা কম চিনি যুক্ত দই, ফল, বাদাম কিংবা পূর্ণশস্যের রুটি রাখা যেতে পারে। খাবারের পরিমাণ অবশ্য ব্যক্তির বয়স, শারীরিক পরিশ্রম, মোট খাদ্যচাহিদা ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করবে।
নাশতা না করলে সবার কি সমস্যা হবে?
না। এখানে ব্যক্তিভেদে পার্থক্য রয়েছে। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক যদি সকালে ক্ষুধা না পাওয়ার কারণে নাশতা না করেন, কিন্তু দিনের বাকি সময়ে পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার খান এবং মোট খাদ্যাভ্যাস সুষম থাকে, তাহলে শুধু নাশতা বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে তার স্বাস্থ্যের অবনতি হবে—এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্তের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বিশেষ করে ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে randomized trial-এর ফলও নাশতা খাওয়াকে বাধ্যতামূলক কৌশল হিসেবে সমর্থন করে না।
তবে নিয়মিত নাশতা বাদ দেওয়ার সঙ্গে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক গবেষণায় পাওয়া গেছে, সেগুলোকে একেবারে উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনকে বিবেচনায় নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কারা বিশেষভাবে সতর্ক থাকবেন?
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, বিশেষ করে যারা ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমাতে পারে এমন কিছু ওষুধ ব্যবহার করেন, তাদের নিজের ইচ্ছায় নিয়মিত খাবার বাদ দেওয়ার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া উচিত। খাবার দেরি করা বা বাদ দেওয়ার সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
এ ছাড়া যাদের বিশেষ খাদ্যচাহিদা বা কোনো চিকিৎসাজনিত সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য সাধারণ খাদ্য পরামর্শের বদলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী খাদ্য পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
সকালের নাশতা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটিকে কোনো ‘ম্যাজিক’ স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বা একেবারে ‘ক্ষতিকর’ অভ্যাস হিসেবে দেখা ঠিক নয়। নিয়মিত নাশতা বাদ দেওয়ার সঙ্গে ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগসহ কয়েকটি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে, কিন্তু এসব ফলের বড় অংশ পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় সরাসরি কারণ-ফল নির্ধারণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে, ওজন কমানোর জন্য নাশতা খাওয়াকে বাধ্যতামূলক করার পক্ষেও শক্তিশালী randomized trial evidence নেই।
তাই শুধু নাশতা করেছেন কি না, তার চেয়ে দিনের পুরো খাদ্যাভ্যাস কেমন, খাবারে পুষ্টির ভারসাম্য আছে কি না, শারীরিকভাবে কতটা সক্রিয় এবং কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে কি না—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া বেশি যুক্তিসঙ্গত।
FAQ
প্রশ্ন: প্রতিদিন নাশতা না করলে কি ডায়াবেটিস হয়?
উত্তর: নাশতা বাদ দেওয়ার সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক গবেষণায় পাওয়া গেছে। তবে নাশতা বাদ দেওয়াই সরাসরি ডায়াবেটিসের কারণ—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
প্রশ্ন: নাশতা বাদ দিলে কি ওজন কমে?
উত্তর: শুধু নাশতা খাওয়া বা না খাওয়ার ওপর ওজন কমা নির্ভর করে না। একটি systematic review-তে নাশতা খাওয়াকে ওজন কমানোর কার্যকর কৌশল হিসেবে সমর্থন করার মতো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন: নাশতা বাদ দিলে কি হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে?
উত্তর: কয়েকটি বড় গবেষণা ও মেটা-অ্যানালাইসিসে নাশতা বাদ দেওয়ার সঙ্গে কার্ডিওভাসকুলার রোগের বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এই গবেষণাগুলোর বেশিরভাগই পর্যবেক্ষণভিত্তিক, তাই সরাসরি কারণ-ফল নিশ্চিত করা যায় না।
প্রশ্ন: সকালের নাশতায় কী খাওয়া ভালো?
উত্তর: পূর্ণশস্য বা আঁশসমৃদ্ধ খাবার, ফল, সবজি, ডিম, দই বা অন্যান্য পুষ্টিকর প্রোটিনের উৎস দিয়ে সুষম নাশতা তৈরি করা যেতে পারে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কমানো ভালো।
প্রশ্ন: ডায়াবেটিস থাকলে নাশতা বাদ দেওয়া যাবে?
উত্তর: ডায়াবেটিসে খাবারের সময় ও পরিমাণ ব্যক্তির চিকিৎসা ও ওষুধের ওপর নির্ভর করতে পারে। বিশেষ করে ইনসুলিন বা কিছু রক্তে শর্করা কমানো ওষুধ ব্যবহার করলে খাবার বাদ দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- আর্জেন্টিনা বনাম বলিভিয়া ম্যাচ: সরাসরি দেখুন Live
- বাংলাদেশ বনাম ইন্দোনেশিয়া: ১১ গোলের ম্যাচ শেষ, জানুন ফলাফল
- চলছে বাংলাদেশ বনাম ইন্দোনেশিয়া ম্যাচ: সরাসরি দেখুন Live
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ৮টি দেশের টাকার মান
- চলছে আর্জেন্টিনা বনাম বলিভিয়া ম্যাচ: সরাসরি দেখুন Live
- বাংলাদেশ বনাম ইন্দোনেশিয়া ম্যাচ আজ, লাইভ দেখার উপায় ও সময়সূচি
- আর্জেন্টিনা বনাম বলিভিয়া ম্যাচ, কখন, কোথায় কীভাবে দেখবেন লাইভ
- বাংলাদেশ বনাম ইন্দোনেশিয়া ম্যাচ: ৯০ মিনিটের খেলা শেষ, জানুন ফলাফল
- আর্জেন্টিনা বনাম বলিভিয়া ম্যাচ, লাইভ দেখার উপায় ও সময়সূচি
- বাংলাদেশ বনাম ইন্দোনেশিয়া ম্যাচ: সরাসরি দেখুন LIVE
- বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া ম্যাচ আজ, কখন ও কোথায় দেখবেন লাইভ
- বাংলাদেশ বনাম ইন্দোনেশিয়া ম্যাচ আজ, লাইভ দেখার সহজ উপায়
- বাংলাদেশ-পাকিস্তান সেমিফাইনাল, কখন, কোথায় ও কীভাবে দেখবেন লাইভ
- আজকের সৌদি রিয়াল রেট (৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬)