ঢাকা, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

রাতে দেরিতে খাবার খেলে শরীরে কী হতে পারে? জানুন

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০২ ১৪:২৭:৪৭
রাতে দেরিতে খাবার খেলে শরীরে কী হতে পারে? জানুন

রাত গভীর হওয়ার পর নিয়মিত রাতের খাবার খাওয়ার অভ্যাস শুধু ঘুমের সময়সূচিই নয়, শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, দিনের তুলনায় অনেক দেরিতে খাবার খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গে ওজন, রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের কিছু ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। তবে দেরিতে খেলেই এসব সমস্যা হবে—এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়; খাবারের পরিমাণ, খাবারের ধরন, ঘুমের সময় এবং সামগ্রিক জীবনযাপনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে যাদের রাতে খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়ার অভ্যাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শোয়ার কাছাকাছি সময়ে খাবার খেলে অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালার উপসর্গ বাড়তে পারে। রাতের খাবার ও ঘুমের মধ্যে পর্যাপ্ত ব্যবধান রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়, বিশেষ করে যাদের রাতে GERD-এর উপসর্গ দেখা দেয়।

শরীরের ঘড়ির সঙ্গে খাবারের সময়ের সম্পর্ক

মানবদেহের ভেতরে একটি স্বাভাবিক দৈনিক ছন্দ বা সার্কাডিয়ান রিদম কাজ করে। ঘুম, জাগরণ, হরমোনের কার্যক্রম এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ার মতো অনেক শারীরবৃত্তীয় কাজের সঙ্গে এই ছন্দের সম্পর্ক রয়েছে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৫ সালের বৈজ্ঞানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খাবারের সময়ও কার্ডিওমেটাবলিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। দিনের তুলনায় পরে খাবার খাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের মতো কিছু কার্ডিওমেটাবলিক ফলাফলের সম্পর্ক দেখা যায়।

অর্থাৎ শুধু কী খাচ্ছেন তা নয়, কখন খাচ্ছেন—সেটিও শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ওজন বাড়ার সঙ্গে দেরিতে খাওয়ার সম্পর্ক আছে কি?

রাতে দেরিতে খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে গবেষণার ফল সব ক্ষেত্রে এক নয়। তবে ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর করা কয়েকটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার তথ্য একত্র করে দেখা হয়েছে। সেখানে দেরিতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে স্থূলতার বাড়তি ঝুঁকির একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

গবেষণাটিতে আটটি গবেষণা—তিনটি case-control এবং পাঁচটি cohort study—অন্তর্ভুক্ত ছিল। সব গবেষণা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে late eating-এর সঙ্গে obesity-এর ঝুঁকির একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে case-control গবেষণাগুলোতে একই ধরনের সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। গবেষকেরা আরও বলেছেন, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক দেখা গেলেও বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও prospective গবেষণা প্রয়োজন।

তাই রাতে দেরিতে খাবার খাওয়াকে একাই ওজন বাড়ার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।

রক্তে শর্করা ও বিপাকের ওপর কী প্রভাব পড়ে?

খাবারের সময় শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত—এমন প্রমাণ ক্রমেই বাড়ছে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দিনের শেষের দিকে খাবার গ্রহণের প্রবণতা কার্ডিওমেটাবলিক স্বাস্থ্যের জন্য কম অনুকূল ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি দিনের বিভিন্ন সময়ে খাবার ও শক্তি ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে দেরিতে খাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা এবং কোন পরিস্থিতিতে বেশি হয়, তা নিয়ে আরও নিয়ন্ত্রিত গবেষণা প্রয়োজন।

২০২৬ সালের একটি systematic review-এর protocol-ও এই বিষয়টি স্পষ্ট করে যে dinner timing নিয়ে early বনাম late dinner-এর প্রভাব যাচাই করার জন্য আরও randomized controlled trial প্রয়োজন। গবেষকেরা metabolic health, রক্তে glucose, insulin resistance এবং body weight-এর মতো বিষয়গুলোকে এ ধরনের গবেষণায় গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সবচেয়ে দ্রুত সমস্যা হতে পারে রাতে ঘুমানোর সময়

দেরিতে রাতের খাবার খাওয়ার একটি বাস্তব সমস্যা হলো খাবারের পরপরই বিছানায় চলে যাওয়া। এতে বিশেষ করে যাদের অ্যাসিড রিফ্লাক্সের প্রবণতা রয়েছে, তাদের বুকজ্বালা, টক ঢেঁকুর বা খাবার ও পাকস্থলীর অ্যাসিড ওপরের দিকে উঠে আসার মতো উপসর্গ বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের National Institute of Diabetes and Digestive and Kidney Diseases (NIDDK) বলছে, রাতে বা শুয়ে পড়ার সময় GERD-এর উপসর্গ দেখা দিলে খাবার খাওয়ার পর অন্তত ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করে শোয়া উপসর্গ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

শুধু পরামর্শের ওপর নয়, গবেষণাতেও এর পক্ষে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। একটি randomized controlled trial-এ GERD রোগীদের ক্ষেত্রে দেরিতে রাতের খাবার খাওয়ার পর শোয়া অবস্থায় পাকস্থলীর অ্যাসিড রিফ্লাক্স আগে খাবার খাওয়ার তুলনায় বেশি দেখা গিয়েছিল।

রাতে দেরিতে খেলে ঘুমের সমস্যা হতে পারে?

রাতের খাবারের সময় এবং ঘুমের মধ্যে সম্পর্কটি অনেকটাই ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হয়। তবে খাবার খেয়ে দ্রুত শুয়ে পড়লে রিফ্লাক্সের উপসর্গ বাড়তে পারে, আর এসব উপসর্গ ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

গবেষণায় GERD ও ঘুমের সমস্যার মধ্যে সম্পর্কও পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালের একটি systematic review ও meta-analysis-এ ১ লাখ ১০ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য নিয়ে GERD এবং sleep disorder-এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক দেখা গেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাতে দেরিতে খাওয়া প্রত্যেক মানুষের ঘুমের সমস্যা তৈরি করবে। খাবারের পরিমাণ, খাবারের ধরন, রিফ্লাক্সের প্রবণতা এবং শোয়ার সময়—সবকিছুর প্রভাব থাকতে পারে।

শুধু সময় নয়, রাতের খাবারে কী থাকছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ

রাতে দেরিতে খাবার খাওয়ার পাশাপাশি খাবারের ধরনও বিবেচনায় রাখা দরকার। বিশেষ করে অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত, ঝাল বা ব্যক্তিগতভাবে রিফ্লাক্সের উপসর্গ বাড়ায় এমন খাবার রাতে সমস্যা বাড়াতে পারে। NIDDK-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, ঝাল খাবার, চকলেট, ক্যাফেইন, পুদিনা এবং কিছু অ্যাসিডিক খাবার GERD-এর উপসর্গ বাড়াতে পারে।

তাই রাতের খাবারের সময় ঠিক করার পাশাপাশি খাবারের পরিমাণ ও ধরন নিয়েও সচেতন থাকা প্রয়োজন।

রাত জাগার সঙ্গে দেরিতে খাওয়ার সম্পর্কও আছে

অনেকের ক্ষেত্রে রাত জাগার কারণেই রাতের খাবার পিছিয়ে যায়। আবার কেউ কেউ টেলিভিশন দেখা, মোবাইল ব্যবহার বা কাজের ব্যস্ততার মধ্যে রাতের খাবার অনেক দেরিতে খান। ফলে এখানে শুধু খাবারের সময় নয়, পুরো দৈনিক রুটিনটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, ঘুমের সময়ের অনিয়ম এবং সার্কাডিয়ান রিদমের ব্যাঘাতও স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন কার্ডিওমেটাবলিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।

অর্থাৎ নিয়মিত দেরিতে খাওয়া যদি অনিয়মিত ঘুম ও রাত জাগার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বিষয়টি আরও বিস্তৃত জীবনযাপনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তাহলে রাতের খাবার কখন খাবেন?

সবার জন্য একই নির্দিষ্ট সময়কে রাতের খাবারের আদর্শ সময় হিসেবে নির্ধারণ করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তবে নিয়মিতভাবে রাতের খাবার খেয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই বিছানায় যাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যাদের রাতে রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালার সমস্যা হয় তাদের জন্য তো বটেই।

যাদের দৈনন্দিন কাজের কারণে রাতের খাবার দেরিতে হয়, তারা অন্তত খাবার শেষ করার পর পর্যাপ্ত সময় রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করতে পারেন। একই সঙ্গে রাতের খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অতিরিক্ত ভারী খাবার এড়িয়ে চলাও উপকারী হতে পারে।

রাতে দেরিতে খাবার খাওয়ার অভ্যাসকে শুধু ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণায় late eating-এর সঙ্গে স্থূলতা ও কিছু কার্ডিওমেটাবলিক সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেলেও এর অনেকটাই পর্যবেক্ষণভিত্তিক তথ্য। তাই দেরিতে খাওয়াই এসব রোগের সরাসরি কারণ—এমন দাবি করা ঠিক হবে না।

তবে একটি বিষয়ে তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার তথ্য রয়েছে—খাবার খেয়ে দ্রুত শুয়ে পড়া, বিশেষ করে GERD বা রাতের বুকজ্বালায় ভোগা মানুষের জন্য, সমস্যা বাড়াতে পারে। এ কারণে রাতের খাবার ও ঘুমের মধ্যে পর্যাপ্ত ব্যবধান রাখা এবং নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী খাবারের সময় ও ধরন ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ।

FAQ

প্রশ্ন: রাতে দেরিতে খাবার খেলে কি ওজন বাড়ে?

উত্তর: কিছু গবেষণায় late eating-এর সঙ্গে স্থূলতার বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে শুধু দেরিতে খাওয়াই ওজন বাড়ার সরাসরি কারণ—এমন প্রমাণ নেই। মোট ক্যালরি, খাবারের ধরন, শারীরিক কার্যক্রম ও ঘুমসহ অন্যান্য বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: খাবার খাওয়ার কতক্ষণ পর ঘুমানো ভালো?

উত্তর: বিশেষ করে রাতে GERD বা বুকজ্বালার উপসর্গ থাকলে NIDDK খাবার খাওয়ার পর অন্তত ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করে শোয়ার পরামর্শ দেয়।

প্রশ্ন: ঘুমানোর ঠিক আগে খাবার খেলে কি অ্যাসিডিটি বাড়তে পারে?

উত্তর: যাদের GERD বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের প্রবণতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে খাবারের পর দ্রুত শুয়ে পড়লে উপসর্গ বাড়তে পারে। গবেষণাতেও দেরিতে খাবার খাওয়ার পর শোয়া অবস্থায় বেশি অ্যাসিড রিফ্লাক্স দেখা গেছে।

প্রশ্ন: রাতে দেরিতে খেলে কি ঘুমের সমস্যা হয়?

উত্তর: দেরিতে খাওয়ার সরাসরি কারণে সবার ঘুমের সমস্যা হবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। তবে রাতের খাবারের পর রিফ্লাক্স বা বুকজ্বালা হলে তা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। GERD ও sleep disorder-এর মধ্যে সম্পর্কও গবেষণায় পাওয়া গেছে।

প্রশ্ন: রাতে দেরি করে খেতে হলে কী করা উচিত?

উত্তর: সম্ভব হলে খাবার ও ঘুমের মধ্যে পর্যাপ্ত ব্যবধান রাখা, অতিরিক্ত ভারী খাবার এড়িয়ে চলা এবং নিজের ক্ষেত্রে যেসব খাবারে রিফ্লাক্সের উপসর্গ বাড়ে সেগুলো কমানো যেতে পারে। বিশেষ করে রাতে GERD-এর উপসর্গ থাকলে খাবার শেষ করার অন্তত ৩ ঘণ্টা পর শোয়ার পরামর্শ রয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ