ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩

মাছরাঙা পাখি কমছে কেন, গ্রামবাংলার চেনা দৃশ্য কি হারিয়ে যাচ্ছে?

সারাদেশ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৫ ১২:৩৪:১৬
মাছরাঙা পাখি কমছে কেন, গ্রামবাংলার চেনা দৃশ্য কি হারিয়ে যাচ্ছে?

গ্রামের পুকুরপাড়ে বাঁশের খুঁটিতে বসে থাকা মাছরাঙার দৃশ্য একসময় ছিল পরিচিত। পানিতে শিকারের সন্ধানে স্থির হয়ে থাকা রঙিন এই পাখি সুযোগ বুঝে মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিন্তু গ্রামবাংলার সেই চেনা দৃশ্য এখন আগের তুলনায় কম চোখে পড়ছে। পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায়ও মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরণ কমে আসার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। জলাশয়ের সংকট, আবাসস্থল হারানো, খাবারের অভাব ও পাখি শিকার—এসব কারণে পাখিদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।

দশমিনা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শুভেন্দু সরকার জানিয়েছেন, অবাধে পাখি শিকারের কারণে গ্রামাঞ্চলেও আগের মতো পাখি দেখা যায় না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জলাশয়ের অভাবে মাছরাঙার বাসা তৈরির সুযোগ কমছে। পাশাপাশি পানি ও মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় খাবার সংগ্রহেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। পাখির আবাসস্থলের সংকটও তাদের সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

মাছরাঙার জন্য শুধু পানি থাকলেই চলে না

মাছরাঙার জীবনধারণের সঙ্গে জলাশয় ও আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পাখিটি সাধারণত পানির কাছাকাছি কোনো ডাল বা খুঁটিতে বসে শিকারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে। শিকার নাগালের মধ্যে এলে দ্রুত পানিতে নেমে মাছ ধরে। অল্প পানি জমে থাকা স্থানেও এভাবে শিকারের অপেক্ষায় থাকতে পারে।

মাছরাঙার প্রধান খাবার মাছ হলেও প্রজাতিভেদে খাদ্যতালিকায় আরও অনেক প্রাণী রয়েছে। পানিতে থাকা বিভিন্ন পোকামাকড় খাওয়ার পাশাপাশি কিছু প্রজাতি ব্যাঙ, সরীসৃপ, ছোট পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীও শিকার করে।

জলাশয় কমে গেলে মাছ ধরার জায়গা সংকুচিত হয়। একই সঙ্গে পাখির বাসা তৈরির উপযুক্ত পরিবেশও সীমিত হতে পারে। ফলে মাছরাঙার জন্য খাদ্য সংগ্রহ ও প্রজননের সুযোগ—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দিতে পারে।

দশমিনার গ্রামগুলোতে যেসব মাছরাঙা দেখা যায়

পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার নদীতীর, গ্রামের পুকুর এবং পথের পাশের জলাশয় মাছরাঙার পরিচিত বিচরণক্ষেত্র। এসব এলাকায় পাতি মাছরাঙা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে এই প্রজাতির পাশাপাশি সাদাবুক মাছরাঙা, বাদামিডানা মাছরাঙা, ছোট মাছরাঙা, কলার্ড মাছরাঙা ও পাকড়া মাছরাঙারও উপস্থিতি রয়েছে।

একসময় গ্রামের বিল-ঝিল, ধানখেত, নদ-নদীর পাশের ঝোপঝাড় এবং জমে থাকা অল্প পানিতেও মাছরাঙার দেখা মিলত। ভোর কিংবা গোধূলিবেলায় সাদা বক ও কালো বকের উড়ে বেড়ানোর দৃশ্যও ছিল গ্রামীণ পরিবেশের স্বাভাবিক অংশ। বর্তমানে এসব পাখির বিচরণ আগের তুলনায় কম দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয়ভাবে লক্ষ করা হচ্ছে।

পরিবেশের পরিবর্তনে সংকুচিত হচ্ছে পাখির বিচরণক্ষেত্র

পাখিদের জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বনাঞ্চলে পরিবেশদূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটা, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, খাদ্যের ঘাটতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির পাখির জন্য হুমকি তৈরি করছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাখিদের বসবাস ও চলাচলের জায়গা সংকুচিত হওয়ার সমস্যা। জলাশয় এবং আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ বদলে গেলে মাছরাঙার মতো পানিনির্ভর পাখির শিকার ও প্রজননের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

শীতকালে যেসব অঞ্চলে পানি জমে যায় কিংবা জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশে পরিবর্তন ঘটে, সেসব এলাকার মাছরাঙা অন্যত্র চলে যেতে পারে। অর্থাৎ পরিবেশের পরিবর্তন পাখির বসবাসের স্থান ও চলাচল—দুইয়ের ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে।

রঙিন চেহারা ও শিকারের দক্ষতায় আলাদা মাছরাঙা

মাছরাঙা অ্যালসিডিনিস উপবর্গের অন্তর্ভুক্ত। এদের তিনটি গোত্র হলো Alcedinidae (গাঙ মাছরাঙা), Halcyonidae (গেছো মাছরাঙা) এবং Cerylidae (পান মাছরাঙা)। বিশ্বে মাছরাঙার প্রায় ৯০টি প্রজাতি রয়েছে।

বেশির ভাগ মাছরাঙার মাথা দেহের তুলনায় বড়, চঞ্চু লম্বা ও সূচালো, পা খাটো এবং লেজ তুলনামূলক ছোট। উজ্জ্বল রঙের পালক এদের সহজেই আলাদা করে চেনায়। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির চেহারাতেও কিছু পার্থক্য দেখা যায়।

মাছরাঙার অধিকাংশ প্রজাতি বিষুবীয় অঞ্চলে বাস করে। অনেক প্রজাতির দেখা মেলে বনাঞ্চলেও। প্রজাতিভেদে এদের জীবনযাপন ও বাসা তৈরির ধরনে পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত জলাশয়ের পাশের খাড়া মাটির পাড়ে গর্ত তৈরি করে বাসা বানায় মাছরাঙা। এদের ডিমের রং চকচকে সাদা।

প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী ও পুরুষ মাছরাঙা জোড়া বাঁধে এবং বাসা তৈরি করে। এ সময় উপযুক্ত বাসা তৈরির স্থান ও আশপাশের পরিবেশ তাদের জীবনচক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মাছরাঙা টিকিয়ে রাখতে কী জরুরি?

দশমিনা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা শুভেন্দু সরকারের বক্তব্যে জলাশয়ের অভাব, বাসা তৈরির অসুবিধা, খাদ্যসংকট ও পাখি শিকারের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এসব সমস্যার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনও মাছরাঙাসহ অন্যান্য পাখির বিচরণে প্রভাব ফেলছে।

প্রাকৃতিক জলাশয়, গাছপালা ও পাখির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র রক্ষা করা না গেলে গ্রামবাংলার পরিচিত পাখিগুলোর উপস্থিতি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাছরাঙার মতো জলাশয়নির্ভর পাখির ক্ষেত্রে খাবার সংগ্রহ, বাসা তৈরি এবং নিরাপদে বেঁচে থাকার উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রামীণ প্রকৃতিতে মাছরাঙার উপস্থিতি ধরে রাখার জন্য তাই জলাশয় ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণের পাশাপাশি অবাধে পাখি শিকার বন্ধ করাও জরুরি।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. গ্রামবাংলায় মাছরাঙা কমে যাওয়ার কারণ কী?

জলাশয় ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, খাদ্যসংকট, অবাধে পাখি শিকার, পরিবেশদূষণ, গাছ কাটা, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তন পাখিদের জন্য হুমকি তৈরি করছে।

২. দশমিনা উপজেলায় কোন কোন মাছরাঙা দেখা যায়?

পাতি মাছরাঙা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া সাদাবুক মাছরাঙা, বাদামিডানা মাছরাঙা, ছোট মাছরাঙা, কলার্ড মাছরাঙা ও পাকড়া মাছরাঙাও উপকূলীয় অঞ্চলে দেখা যায়।

৩. মাছরাঙার প্রধান খাবার কী?

মাছ এদের প্রধান খাদ্য। এ ছাড়া বিভিন্ন পোকামাকড় এবং প্রজাতিভেদে ব্যাঙ, সরীসৃপ, ছোট পাখি ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীও খায়।

৪. মাছরাঙা কোথায় বাসা তৈরি করে?

সাধারণত জলাশয়ের পাশে খাড়া মাটির পাড়ে গর্ত তৈরি করে বাসা বানায়। তবে প্রজাতিভেদে বাসা তৈরির ধরন আলাদা হতে পারে।

৫. মাছরাঙা সংরক্ষণে কী করা দরকার?

প্রাকৃতিক জলাশয়, গাছপালা ও নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র রক্ষা করা এবং অবাধে পাখি শিকার বন্ধ করা জরুরি। এতে মাছরাঙাসহ অন্যান্য দেশীয় পাখির উপযুক্ত আবাসস্থল সংরক্ষণে সহায়তা মিলবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: