জমির রেকর্ডে ভুল? সংশোধনের আবেদন করবেন যেখানে
জমির খতিয়ানে মালিকের নাম, দাগ নম্বর কিংবা জমির পরিমাণে ভুল থাকলে ভোগান্তিতে পড়তে পারেন জমির মালিক। ভবিষ্যতে জমি বিক্রি, নামজারি বা মালিকানা-সংক্রান্ত কাজে জটিলতা এড়াতে এসব ভুল সময়মতো সংশোধন করা জরুরি। তবে জমির রেকর্ডে ভুল ধরা পড়লেই যে একই দপ্তরে অভিযোগ করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। নামজারি খতিয়ানের ভুলের জন্য সাধারণত সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হয়। অন্যদিকে, জরিপ চলাকালে ভুল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি জানাতে হয়। চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ড সংশোধনের ক্ষেত্রেও ভুলের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হয়।
তাই জমির রেকর্ডে ভুল দেখলে প্রথমেই বুঝতে হবে, সেটি কোন ধরনের রেকর্ডে হয়েছে এবং কী তথ্য ভুল রয়েছে। সঠিক দপ্তরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করলে সংশোধনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া সহজ হয়।
জমির রেকর্ডে ভুল হলে কোথায় অভিযোগ করবেন?
জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি দপ্তর সব ধরনের অভিযোগ নিষ্পত্তি করে না। রেকর্ডের ধরন, ভুলের প্রকৃতি এবং জরিপের পর্যায় অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হয়।
নামজারি খতিয়ানে ভুল হলে করণীয়
নামজারির মাধ্যমে তৈরি খতিয়ানে মালিকের নাম, জমির পরিমাণ বা অন্য কোনো তথ্যে ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে।
কোনো নামজারি মামলায় ভুল তথ্য অন্তর্ভুক্ত হলে কিংবা জমির পরিমাণে অসংগতি দেখা দিলে ভুলের ধরন অনুযায়ী সংশোধনের আবেদন, মিসকেস বা বিবিধ মামলা করার প্রয়োজন হতে পারে। আবার অন্য ব্যক্তির নামে নামজারি হয়ে থাকলে বিষয়টি যাচাই করে উপযুক্ত আইনগত প্রতিকার নিতে হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জমির দলিল, আগের খতিয়ান, নামজারি-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং ভুল প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হতে পারে। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রযোজ্য প্রক্রিয়া জেনে নেওয়া ভালো।
জরিপ চলাকালে খতিয়ানে ভুল পাওয়া গেলে
নতুন করে ভূমি জরিপের কাজ চলার সময় খতিয়ানে মালিকের নাম, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ বা অন্য কোনো তথ্য ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
জরিপের বিভিন্ন পর্যায়ে খসড়া রেকর্ড যাচাই এবং নির্ধারিত নিয়মে আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকে। এ সময় জমির মালিকানা-সংক্রান্ত দলিল ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথির ভিত্তিতে ভুলের বিষয়টি তুলে ধরতে হয়।
আপত্তি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় শুনানি নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী আপিলের সুযোগ রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। এ কারণে জরিপ চলাকালে ভুল ধরা পড়লে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত খতিয়ানে ভুল থাকলে
জরিপের কাজ শেষ হওয়ার পর চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত খতিয়ানেও ভুল থাকতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে ভুলের প্রকৃতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সংশোধনের আবেদন করার প্রয়োজন হতে পারে।
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের আওতাধীন সংশ্লিষ্ট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে যোগাযোগ করে আবেদন করার পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়। তবে চূড়ান্ত রেকর্ডের সব ধরনের ভুল একই দপ্তর বা একই প্রক্রিয়ায় সংশোধন করা যায় না।
আরও পড়ুন:
জমি কেনার আগে মালিক আসলেই মালিক কি না বুঝবেন যেভাবে
জমির মাপজোক নিয়ে সমস্যা হলে কী করবেন? জানুন সমাধান
জমি কেনার পর মামলা আছে জানলে কী করবেন? জানুন আইনি উপায়
করণিক ভুল, ভুল তথ্য অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই আবেদনের আগে রেকর্ডের ধরন ও ভুলের কারণ যাচাই করা জরুরি। কোনো ক্ষেত্রে আদালত বা নির্ধারিত ট্রাইব্যুনালের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
অন্য ব্যক্তির নামে জমির রেকর্ড হলে কী করবেন?
নিজের জমি অন্য ব্যক্তির নামে রেকর্ড করা হয়েছে বলে মনে হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, দলিল এবং জমির অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই করতে হবে। এরপর ভুলটি নামজারি-সংক্রান্ত, নাকি জরিপ রেকর্ডে হয়েছে, তা শনাক্ত করতে হবে।
নামজারি-সংক্রান্ত সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে প্রতিকারের সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারেন। আর চূড়ান্ত জরিপ রেকর্ড ও প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী উপযুক্ত আদালত বা ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, শুধু খতিয়ানে নাম থাকলেই সব ক্ষেত্রে জমির চূড়ান্ত মালিকানা প্রমাণিত হয় না। মালিকানা নির্ধারণে দলিল, উত্তরাধিকার, দখল এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে। জটিল বিরোধের ক্ষেত্রে ভূমি আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জমির রেকর্ড সংশোধন করতে যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে
ভুলের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা আলাদা হতে পারে। তবে আবেদন করার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রস্তুত রাখা ভালো।
সংশ্লিষ্ট খতিয়ান বা পর্চার কপি।
জমি কেনার দলিল, হেবা দলিল বা মালিকানা অর্জনের অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দলিল।
আগের জরিপের খতিয়ান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মৌজা ম্যাপ।
জমির দাগ নম্বর, মৌজার নাম ও জমির পরিমাণ-সংক্রান্ত তথ্য।
উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক হলে প্রাসঙ্গিক উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত কাগজপত্র।
আগে কোনো নামজারি বা সংশ্লিষ্ট মামলা হয়ে থাকলে সেই মামলার আদেশের কপি।
ভুল তথ্যের বিষয়টি প্রমাণে সহায়ক অন্যান্য নথি।
সব আবেদনের জন্য একই ধরনের কাগজপত্র বাধ্যতামূলক নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে।
অনলাইনে কোথায় যোগাযোগ করবেন?
জমির রেকর্ড, নামজারি বা অন্যান্য ভূমিসেবা নিয়ে তথ্য জানতে সরকারি অনলাইন মাধ্যম ও হটলাইন ব্যবহার করা যায়।
ভূমিসেবা হটলাইন ১৬১২২: ভূমিসেবা-সংক্রান্ত তথ্য ও সহায়তার জন্য এই নম্বরে যোগাযোগ করা যায়। রেকর্ডের ভুল কোন দপ্তরের আওতায় পড়তে পারে, সে বিষয়ে প্রাথমিক তথ্যও জানতে পারেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট: https://land.gov.bd/ ওয়েবসাইটে ভূমিসেবা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর: https://dlrs.gov.bd/ ওয়েবসাইট থেকে ভূমি জরিপ, রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য জানা যায়।
তবে হটলাইনে যোগাযোগ বা অনলাইনে তথ্য নেওয়া আর আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড সংশোধনের আবেদন এক বিষয় নয়। সংশোধনের জন্য প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে।
জমির রেকর্ডে ভুল দেখলে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
জমির কাগজপত্রে অসংগতি দেখা দিলে দেরি না করে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা উচিত। দলিলের তথ্যের সঙ্গে খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে দেখুন। প্রয়োজনে মৌজা ম্যাপ এবং আগের জরিপের রেকর্ডও পরীক্ষা করুন।
আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকার, রসিদ বা মামলার নম্বর সংরক্ষণ করুন। পরবর্তী সময়ে আবেদনের অগ্রগতি জানতে এসব তথ্য কাজে লাগবে। কোনো ব্যক্তি দ্রুত রেকর্ড সংশোধন করে দেওয়ার নামে অননুমোদিত অর্থ দাবি করলে সতর্ক থাকুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভুলের ধরন না বুঝে ভুল দপ্তরে আবেদন করবেন না। নামজারি খতিয়ানের সমস্যা, চলমান জরিপের আপত্তি এবং চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ডের বিরোধের আইনগত প্রক্রিয়া এক নয়। প্রয়োজন হলে ভূমি অফিস বা আইনজীবীর কাছ থেকে সঠিক পরামর্শ নিয়ে পদক্ষেপ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
১. জমির খতিয়ানে নাম ভুল থাকলে কোথায় আবেদন করব?
নামজারি খতিয়ানে ভুল হলে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। জরিপের খসড়া বা চূড়ান্ত রেকর্ডে ভুল হলে সংশ্লিষ্ট সেটেলমেন্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হতে পারে।
২. জমির দাগ নম্বর বা পরিমাণ ভুল হলে কি সংশোধন করা যায়?
প্রযোজ্য আইন ও বিধি অনুযায়ী সংশোধনের সুযোগ থাকতে পারে। এ জন্য দলিল, খতিয়ান, মৌজা ম্যাপ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি দিয়ে ভুলটি যাচাই করাতে হবে।
৩. জমির রেকর্ড সংশোধনের আবেদন কি অনলাইনে করা যায়?
কিছু নামজারি ও ভূমিসেবা অনলাইনে পাওয়া যায়। তবে সব ধরনের জরিপ রেকর্ড সংশোধনের আবেদন একই অনলাইন ব্যবস্থায় করা যায় না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
৪. জমির রেকর্ড নিয়ে অভিযোগ করতে কোন নম্বরে ফোন করব?
ভূমিসেবা-সংক্রান্ত তথ্য ও সহায়তার জন্য ১৬১২২ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। আনুষ্ঠানিক রেকর্ড সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আলাদাভাবে আবেদন করার প্রয়োজন হতে পারে।
৫. অন্য ব্যক্তির নামে জমির রেকর্ড হলে কী করব?
প্রথমে দলিল ও রেকর্ড যাচাই করে ভুলের ধরন শনাক্ত করুন। নামজারি-সংক্রান্ত সমস্যা হলে এসি ল্যান্ড কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। মালিকানা বা চূড়ান্ত জরিপ রেকর্ড নিয়ে বিরোধ থাকলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী আদালত বা উপযুক্ত ট্রাইব্যুনালের সহায়তা নিতে হতে পারে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- জমির দলিল তুলতে কত টাকা লাগে? জেনে নিন খরচের হিসাব
- আজকের স্বর্ণের দাম কত: ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট সোনার দাম
- OPPO Reno 17 Pro: লঞ্চ কবে, দাম কত ও কী থাকছে নতুন ফিচারে?
- আজ প্রতি ভরি ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট সোনার দাম কত
- Pulsar F250-এ ২০ হাজার টাকা ছাড়, N160 ও 150-এ উপহার
- Yamaha FZS V5 Hybrid-এর দাম কত? ফিচার ও মাইলেজ জানুন
- ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নে কত টাকা লাগে, দেরি হলে কত জরিমানা