ঢাকা, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

শিশুর জন্মনিবন্ধন কখন করবেন, কী কী কাগজপত্র লাগবে?

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৫ ১২:৫০:৩৯
শিশুর জন্মনিবন্ধন কখন করবেন, কী কী কাগজপত্র লাগবে?

সন্তানের জন্মের পর তার নাম, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বাবা-মা। এই ব্যস্ততায় অনেক সময় জন্মনিবন্ধনের বিষয়টি পিছিয়ে যায়। অথচ শিশুর জন্মের পর প্রথম দিকেই কাজটি সেরে রাখা ভালো। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মসংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের কাছে জমা দিতে হয়। তাই নির্ধারিত সময়ের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা না করে যত দ্রুত সম্ভব জন্মনিবন্ধনের আবেদন করা উচিত।

জন্মনিবন্ধন শুধু একটি সনদ সংগ্রহের বিষয় নয়; এটি শিশুর জন্ম ও পরিচয়ের সরকারি রেকর্ড। ভবিষ্যতে শিক্ষা, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে এই সনদ প্রয়োজন হতে পারে। জন্মের পর থেকেই সঠিক তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করলে পরবর্তী সময়ে কাগজপত্র নিয়ে জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা কমে।

শিশুর জন্মের কত দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন করতে হবে?

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর ৮(১) ধারা অনুযায়ী, শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে তার জন্মসংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের কাছে দিতে হবে। এ দায়িত্ব শিশুর বাবা, মা, অভিভাবক বা আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যক্তির।

অর্থাৎ, শিশুর জন্মের পর জন্মনিবন্ধনের জন্য হাতে মাত্র ৪৫ দিন সময় রয়েছে—এমন ভেবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করা ঠিক নয়। বরং জন্মের পরপরই প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র প্রস্তুত করে আবেদন করার উদ্যোগ নেওয়া ভালো।

মনে রাখবেন: আইন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জন্মসংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের কাছে দেওয়ার কথা বলেছে। তাই আবেদন করার পরিকল্পনা এমনভাবে করুন, যাতে ৪৫ দিনের সময়সীমা অতিক্রম না করে।

জন্মের পর দ্রুত জন্মনিবন্ধন করানো কেন ভালো?

শিশুর জন্মনিবন্ধন যত তাড়াতাড়ি করা যায়, ততই পরিবারের জন্য সুবিধাজনক। এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

প্রথমত, জন্মের তথ্য সহজে যাচাই করা যায়। শিশুর জন্মতারিখ, জন্মস্থান এবং বাবা-মায়ের তথ্য তখন সাম্প্রতিক কাগজপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সহজ হয়।

দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে। হাসপাতাল বা ক্লিনিকের জন্মসংক্রান্ত কাগজ, বাবা-মায়ের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য এবং ঠিকানার প্রমাণ সংগ্রহ করা তুলনামূলক সহজ হয়।

তৃতীয়ত, ভবিষ্যতের প্রয়োজনের আগে সনদ হাতে থাকে। শিশুর শিক্ষা বা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে জন্মনিবন্ধন প্রয়োজন হলে তখন নতুন করে আবেদন নিয়ে ব্যস্ত হতে হয় না।

চতুর্থত, ভুল তথ্য সংশোধনের ঝুঁকি কমানো যায়। আবেদন করার সময় নামের বাংলা ও ইংরেজি বানান, জন্মতারিখ এবং বাবা-মায়ের তথ্য ভালোভাবে যাচাই করলে পরবর্তী সময়ে সংশোধনের প্রয়োজন কমতে পারে।

শিশুর জন্মনিবন্ধন করতে কোথায় আবেদন করবেন?

বাংলাদেশে জন্মনিবন্ধনের আবেদন অনলাইনে করা যায়। এ জন্য জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে হবে।

আবেদনের ওয়েবসাইট: https://bdris.gov.bd/br/application

আবেদনের সময় সাধারণত শিশুর জন্মস্থান বা স্থায়ী ঠিকানার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয় নির্বাচন করতে হয়। অনলাইন ফরমে শিশুর পরিচিতি, জন্মতারিখ, জন্মস্থান, বাবা-মায়ের তথ্য, ঠিকানা ও আবেদনকারীর তথ্য দিতে হয়।

আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য ভালোভাবে যাচাই করুন। সরকারি ফরমে তথ্য জমা দেওয়ার পর তা আর সম্পাদনার সুযোগ নাও থাকতে পারে। তাই নামের বানান, জন্মতারিখ এবং বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য নির্ভুলভাবে দেওয়া জরুরি।

জন্মনিবন্ধনের জন্য কী কী কাগজপত্র লাগতে পারে?

শিশুর জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র শিশুর বয়স, জন্মের প্রমাণ এবং আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সরকারি অনলাইন ফরমে দেখানো নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।

প্রস্তুতি হিসেবে নিচের তথ্য ও কাগজপত্র হাতের কাছে রাখুন:

হাসপাতাল, ক্লিনিক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দেওয়া জন্মসংক্রান্ত প্রমাণপত্র, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে।

শিশুর জন্মতারিখ ও জন্মস্থানের সঠিক তথ্য।

বাবা ও মায়ের জন্মনিবন্ধন নম্বর এবং প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য।

পরিবারের স্থায়ী ঠিকানার প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র।

আবেদনকারীর সচল মোবাইল নম্বর।

সব ক্ষেত্রে একই কাগজপত্র লাগবে, এমন নয়। অনলাইন ফরমে যে নথিগুলো চাওয়া হবে, সেগুলো প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন সম্পন্ন করুন।

৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন না করলে কী হবে?

নির্ধারিত ৪৫ দিনের মধ্যে আবেদন করা না হলে জন্মনিবন্ধন করার সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর ১৩ ধারায় নির্ধারিত সময়ের পর বিলম্বিত নিবন্ধনের বিধান রয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতি ও প্রযোজ্য ফি অনুসরণ করতে হয়।

দেরি হয়ে গেলে আর অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করুন এবং সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্মের তথ্য প্রমাণের জন্য অতিরিক্ত নথি প্রয়োজন হতে পারে। তাই দেরি হলে ঠিক কী কী কাগজ লাগবে, তা সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে জেনে নেওয়া ভালো।

শিশুর নাম ঠিক না হলে জন্মনিবন্ধন করা যাবে?

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪-এর ১০ ধারায় বলা হয়েছে, জন্মনিবন্ধনের আগে শিশুর নাম নির্ধারণ করতে হবে। তবে শিশুর নাম তখনও নির্ধারণ করা না হলে জন্মনিবন্ধন করা যাবে; সে ক্ষেত্রে নিবন্ধনের পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে নাম সরবরাহ করতে হবে।

তাই শিশুর নাম চূড়ান্ত করতে দেরি হচ্ছে বলে জন্মনিবন্ধনের বিষয়ে একেবারেই উদ্যোগ না নেওয়া ঠিক নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কীভাবে আবেদন করতে হবে, তা সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয় থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।

বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন না থাকলে কী করবেন?

সন্তানের জন্মনিবন্ধনের আবেদন করতে গিয়ে বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন না থাকলে অনেক পরিবার সমস্যায় পড়ে। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের FAQ অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের বয়স প্রমাণের রেকর্ড—যেমন শিক্ষাগত সনদ বা আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য পরিচয়সংক্রান্ত নথি—দিয়ে তাদের জন্মনিবন্ধনের ব্যবস্থা করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

আরও পড়ুন:

জন্মনিবন্ধন সনদ হারিয়ে গেলে নতুন কপি তুলবেন যেভাবে

নবজাতকের জন্মনিবন্ধন করতে কী কী কাগজ লাগে?

জন্মনিবন্ধন ও এনআইডিতে নামের বানান আলাদা? যা করবেন

এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের নিবন্ধন পিছিয়ে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। বাবা-মায়ের রেকর্ড ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে কীভাবে আবেদন করতে হবে, তা জেনে নিন।

জন্মনিবন্ধনের আগে যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন

আবেদন জমা দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করুন:

শিশুর জন্মতারিখ সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কি না।

নামের বাংলা ও ইংরেজি বানান মিল আছে কি না।

বাবা-মায়ের নাম ও জন্মনিবন্ধন নম্বর নির্ভুল কি না।

জন্মস্থান ও ঠিকানার তথ্য ঠিক আছে কি না।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত হয়েছে কি না।

সঠিক নিবন্ধন কার্যালয় নির্বাচন করা হয়েছে কি না।

সব তথ্য যাচাই করে আবেদন জমা দিন। কোনো তথ্য নিয়ে সন্দেহ থাকলে আবেদন জমা দেওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের সহায়তা নিন।

শিশুর জন্মের পর ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধনের তথ্য দেওয়া আইনগতভাবে নির্ধারিত। তাই সন্তানের জন্মের পরপরই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে আবেদন করাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। এতে শিশুর পরিচয়ের সরকারি রেকর্ড তৈরি হবে এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনেও পরিবার প্রস্তুত থাকবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. শিশুর জন্মের কত দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন করতে হবে?

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী, শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মসংক্রান্ত তথ্য নিবন্ধকের কাছে দিতে হবে।

২. ৪৫ দিন পার হয়ে গেলে কি জন্মনিবন্ধন করা যাবে?

হ্যাঁ। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও বিলম্বিত জন্মনিবন্ধনের বিধান রয়েছে। তবে নির্ধারিত পদ্ধতি ও প্রযোজ্য ফি অনুসরণ করতে হবে।

৩. শিশুর জন্মনিবন্ধনের আবেদন অনলাইনে করা যায়?

হ্যাঁ। সরকারি BDRIS ওয়েবসাইটে জন্মনিবন্ধনের আবেদন করা যায়। আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য ও সংযুক্তি যাচাই করা জরুরি।

৪. শিশুর নাম ঠিক না হলে জন্মনিবন্ধন করা সম্ভব?

আইনের ১০ ধারায় নাম নির্ধারণ না হলেও জন্মনিবন্ধনের সুযোগ রাখা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে নিবন্ধনের পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যে শিশুর নাম দিতে হবে।

৫. বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন না থাকলে কি সন্তানের জন্মনিবন্ধন আটকে যাবে?

এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় নথি ও করণীয় জেনে নিতে হবে। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের FAQ-তে বাবা-মায়ের বয়স প্রমাণের গ্রহণযোগ্য নথি দিয়ে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করার বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: