ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

হঠাৎ বুক ব্যথা ও ঘাম হলে কী করবেন? জেনে নিন জরুরি করণীয়

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৭ ১৭:২৫:০৭
হঠাৎ বুক ব্যথা ও ঘাম হলে কী করবেন? জেনে নিন জরুরি করণীয়

হঠাৎ বুকে চাপ বা ব্যথা অনুভব করার পাশাপাশি শরীর ঘেমে গেলে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে কিংবা মাথা ঘুরতে থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। এসব লক্ষণ হার্ট অ্যাটাকের সতর্কসংকেত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রামে রাখা এবং নিজের উদ্যোগে ওষুধ খাওয়ানো থেকে বিরত থাকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক সময় বুকের ব্যথাকে গ্যাস, অ্যাসিডিটি বা বদহজমের সমস্যা মনে করে মানুষ অপেক্ষা করেন। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের ব্যথাও কখনো কখনো জ্বালাপোড়া বা বদহজমের মতো অনুভূত হতে পারে। তাই বুকব্যথার সঙ্গে ঠান্ডা ঘাম, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব কিংবা শরীর দুর্বল হয়ে আসার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসা নিতে হবে।

হঠাৎ বুকব্যথা ও ঘাম হলে প্রথমে যা করবেন

বুকব্যথার সঙ্গে ঘাম হওয়া মানেই হার্ট অ্যাটাক নয়। তবে এটি হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন।

১. জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করুন

বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি বা ব্যথার সঙ্গে ঠান্ডা ঘাম, শ্বাসকষ্ট কিংবা ব্যথা হাত, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়লে জরুরি সাহায্য নিন। বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্সের সহায়তা চাইতে পারেন। লক্ষণ কমে যাওয়ার অপেক্ষা করবেন না।

২. আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রামে রাখুন

হাঁটাচলা, সিঁড়ি ভাঙা কিংবা শারীরিক পরিশ্রম বন্ধ করতে বলুন। তাঁকে এমন আরামদায়ক অবস্থানে বসতে বা আধশোয়া থাকতে সাহায্য করুন, যাতে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। অযথা নড়াচড়া করাবেন না।

৩. একা রাখবেন না

আক্রান্ত ব্যক্তির পাশে থাকুন এবং তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস ও সাড়া দেওয়ার অবস্থা খেয়াল করুন। জরুরি সেবার কর্মীরা ফোনে যে নির্দেশনা দেবেন, তা অনুসরণ করুন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁদের তাৎক্ষণিকভাবে জানান।

৪. নিজের গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না

বুকব্যথা ও ঘাম হলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালিয়ে হাসপাতালে যাবেন না। সম্ভব হলে অ্যাম্বুলেন্সের সহায়তা নিন। পথে শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ এতে সহজ হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাকের কোন লক্ষণগুলো চিনবেন?

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে এক রকম হয় না। কারও ক্ষেত্রে তীব্র বুকব্যথা দেখা দিতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে অস্বস্তি ধীরে শুরু হয়। সাধারণ সতর্কসংকেতগুলো হলো—

বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি, চেপে ধরা বা ব্যথা।

কয়েক মিনিট ধরে বুকের অস্বস্তি থাকা অথবা ব্যথা কমে গিয়ে আবার ফিরে আসা।

ব্যথা এক বা দুই হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পেটের দিকে ছড়িয়ে পড়া।

ঠান্ডা ঘাম হওয়া।

শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া।

বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।

মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা হালকা হয়ে আসার অনুভূতি।

এসব লক্ষণের সবগুলো একসঙ্গে দেখা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বুকের অস্বস্তির সঙ্গে ঘাম বা শ্বাসকষ্ট থাকলেও জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

গ্যাসের ব্যথা নাকি হার্ট অ্যাটাক—কীভাবে বুঝবেন?

বুকের ব্যথা গ্যাস, অ্যাসিডিটি, পেশির সমস্যা কিংবা হৃদ্‌যন্ত্রের অসুস্থতা—বিভিন্ন কারণে হতে পারে। কিন্তু শুধু ব্যথার ধরন বা অবস্থান দেখে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে এটি গ্যাসের সমস্যা, নাকি হার্ট অ্যাটাক।

হার্ট অ্যাটাকের সময়ও বুক জ্বালাপোড়া, পেট ভরা ভাব বা বদহজমের মতো অস্বস্তি হতে পারে। আবার বুকের ব্যথার সঙ্গে ঠান্ডা ঘাম, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব বা ব্যথা অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যার আশঙ্কা বাড়ে।

তাই আগে থেকে গ্যাসের সমস্যা থাকলেও নতুন ধরনের বুকব্যথাকে অবহেলা করা যাবে না। বিশেষ করে ব্যথা হঠাৎ শুরু হলে বা সঙ্গে অন্য সতর্কসংকেত থাকলে ঘরোয়া চিকিৎসা করে সময় নষ্ট না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।

সাহায্য আসা পর্যন্ত কী করবেন, কী করবেন না?

জরুরি চিকিৎসাসেবা আসার অপেক্ষায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখুন এবং শারীরিক পরিশ্রম করতে দেবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নতুন কোনো ওষুধ খাওয়ানো বা প্রচলিত ঘরোয়া উপায় প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকুন।

চিকিৎসক আগে থেকে এনজাইনার জন্য যে ওষুধ দিয়ে থাকলে, সেটি ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলে তা অনুসরণ করুন। অন্যের প্রেসক্রিপশনের ওষুধ নিজের সিদ্ধান্তে ব্যবহার করবেন না।

অ্যাসপিরিন কিছু ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে প্রাথমিক সহায়তার অংশ হতে পারে। তবে অ্যালার্জি, রক্তপাতের ঝুঁকি বা অন্য চিকিৎসাগত বাধা থাকতে পারে। তাই জরুরি সেবার কর্মী বা চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া নিজে থেকে এটি খাওয়ানো ঠিক নয়।

যা করবেন না:

ব্যথা কমানোর জন্য অপেক্ষা করে জরুরি চিকিৎসা নিতে দেরি করবেন না।

আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাঁটিয়ে বা দৌড় করিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।

গ্যাসের ওষুধ খাইয়ে দেখার জন্য সময় নষ্ট করবেন না।

চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া একাধিক ওষুধ দেবেন না।

আক্রান্ত ব্যক্তিকে একা ফেলে রাখবেন না।

আক্রান্ত ব্যক্তি অচেতন হয়ে গেলে কী করবেন?

বুকব্যথার পর কেউ অচেতন হয়ে গেলে প্রথমে দেখুন তিনি স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না। জরুরি সেবায় ফোন করুন। ব্যক্তি সাড়া না দিলে এবং স্বাভাবিক শ্বাস না থাকলে হৃদ্‌যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এ অবস্থায় প্রশিক্ষণ থাকলে দ্রুত সিপিআর (CPR) শুরু করুন। প্রশিক্ষণ না থাকলেও জরুরি সেবার ফোন অপারেটরের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। সম্ভব হলে আশপাশের কাউকে স্বয়ংক্রিয় বহিঃস্থ ডিফিব্রিলেটর (AED) আনতে বলুন, যদি সেটি পাওয়া যায়।

অচেতন কিন্তু স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন—এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে জরুরি সেবার নির্দেশনা অনুসরণ করুন এবং শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করুন।

কখন অবশ্যই হাসপাতালে যেতে হবে?

বুকের ব্যথা নতুন ধরনের হলে, কয়েক মিনিট ধরে থাকলে, বারবার ফিরে এলে কিংবা সঙ্গে ঠান্ডা ঘাম, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা বা শরীরের অন্য অংশে ব্যথা ছড়িয়ে পড়লে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে। ব্যথা কমে গেলেও হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না।

হার্ট অ্যাটাক নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরীক্ষা প্রয়োজন। হাসপাতালে উপসর্গের বিবরণ, ইসিজি (ECG) এবং রক্ত পরীক্ষাসহ প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন পরীক্ষা করা হতে পারে। ঘরে বসে শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

মনে রাখবেন: হঠাৎ বুকব্যথার সঙ্গে ঘাম হলে সেটিকে সাধারণ গ্যাসের সমস্যা ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তিকে বিশ্রামে রাখা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: হঠাৎ বুকব্যথা ও ঘাম হলে প্রথমে কী করবেন?

উত্তর: শারীরিক পরিশ্রম বন্ধ করে আরামদায়ক অবস্থানে থাকুন এবং হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা থাকলে জরুরি চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করুন। বাংলাদেশে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্সের সহায়তা চাইতে পারেন।

প্রশ্ন ২: গ্যাসের কারণে কি বুকব্যথা ও ঘাম হতে পারে?

উত্তর: বুকের অস্বস্তি গ্যাস বা অ্যাসিডিটির কারণে হতে পারে, তবে শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। বুকব্যথার সঙ্গে ঠান্ডা ঘাম বা শ্বাসকষ্ট থাকলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

প্রশ্ন ৩: হার্ট অ্যাটাক হলে কি সব সময় তীব্র বুকব্যথা হয়?

উত্তর: না। কারও তীব্র ব্যথা হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে হালকা চাপ, বদহজমের মতো অস্বস্তি, শ্বাসকষ্ট, ঘাম বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন ৪: বুকব্যথা কমে গেলে কি হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই?

উত্তর: প্রয়োজন থাকতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের অস্বস্তি কমে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে। সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে ব্যথা কমলেও জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

প্রশ্ন ৫: বুকব্যথা হলে নিজে থেকে অ্যাসপিরিন খাওয়া উচিত কি?

উত্তর: সবার জন্য অ্যাসপিরিন নিরাপদ নয়। অ্যালার্জি বা রক্তপাতের ঝুঁকির মতো বিষয় থাকতে পারে। জরুরি সেবার কর্মী বা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করাই নিরাপদ।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: