ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

মুখে ব্রণ বাড়ছে? খাবারের তালিকায় আনুন এই পরিবর্তন

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৪ ১৫:১৭:০০
মুখে ব্রণ বাড়ছে? খাবারের তালিকায় আনুন এই পরিবর্তন

মুখে ব্রণ হলে অনেকেই শুধু প্রসাধনী বদলান, বারবার মুখ ধোন কিংবা নতুন নতুন ঘরোয়া উপায় চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্রণের সঙ্গে খাবারেরও কিছুটা সম্পর্ক থাকতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ গ্লাইসেমিক সূচকযুক্ত খাবার এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে গরুর দুধ গ্রহণের সঙ্গে ব্রণের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে সব মানুষের ক্ষেত্রে একই খাবার ব্রণ বাড়ায় না, আবার কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেলেই ব্রণ সেরে যাবে—এমন প্রমাণও নেই।

ব্রণ কমাতে তাই খাবারের তালিকায় ভারসাম্য রাখা, অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করা কমানো এবং নিজের ত্বকে কোন খাবার প্রভাব ফেলছে তা লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, ব্রণ একটি সাধারণ ত্বকের সমস্যা, যার পেছনে হরমোন, ত্বকে অতিরিক্ত তেল উৎপাদন, মৃত কোষ জমা ও প্রদাহের মতো একাধিক কারণ কাজ করে। শুধু খাবার পরিবর্তন করেই সব ধরনের ব্রণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

ব্রণ কমাতে কোন খাবার খাওয়া ভালো?

ব্রণ নিয়ন্ত্রণে সবার জন্য কার্যকর এমন কোনো নির্দিষ্ট খাবারের তালিকা নেই। তবে পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ত্বকের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে।

১. শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার

শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি এবং অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবার সুষম খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলো খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে—বিশেষ করে যখন এগুলো পরিশোধিত শর্করার পরিবর্তে খাওয়া হয়।

পালংশাক, লালশাক, গাজর, ব্রকলি, শসা ও অন্যান্য মৌসুমি সবজি নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে কোনো একটি সবজি সরাসরি ব্রণ সারিয়ে দেয়, এমন প্রমাণ নেই।

২. কম প্রক্রিয়াজাত শস্য ও পূর্ণশস্য

সাদা পাউরুটি, মিষ্টি সিরিয়াল বা অতিরিক্ত পরিশোধিত শস্যের পরিবর্তে ওটস, লাল চাল, আটার রুটি এবং অন্যান্য পূর্ণশস্য বেছে নেওয়া ভালো। এসব খাবারে সাধারণত আঁশ বেশি থাকে এবং এগুলো সুষম খাদ্যাভ্যাস গঠনে সহায়ক।

ব্রণ নিয়ে কিছু গবেষণায় কম গ্লাইসেমিক খাদ্যাভ্যাসের সম্ভাব্য উপকার দেখা গেছে। তবে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে কতটা উন্নতি হবে, তা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।

৩. মাছ, ডিম ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার

মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, ডাল, ছোলা ও বাদাম শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিনসহ বিভিন্ন পুষ্টি সরবরাহ করে। মাছের কিছু প্রজাতিতে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা শরীরের স্বাভাবিক প্রদাহ-নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।

তবে মাছ, ডিম বা কোনো নির্দিষ্ট প্রোটিন খেলেই ব্রণ কমবে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। এগুলোকে সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে খাওয়াই যুক্তিযুক্ত।

৪. ফলমূল ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার

কমলা, পেয়ারা, পেঁপে, আপেল, বেরি ও অন্যান্য আস্ত ফল ভিটামিন, খনিজ ও আঁশের ভালো উৎস। ফলের রসের পরিবর্তে গোটা ফল খেলে সাধারণত বেশি আঁশ পাওয়া যায়।

ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্রণ কমানোর আশায় প্রয়োজন ছাড়া উচ্চমাত্রার ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে অতিরিক্ত ভিটামিন এ শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

৫. পর্যাপ্ত পানি ও সুষম খাবার

পর্যাপ্ত পানি পান করা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে বেশি পানি খেলেই ব্রণ দূর হয়ে যায়, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

পানির পাশাপাশি নিয়মিত খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ত্বকের যত্নের অংশ হতে পারে।

ব্রণ বাড়াতে পারে কোন খাবার?

খাবার ও ব্রণের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান। কিছু খাবারের সঙ্গে ব্রণের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও তা সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না। তাই অকারণে অনেক খাবার বাদ না দিয়ে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো বোঝা জরুরি।

১. অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার

মিষ্টি, ক্যান্ডি, চিনিযুক্ত পানীয়, কেক, বিস্কুট এবং অতিরিক্ত চিনি দেওয়া খাবার নিয়মিত বেশি খেলে খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের জায়গা কমে যেতে পারে। এসব খাবারের অনেকগুলোর গ্লাইসেমিক প্রভাবও বেশি।

উচ্চ গ্লাইসেমিক খাদ্যাভ্যাস রক্তে শর্করা ও ইনসুলিনের মাত্রায় পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যা কিছু ক্ষেত্রে ব্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোন ও ত্বকের তেল উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চিনি খেলেই ব্রণ হবে—এমন সরল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত নয়।

২. সাদা পাউরুটি ও পরিশোধিত শর্করা

সাদা পাউরুটি, ময়দার তৈরি কিছু খাবার, মিষ্টি সিরিয়াল এবং অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার দ্রুত হজম হয়ে রক্তে শর্করা বাড়াতে পারে।

এসব খাবার সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে আঁশযুক্ত ও কম প্রক্রিয়াজাত বিকল্প বেছে নেওয়া যেতে পারে।

৩. চিনিযুক্ত কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংক

চিনিযুক্ত কোমল পানীয়, মিষ্টি চা-কফি এবং এনার্জি ড্রিংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চিনি থাকতে পারে। নিয়মিত এসব পানীয় খাওয়ার পরিবর্তে পানি বা চিনি ছাড়া পানীয় বেছে নেওয়া ভালো।

এতে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের মান উন্নত হতে পারে। তবে শুধু কোমল পানীয় বন্ধ করলেই ব্রণ সেরে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

৪. গরুর দুধ: সবার জন্য কি এড়িয়ে চলা দরকার?

কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় গরুর দুধ পান এবং ব্রণের মধ্যে সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে এসব গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে দুধই ব্রণের কারণ। ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাস, হরমোন ও অন্যান্য বিষয়ও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

আরও পড়ুন:

হঠাৎ বুক ধড়ফড় করে কেন? ৮টি সম্ভাব্য কারণ জেনে নিন

খালি পেটে গ্যাস কেন বাড়ে? কী খাবেন, কী এড়িয়ে চলবেন

দুধ খাওয়ার পর নিয়মিত ব্রণ বাড়ছে বলে মনে হলে কয়েক সপ্তাহ নিজের উপসর্গ ও খাদ্যাভ্যাস নথিভুক্ত করে দেখা যেতে পারে। প্রয়োজনে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন। দুধ বাদ দিলে ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা জরুরি।

৫. ফাস্ট ফুড ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার

বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, পিৎজা বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট খাবার সরাসরি ব্রণ সৃষ্টি করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তবে এসব খাবারের কিছুতে পরিশোধিত শর্করা, লবণ ও ক্যালরির পরিমাণ বেশি থাকতে পারে।

তাই ব্রণ কমানোর জন্য সব ফাস্ট ফুডকে নিষিদ্ধ না করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ বাড়ানো বেশি বাস্তবসম্মত।

ব্রণ কমাতে কত দিনে খাবারের পরিবর্তনের ফল পাওয়া যায়?

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলেই কয়েক দিনের মধ্যে ব্রণ কমে যাবে—এমন আশা করা ঠিক নয়। গবেষণায় কম গ্লাইসেমিক খাদ্যাভ্যাসের সম্ভাব্য উপকার দেখা গেলেও পরিবর্তন বুঝতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। ত্বকের ব্রণের ধরন, তীব্রতা ও অন্যান্য কারণের ওপর ফল নির্ভর করে।

খাবারের পরিবর্তনের পাশাপাশি মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা, ব্রণ খোঁটাখুঁটি না করা এবং ত্বকের উপযোগী, রোমকূপ বন্ধ না করে এমন প্রসাধনী ব্যবহার করা সহায়ক হতে পারে।

ব্রণ হলে কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন?

ব্রণ দ্রুত সারানোর আশায় একসঙ্গে অনেক খাবার বাদ দেবেন না।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার ভিটামিন বা জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট খাবেন না।

ব্রণ চেপে ফাটাবেন না; এতে দাগ ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

লেবুর রস, টুথপেস্ট বা ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে এমন উপাদান সরাসরি ব্রণে লাগাবেন না।

শুধু খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পিছিয়ে দেবেন না।

কখন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন?

ব্রণ যদি গভীর, ব্যথাযুক্ত বা বড় গুটির মতো হয়, দাগ তৈরি হতে থাকে, দীর্ঘদিনেও না কমে কিংবা মানসিক অস্বস্তি তৈরি করে, তাহলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ত্বকে লাগানোর ওষুধ, মুখে খাওয়ার ওষুধ বা অন্য চিকিৎসা দিতে পারেন।

ব্রণ কমাতে কোনো একক খাবারের ওপর নির্ভর না করে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করা কমানো এবং নিজের ত্বকের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা ভালো। গরুর দুধসহ কোনো খাবার সবার জন্য নিষিদ্ধ নয়। ব্রণ দীর্ঘস্থায়ী বা গুরুতর হলে সঠিক চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য: এই প্রতিবেদন সাধারণ সচেতনতার জন্য। ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. ব্রণ কমাতে সবচেয়ে ভালো কোন খাবার?

ব্রণ কমানোর জন্য একক কোনো সেরা খাবার নেই। শাকসবজি, আস্ত ফল, ডাল, পূর্ণশস্য ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার দিয়ে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।

২. চিনি খেলে কি ব্রণ বাড়ে?

উচ্চ গ্লাইসেমিক সূচকযুক্ত খাবার ও পানীয়ের সঙ্গে ব্রণের সম্পর্ক কিছু গবেষণায় পাওয়া গেছে। তবে চিনি খেলেই সবার ব্রণ বাড়বে, এমন নয়।

৩. ব্রণ হলে কি দুধ খাওয়া বন্ধ করতে হবে?

না। গরুর দুধ ও ব্রণের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে কিছু গবেষণা থাকলেও প্রমাণ চূড়ান্ত নয়। দুধ খাওয়ার সঙ্গে নিজের ব্রণের পরিবর্তন নিয়মিত লক্ষ্য করুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।

৪. শুধু খাবার পরিবর্তন করলেই কি ব্রণ সেরে যায়?

না। ব্রণের পেছনে হরমোন, অতিরিক্ত তেল উৎপাদন, রোমকূপ বন্ধ হয়ে যাওয়া ও প্রদাহের মতো কারণ কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে ত্বকের যত্ন ও চিকিৎসারও প্রয়োজন হয়।

৫. ব্রণ কমাতে কত দিন খাবারের নিয়ম মেনে চলতে হবে?

নির্দিষ্ট সময় সবার জন্য এক নয়। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে উপকার হলে তা বুঝতে কয়েক সপ্তাহ লাগতে পারে। ব্রণ গুরুতর হলে বা দাগ তৈরি হলে শুধু খাবারের পরিবর্তনের অপেক্ষা না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: