ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১ কার্তিক ১৪৩৩

বুক জ্বালা কি শুধুই গ্যাস? যে লক্ষণে দেরি করা বিপজ্জনক

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৬ ১৬:০৪:২৯
বুক জ্বালা কি শুধুই গ্যাস? যে লক্ষণে দেরি করা বিপজ্জনক

খাওয়ার পর বা রাতে শুতে গেলেই বুকের মাঝখানে জ্বালাপোড়া অনেকেই সাধারণ গ্যাস ভেবে এড়িয়ে যান। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কারণ পাকস্থলীর অ্যাসিডই। তবে কিছু ক্ষেত্রে এই একই অনুভূতি হৃদরোগের মতো গুরুতর সমস্যারও লক্ষণ হতে পারে। তাই কোন জ্বালা সাধারণ আর কোনটি বিপজ্জনক, তা চেনা জরুরি।

বুক জ্বালা আসলে কী

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে হার্টবার্ন বলা হয়। পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে এলে বুকের মাঝামাঝি বা বুকের হাড়ের পেছনে জ্বালা অনুভূত হয়। অনেক সময় মুখে টক বা তেতো স্বাদও আসে। বাংলায় একে সাধারণত গ্যাস্ট্রিক বা অম্বল বলা হয়।

খাদ্যনালি ও পাকস্থলীর সংযোগস্থলে একটি পেশির ঢাকনা থাকে। এটি খাবার নামার পর বন্ধ হয়ে অ্যাসিডকে ওপরে উঠতে বাধা দেয়। ঢাকনাটি দুর্বল হলে বা ঠিকমতো বন্ধ না হলে অ্যাসিড ওপরে ফিরে আসে। একে বলা হয় অ্যাসিড রিফ্লাক্স।

যেসব কারণে সাধারণত বুক জ্বালা হয়

বেশি পরিমাণে খাওয়া কিংবা খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া

অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত বা ভাজাপোড়া খাবার

চা, কফি, চকলেট, কোমল পানীয়, টক জাতীয় ফল ও টমেটো

ধূমপান ও অ্যালকোহল

অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের চর্বি

গর্ভাবস্থা

কিছু ওষুধ, যেমন ব্যথানাশক (এনএসএআইডি জাতীয়)

মানসিক চাপ, যা লক্ষণ বাড়িয়ে দিতে পারে

কখন একে জিইআরডি বলা হয়

মাঝেমধ্যে বুক জ্বালা প্রায় সবারই হয়। কিন্তু সপ্তাহে দুই বা তার বেশি দিন এই সমস্যা হলে সেটি গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা জিইআরডি হতে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা না নিলে খাদ্যনালিতে প্রদাহ, ঘা বা সংকীর্ণতার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই বারবার ফিরে আসা জ্বালা অবহেলা করা ঠিক নয়।

গ্যাস ছাড়াও যেসব সমস্যায় বুক জ্বালা হতে পারে

পেপটিক আলসার: পাকস্থলী বা ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশে ঘা হলে ওপরের পেটে জ্বালা ও ব্যথা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি নামের জীবাণু এর কারণ।

গ্যাস্ট্রাইটিস: পাকস্থলীর প্রদাহ।

হায়াটাস হার্নিয়া: পাকস্থলীর একটি অংশ ডায়াফ্রাম পেশির ওপরের দিকে ঠেলে উঠলে রিফ্লাক্স বাড়তে পারে।

পিত্তথলির সমস্যা: পাথর বা প্রদাহে ডান দিকের ওপরের পেটে ব্যথা হয়, যা অনেক সময় বুক-পেটের ওপরের অংশে অনুভূত হয়।

হৃদরোগ: হৃদ্‌যন্ত্রে রক্ত সরবরাহ কমে গেলে (এনজাইনা বা হার্ট অ্যাটাক) বুকে চাপ, ভার বা জ্বালার মতো অনুভূতি হতে পারে।

হৃদরোগের ব্যথা চিনবেন যেভাবে

হৃদরোগজনিত বুকের ব্যথা অনেক সময় গ্যাসের ব্যথার মতোই মনে হয়। তাই শুধু অনুভূতি দেখে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন:

বুকে চাপ, ভার বা চেপে ধরার মতো ব্যথা, যা কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়

ব্যথা বাম হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া

শ্বাসকষ্ট

ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি

বমি বমি ভাব বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা

পরিশ্রম বা হাঁটাহাঁটির সময় ব্যথা বাড়া

নারী, প্রবীণ ও ডায়াবেটিসের রোগীদের হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ অনেক সময় অস্পষ্ট হয়। বুকে ব্যথা ছাড়াও শুধু শ্বাসকষ্ট, অস্বস্তি, বমি ভাব বা অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।

যেসব লক্ষণে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে

খাবার গিলতে কষ্ট বা গলায় খাবার আটকে যাওয়ার মতো অনুভূতি

অকারণে ওজন কমে যাওয়া

বারবার বমি, বিশেষ করে রক্তমিশ্রিত বমি

কালো আলকাতরার মতো পায়খানা

দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে লক্ষণ থাকা

ওষুধ খেয়েও উপশম না হওয়া

দীর্ঘস্থায়ী কাশি, গলা বসে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট

নিজে থেকে যা করতে পারেন

একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েক বেলায় খান

রাতের খাবার ঘুমানোর অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে সেরে ফেলুন

যে খাবারে জ্বালা বাড়ে, তা চিহ্নিত করে এড়িয়ে চলুন

ধূমপান ও অ্যালকোহল ছাড়ুন

ওজন বেশি হলে তা কমানোর চেষ্টা করুন

রাতে শোয়ার সময় মাথার দিকের অংশ কিছুটা উঁচু রাখুন

আঁটসাঁট পোশাক এড়িয়ে চলুন

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ব্যথানাশক খাবেন না

অ্যান্টাসিড জাতীয় ওষুধ সাময়িক আরাম দিতে পারে। তবে নিয়মিত বা দীর্ঘদিন ওষুধ খেতে হলে কারণ খুঁজে বের করতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। প্রয়োজনে চিকিৎসক এন্ডোস্কপি বা অন্যান্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার জন্য লেখা। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। নিজের বা পরিবারের কারও বুকের ব্যথা নিয়ে সন্দেহ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. বুক জ্বালা কেন হয়?

সাধারণত পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে এলে (অ্যাসিড রিফ্লাক্স) বুক জ্বালা করে। বেশি খাওয়া, খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়া, তেল-মসলাযুক্ত খাবার, ধূমপান ও অতিরিক্ত ওজন এর সাধারণ কারণ।

২. বুক জ্বালা কি সবসময় গ্যাসের কারণে হয়?

না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অ্যাসিড রিফ্লাক্সই কারণ হলেও পেপটিক আলসার, গ্যাস্ট্রাইটিস, হায়াটাস হার্নিয়া, পিত্তথলির সমস্যা এমনকি হৃদরোগের কারণেও একই ধরনের অনুভূতি হতে পারে।

৩. গ্যাসের ব্যথা আর হার্ট অ্যাটাকের ব্যথার পার্থক্য কীভাবে বুঝব?

শুধু অনুভূতি দেখে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। বুকে চাপ বা ভার, বাম হাত-চোয়াল-পিঠে ব্যথা ছড়ানো, শ্বাসকষ্ট ও ঠান্ডা ঘাম থাকলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

৪. কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত?

সপ্তাহে দুই দিনের বেশি জ্বালা হলে, দুই সপ্তাহের বেশি সময় লক্ষণ থাকলে, খাবার গিলতে কষ্ট হলে, ওজন কমে গেলে, রক্তবমি বা কালো পায়খানা হলে।

৫. বুক জ্বালা কমাতে কী করা যায়?

অল্প অল্প করে খাওয়া, খাওয়ার পর দুই-তিন ঘণ্টা না শোয়া, জ্বালা বাড়ায় এমন খাবার এড়ানো, ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সাহায্য করে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: