ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩

প্রতিদিন মাথাব্যথা হয় কেন? যেসব লক্ষণ অবহেলা নয়

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৩ ১৫:৩৫:২৬
প্রতিদিন মাথাব্যথা হয় কেন? যেসব লক্ষণ অবহেলা নয়

প্রায় প্রতিদিন মাথাব্যথা হলে সেটিকে শুধু ক্লান্তি, ঘুমের অভাব কিংবা কাজের চাপের ফল ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। পানিশূন্যতা, অনিয়মিত খাবার, মানসিক চাপ, চোখের সমস্যা বা মাইগ্রেনের মতো কারণে মাথাব্যথা হতে পারে। আবার ঘন ঘন ব্যথার ওষুধ খাওয়ার কারণেও মাথাব্যথা বাড়তে পারে। বেশির ভাগ মাথাব্যথা গুরুতর নয়, তবে ব্যথা নিয়মিত হলে, আগের চেয়ে বাড়তে থাকলে কিংবা সঙ্গে অন্য উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মাথার কোন অংশে ব্যথা হচ্ছে, কতক্ষণ থাকছে, কী ধরনের ব্যথা হচ্ছে এবং কখন তা শুরু হচ্ছে—এসব তথ্য কারণ বুঝতে সাহায্য করে। বিশেষ করে হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা বা মাথাব্যথার সঙ্গে শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা বলতে অসুবিধা কিংবা জ্বর ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

প্রতিদিন মাথাব্যথা হওয়ার সম্ভাব্য কারণ

মাথাব্যথার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। শুধু ব্যথার ধরন দেখে নিশ্চিতভাবে কারণ নির্ণয় করা যায় না। তবে কয়েকটি বিষয় নিয়মিত মাথাব্যথার সঙ্গে সম্পর্কিত।

১. ঘুমের অভাব ও অনিয়মিত ঘুম

প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, রাত জেগে থাকা কিংবা ঘুমের সময় বারবার পরিবর্তিত হলে মাথাব্যথা হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঘুমের পরিবর্তনও ব্যথার কারণ হতে পারে। তাই প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস উপকারী।

২. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ

কাজের চাপ, দুশ্চিন্তা কিংবা দীর্ঘ সময় মানসিক চাপে থাকলে টেনশন-টাইপ মাথাব্যথা হতে পারে। এ ধরনের ব্যথায় মাথার দুই পাশে চাপ অনুভূত হতে পারে, যেন মাথার চারপাশ শক্ত করে বাঁধা রয়েছে। ঘাড় ও কাঁধের পেশিতে টানও থাকতে পারে।

৩. পর্যাপ্ত পানি না পান করা

শরীরে পানির ঘাটতি বা পানিশূন্যতা মাথাব্যথার একটি পরিচিত কারণ। গরমে বেশি ঘাম হওয়া, দীর্ঘ সময় বাইরে থাকা কিংবা পর্যাপ্ত পানি না পান করার পর এমন ব্যথা দেখা দিতে পারে। তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণও থাকতে পারে।

৪. সময়মতো খাবার না খাওয়া

দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা নিয়মিত খাবারের সময় এড়িয়ে গেলে কারও কারও মাথাব্যথা হতে পারে। যাঁদের মাইগ্রেন আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে খাবার বাদ দেওয়া ব্যথা শুরু হওয়ার একটি উদ্দীপক হতে পারে। তাই নিয়মিত খাবার খাওয়া এবং দীর্ঘ সময় খালি পেটে না থাকার চেষ্টা করা উচিত।

৫. মাইগ্রেন

মাইগ্রেন এমন এক ধরনের মাথাব্যথা, যা অনেকের ক্ষেত্রে বারবার ফিরে আসে। ব্যথা সাধারণত মাথার এক পাশে বেশি হতে পারে, তবে দুই পাশেও হতে পারে। ব্যথা স্পন্দনের মতো অনুভূত হতে পারে এবং চলাফেরায় বাড়তে পারে। বমি বমি ভাব, বমি, আলো বা শব্দে অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।

মাইগ্রেনের আক্রমণ কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ঘন ঘন এমন ব্যথা হলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন, কারণ উপযুক্ত চিকিৎসায় আক্রমণের সংখ্যা ও তীব্রতা কমানো সম্ভব।

৬. দীর্ঘ সময় স্ক্রিন দেখা ও চোখের সমস্যা

কম্পিউটার, মোবাইল বা অন্য ডিজিটাল পর্দার দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকলে চোখে ক্লান্তি এবং মাথাব্যথা হতে পারে। ভুল চশমা ব্যবহার বা দৃষ্টিশক্তির সমস্যাও মাথাব্যথার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

একটানা স্ক্রিন ব্যবহার না করে বিরতি নেওয়া, আলো ও বসার অবস্থান ঠিক রাখা এবং দৃষ্টিতে সমস্যা থাকলে চোখ পরীক্ষা করানো উপকারী।

৭. অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া

মাথাব্যথা হলেই বারবার ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস উল্টো ব্যথা বাড়িয়ে দিতে পারে। একে ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত মাথাব্যথা বলা হয়। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত ব্যথানাশক গ্রহণ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।

আরও পড়ুন:

দিনে কতটা মধু খেলে ক্ষতি নেই, জানালেন পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা

মাথা ভার ভার লাগে কেন? কখন বুঝবেন সমস্যা গুরুতর

কত ঘন ঘন ওষুধ খাচ্ছেন, কোন ওষুধ নিচ্ছেন এবং কত দিন ধরে নিচ্ছেন—এসব চিকিৎসককে জানানো উচিত। নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের মাত্রা বাড়ানো বা দীর্ঘদিন নিয়মিত সেবন করা ঠিক নয়।

৮. অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতা

সর্দি-জ্বর, সাইনাসের সমস্যা এবং কিছু অন্যান্য শারীরিক অবস্থার সঙ্গেও মাথাব্যথা হতে পারে। কখনো মাথায় আঘাত, সংক্রমণ বা স্নায়ুতন্ত্রের গুরুতর সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথার ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ কারণ ধরে নেওয়া উচিত নয়।

কখন প্রতিদিনের মাথাব্যথা চিন্তার কারণ?

মাথাব্যথা বারবার হলে সব সময় জরুরি বিপদের অর্থ হয় না। কিন্তু ব্যথার ধরন, তীব্রতা ও সঙ্গে থাকা উপসর্গের ভিত্তিতে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন নির্ধারণ করতে হয়।

নিচের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:

মাথাব্যথা নিয়মিত হচ্ছে বা আগের চেয়ে বেশি ঘন ঘন হচ্ছে।

ব্যথার তীব্রতা বাড়ছে কিংবা স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্রাম নেওয়া বা প্রচলিত চিকিৎসার পরও ব্যথা কমছে না।

নতুন ধরনের মাথাব্যথা শুরু হয়েছে বা আগের ব্যথার ধরন বদলে গেছে।

মাথাব্যথার সঙ্গে বারবার বমি, দৃষ্টির পরিবর্তন বা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ হচ্ছে।

কাশি, হাঁচি, শরীর বাঁকানো বা ব্যায়ামের সময় মাথাব্যথা শুরু হচ্ছে কিংবা বেড়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে নতুন করে মাথাব্যথা শুরু হলে এবং বয়স ৫০ বছরের বেশি হলে, অথবা মাথায় আঘাতের পর ব্যথা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

যেসব লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে

কিছু মাথাব্যথা গুরুতর ও জীবনহানিকর সমস্যার সংকেত হতে পারে। নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে অপেক্ষা না করে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যেতে হবে:

হঠাৎ শুরু হওয়া অত্যন্ত তীব্র মাথাব্যথা, যা অল্প সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছে যায়।

মাথাব্যথার সঙ্গে শরীরের এক পাশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া।

কথা বলতে, বুঝতে, হাঁটতে বা ভারসাম্য রাখতে নতুন করে অসুবিধা হওয়া।

অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব।

জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা তীব্র মাথাব্যথা।

মাথায় আঘাতের পর তীব্র বা বাড়তে থাকা ব্যথা।

হঠাৎ দৃষ্টি হারানো বা নতুন গুরুতর দৃষ্টিসমস্যা।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে ঘরে বসে ব্যথা কমার অপেক্ষা করা উচিত নয়। নিজে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পরিবর্তে অন্যের সহায়তা নেওয়া নিরাপদ।

মাথাব্যথা কমাতে দৈনন্দিন জীবনে কী করবেন?

মাথাব্যথার কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা আলাদা হতে পারে। তবে কিছু অভ্যাস মাথাব্যথার উদ্দীপক কমাতে সহায়তা করতে পারে।

নিয়মিত ঘুমান: প্রতিদিন ঘুমানোর ও ওঠার সময় কাছাকাছি রাখুন।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন: শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করুন, বিশেষ করে গরমে বা ঘাম বেশি হলে।

সময়মতো খাবার খান: দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা এড়িয়ে চলুন।

স্ক্রিন ব্যবহারে বিরতি নিন: দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের মাঝে বিরতি নিন এবং চোখে সমস্যা থাকলে পরীক্ষা করান।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন: হালকা ব্যায়াম, বিশ্রাম ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন অনেকের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে।

মাথাব্যথার ডায়েরি রাখুন: কোন সময়ে ব্যথা হয়, কতক্ষণ থাকে, কোথায় ব্যথা করে, আগের রাতে কেমন ঘুম হয়েছে, খাবার বা পানির অভ্যাস কেমন ছিল এবং কী ওষুধ নিয়েছেন—এসব লিখে রাখুন। এতে চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভাব্য কারণ শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

নিজে থেকে নিয়মিত ব্যথার ওষুধ খাবেন না: বারবার ওষুধের প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

প্রতিদিন মাথাব্যথা হলে কোন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

প্রথমে একজন সাধারণ চিকিৎসক বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী তিনি স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ বা অন্য বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে পারেন। মাথাব্যথার ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করা হয়। প্রত্যেক মাথাব্যথার জন্য মস্তিষ্কের স্ক্যান প্রয়োজন হয় না; পরীক্ষা নির্ভর করে চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর।

মনে রাখতে হবে, মাথাব্যথা হলেই মস্তিষ্কে টিউমার বা গুরুতর রোগ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। আবার প্রতিদিন ব্যথা হচ্ছে বলে বিষয়টি উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। নিয়মিত মাথাব্যথার কারণ শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্য সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্যের জন্য। এটি ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। মাথাব্যথা হঠাৎ তীব্র হলে বা বিপৎসংকেত দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিন।

পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

১. প্রতিদিন মাথাব্যথা হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ কী?

ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, পানিশূন্যতা, অনিয়মিত খাবার, মাইগ্রেন, চোখের সমস্যা এবং অতিরিক্ত ব্যথানাশক ব্যবহারের মতো একাধিক কারণে মাথাব্যথা হতে পারে। নির্দিষ্ট কারণ জানতে উপসর্গ ও চিকিৎসার ইতিহাস মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

২. প্রতিদিন মাথাব্যথা হলে কি মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে?

না। প্রতিদিন মাথাব্যথা হলেই মস্তিষ্কে টিউমার হয়েছে, এমন নয়। মাথাব্যথার অনেক সাধারণ কারণ রয়েছে। তবে ব্যথা নতুন ধরনের হলে, ক্রমাগত বাড়লে বা অন্য বিপৎসংকেত থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

৩. মাথাব্যথা হলে কখন হাসপাতালে যেতে হবে?

হঠাৎ অত্যন্ত তীব্র মাথাব্যথা, শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা বলতে অসুবিধা, খিঁচুনি, বিভ্রান্তি, জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা মাথায় আঘাতের পর তীব্র ব্যথা হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

৪. প্রতিদিন মাথাব্যথা হলে কি ব্যথানাশক খাওয়া নিরাপদ?

বারবার নিজের সিদ্ধান্তে ব্যথানাশক খাওয়া নিরাপদ নাও হতে পারে। কিছু ওষুধ অতিরিক্ত ব্যবহারে মাথাব্যথা আরও ঘন ঘন হতে পারে। তাই নিয়মিত ওষুধের প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৫. মাথাব্যথার কারণ বুঝতে কী তথ্য লিখে রাখা দরকার?

ব্যথা কখন শুরু হয়, কতক্ষণ থাকে, মাথার কোথায় হয়, তীব্রতা কেমন, সঙ্গে বমি বা দৃষ্টির সমস্যা আছে কি না, ঘুম ও খাবারের অভ্যাস এবং কী ওষুধ নেওয়া হয়েছে—এসব লিখে রাখলে চিকিৎসকের মূল্যায়নে সহায়তা হয়।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: