এনআইডি কার্ডে নাম ভুল? অনলাইনে সংশোধনের নিয়ম জেনে নিন
জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের নামের একটি অক্ষর ভুল থাকলেও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে। শিক্ষাগত সনদে এক নাম, এনআইডিতে আরেক নাম কিংবা বাংলা ও ইংরেজি বানানে অমিল থাকলে ব্যাংক হিসাব খোলা, পাসপোর্ট তৈরি, চাকরিতে আবেদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে জটিলতা। তবে এ ধরনের ভুল সংশোধনের জন্য নাগরিকদের সরাসরি নির্বাচন অফিসে গিয়ে আবেদন শুরু করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অনলাইন সেবা ব্যবহার করেই জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম সংশোধনের আবেদন করা যায়।
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, এনআইডিতে কোনো তথ্য পরিবর্তনের আবেদন করলে সংশোধনের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র জমা দিতে হয়। আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনায় এসএসসি বা সমমানের সনদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে শুধু অনলাইনে নাম পরিবর্তন করে দিলেই সংশোধন সম্পন্ন হবে না; জমা দেওয়া নথি যাচাইয়ের পরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নাম সংশোধনের আগে যেসব বিষয় জানা জরুরি
এনআইডিতে নামের ভুল বলতে সব সময় একই ধরনের সমস্যা বোঝায় না। কারও নামের বানানে সামান্য ভুল থাকে, কারও ক্ষেত্রে নামের একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। আবার কারও জাতীয় পরিচয়পত্রে ব্যবহৃত নামের সঙ্গে শিক্ষাগত সনদ বা জন্মনিবন্ধনের নামের বড় ধরনের পার্থক্য থাকে।
এই পার্থক্যগুলো মাথায় রেখে আবেদন করা প্রয়োজন। কারণ সাধারণ বানান সংশোধন এবং নিজের নাম সম্পূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের চাওয়া প্রমাণপত্র এক রকম নয়।
বিশেষ করে যাদের এসএসসি বা সমমানের সনদ রয়েছে, তাদের সংশোধনের আবেদনে ওই সনদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে শিক্ষাগত সনদ না থাকলে জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গ্রহণযোগ্য দলিল দিয়ে সঠিক নামের প্রমাণ দিতে হতে পারে।
ঘরে বসে এনআইডির নাম সংশোধনের আবেদন যেভাবে করবেন
নাম সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় নিজের পরিচয় যাচাই, তথ্য সম্পাদনা, প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধের ধাপ রয়েছে।
আবেদনের শুরুতে ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলুন
প্রথমে https://services.nidw.gov.bd/ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে হবে। আগে থেকে অ্যাকাউন্ট তৈরি করা থাকলে সেটিতে লগইন করলেই চলবে। নতুন ব্যবহারকারীদের নিবন্ধনের জন্য এনআইডি নম্বর অথবা ফরম নম্বর, জন্মতারিখ এবং প্রয়োজনীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে।
নিবন্ধনের সময় সচল মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা উচিত। পরিচয় যাচাইয়ের জন্য মোবাইলে পাঠানো কোড দিতে হতে পারে। পাশাপাশি পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী NID Wallet অ্যাপের মাধ্যমে মুখমণ্ডল যাচাই করার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রোফাইলে গিয়ে ভুল তথ্য সম্পাদনা করুন
অ্যাকাউন্টে প্রবেশের পর ব্যক্তিগত তথ্যের অংশে যেতে হবে। সেখানে থাকা নামের তথ্য পরীক্ষা করে সম্পাদনার অপশন থেকে ভুল অংশটি পরিবর্তন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষায় নামের বানান মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। এনআইডিতে যে বানানটি রাখতে চান, সেটি যেন আপনার গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় তথ্য পরিবর্তন না করাই ভালো। আবেদনে যতটুকু সংশোধন প্রয়োজন, সেটুকুই উল্লেখ করা উচিত।
সঠিক নামের পক্ষে কাগজপত্র যুক্ত করুন
নাম সংশোধনের আবেদনে শুধু নতুন নাম লিখে জমা দিলেই হবে না। কেন সংশোধন প্রয়োজন এবং সঠিক নাম কী, তা প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করতে হবে।
আবেদনের ধরন অনুযায়ী যেসব কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
এসএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ।
জন্মনিবন্ধন সনদ।
পাসপোর্টের কপি।
ড্রাইভিং লাইসেন্স।
বিবাহসংক্রান্ত তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাবিননামা।
চাকরিসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে সার্ভিস বুক বা সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, তালিকার সব নথি প্রত্যেক আবেদনকারীর জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ব্যক্তির পরিস্থিতি এবং সংশোধনের ধরন অনুযায়ী প্রমাণপত্র নির্ধারিত হয়। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে অতিরিক্ত দলিলও চাইতে পারে।
আবেদন জমা দেওয়ার আগে তথ্য মিলিয়ে নিন
প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও কাগজপত্র যুক্ত করার পর আবেদনটি চূড়ান্তভাবে জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য আবার পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে নামের বাংলা ও ইংরেজি বানান, জন্মতারিখ এবং সংযুক্ত নথির তথ্যের মধ্যে কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সবকিছু ঠিক থাকলে পোর্টালের নির্দেশনা অনুসরণ করে আবেদন জমা দিতে হবে। এরপর সংশোধনের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত ফি পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
এনআইডির নাম পরিবর্তন করতে কি আলাদা কাগজপত্র লাগে?
সাধারণ বানান সংশোধনের তুলনায় নিজের নাম সম্পূর্ণ পরিবর্তনের আবেদন বেশি যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় পরিচয়পত্রে ডাকনাম বা অন্য নামে নিবন্ধন করা থাকলে এবং সেটি পরিবর্তন করে প্রকৃত নাম যুক্ত করতে চাইলে অতিরিক্ত প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে—
এসএসসি বা সমমানের সনদের সত্যায়িত ফটোকপি।
বিবাহিত আবেদনকারীর ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডির সত্যায়িত ফটোকপি।
ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করা হলফনামা।
জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের কপি।
এ ধরনের আবেদনে মূল কাগজপত্রসহ ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাই নামের বড় ধরনের পরিবর্তনের আবেদন করার আগে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা জেনে নেওয়া উচিত।
২০২৬ সালে এনআইডি সংশোধনের জন্য কত টাকা লাগবে?
জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের ফি নিয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই নতুন নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইসির নতুন নির্ধারিত কাঠামো অনুযায়ী, এনআইডির দৃশ্যমান তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে একই ধরনের তথ্যের জন্য আবেদনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে ফিও বাড়বে।
দৃশ্যমান তথ্য সংশোধনের ফি ভ্যাটসহ নিচে দেওয়া হলো—
| আবেদনের সংখ্যা | নির্ধারিত ফি (ভ্যাটসহ) |
|---|---|
| প্রথমবার | ২৩০ টাকা |
| দ্বিতীয়বার | ৩৪৫ টাকা |
| পরবর্তী প্রতিবার | ৪৬০ টাকা |
অন্যদিকে এনআইডির অভ্যন্তরীণ তথ্য-উপাত্ত সংশোধনের ক্ষেত্রে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে—
| আবেদনের সংখ্যা | নির্ধারিত ফি |
|---|---|
| প্রথমবার | ১১৫ টাকা |
| দ্বিতীয়বার | ২৩০ টাকা |
| পরবর্তী প্রতিবার | ৩৪৫ টাকা |
এখানে উল্লেখিত ফি ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত নতুন নির্দেশনার ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। আবেদন জমা দেওয়ার সময় অনলাইন পোর্টালে প্রদর্শিত নির্ধারিত অর্থ যাচাই করে পরিশোধ করতে হবে।
কোন ভুলের কারণে এনআইডি সংশোধনের আবেদন আটকে যেতে পারে?
সঠিক তথ্যের প্রমাণ দিতে না পারলে কিংবা আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া নথিতে অসংগতি থাকলে সংশোধনের প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আবেদন বাতিলও হতে পারে।
সাধারণত কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন—
প্রস্তাবিত নামের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র না থাকা।
শিক্ষাগত সনদ ও জন্মনিবন্ধনে নামের পার্থক্য থাকা।
আবেদনের সঙ্গে অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ নথি জমা দেওয়া।
কাগজপত্রের তথ্যের সঙ্গে অনলাইন আবেদনের তথ্য না মেলা।
প্রকৃত তথ্যের পরিবর্তে প্রমাণহীন নতুন নাম যুক্ত করার চেষ্টা করা।
আবেদন জমা দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন মনে করলে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাইতে পারে। তাই আবেদনের সময় দেওয়া মোবাইল নম্বর সচল রাখা এবং অনলাইন অ্যাকাউন্টে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া উচিত।
আবেদন করার পর সংশোধিত এনআইডি পাবেন কীভাবে?
আবেদন জমা ও ফি পরিশোধের পর সেটি যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়। যাচাইয়ের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে আবেদন অনুমোদন, অতিরিক্ত নথির চাহিদা কিংবা শুনানির নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
আবেদনের অগ্রগতি জানতে একই এনআইডি সেবা পোর্টালে লগইন করতে হবে। আবেদন অনুমোদিত হলে সংশোধিত তথ্য অনুযায়ী অনলাইন জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের সুযোগ পাওয়া যাবে।
তবে আবেদন জমা দেওয়ার পর কত দিনের মধ্যে সংশোধন শেষ হবে, তা সবার ক্ষেত্রে এক নয়। তথ্যের ধরন, যাচাইয়ের প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যক্রমের ওপর সময় নির্ভর করে।
অনলাইনে সমস্যা হলে কোথায় যোগাযোগ করবেন?
অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে কোনো সমস্যা হলে কিংবা সংশোধনের আবেদন সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সহায়তা নেওয়া যায়।
এ জন্য রয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত হেল্পলাইন ১০৫। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা পোর্টাল এবং সরকারি ওয়েবসাইট থেকেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়া যাবে।
এনআইডি সংশোধনের জন্য অন্য কারও কাছে নিজের অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড, ওটিপি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া উচিত নয়। সরকারি পোর্টাল ব্যবহার করে নিজেই আবেদন করা নিরাপদ।
এনআইডি কার্ডের নাম সংশোধন নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
১. এনআইডি কার্ডে নামের বানান ভুল হলে অনলাইনে আবেদন করা যাবে?
হ্যাঁ। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবা পোর্টালে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে ভুল তথ্য সম্পাদনা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র জমা দিয়ে আবেদন করা যায়।
২. নাম সংশোধনের জন্য কোন শিক্ষাগত সনদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
আবেদনকারী এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সংশ্লিষ্ট সনদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে অন্যান্য গ্রহণযোগ্য দলিলও প্রয়োজন অনুযায়ী জমা দিতে হতে পারে।
৩. প্রথমবার এনআইডির নাম সংশোধনে কত টাকা লাগে?
২০২৬ সালের ৩০ জুলাই নির্ধারিত ফি অনুযায়ী, এনআইডির দৃশ্যমান তথ্য প্রথমবার সংশোধনে ভ্যাটসহ ২৩০ টাকা দিতে হয়।
৪. এনআইডিতে সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তন করা সম্ভব?
সম্ভব, তবে এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রমাণপত্র, হলফনামা, জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন এবং ব্যক্তিগত শুনানির প্রয়োজন হতে পারে।
৫. এনআইডি সংশোধনের আবেদন অনুমোদন হতে কত দিন লাগে?
সংশোধনের ধরন ও যাচাইয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সময় ভিন্ন হয়। আবেদন জমা দেওয়ার পর অনলাইন পোর্টালে লগইন করে সর্বশেষ অবস্থা জানা যায়।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তের পরও শেয়ারবাজারে বড় পতন
- জমি রেজিস্ট্রির আগে যে ১০টি বিষয় দেখে স্বাক্ষর করবেন
- ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে ৪ কোম্পানি
- পুরনো দলিল থেকে বর্তমান জমির মালিক বের করবেন যেভাবে
- নামজারি আছে, কিন্তু দলিল নেই—জমি কি নিজের? জানুন আইন
- Honor 600 Pro: ২০০MP ক্যামেরা ও ৭০০০mAh ব্যাটারিতে কেমন?