ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ড পেতে দেরি হলে কী করবেন?
ড্রাইভিং পরীক্ষায় পাস করেছেন, প্রয়োজনীয় ফি জমা দিয়েছেন, বায়োমেট্রিক তথ্যও সম্পন্ন—তবু হাতে আসছে না স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই বুঝতে পারেন না, কোথায় যোগাযোগ করবেন বা কার্ড না পাওয়া পর্যন্ত গাড়ি চালানো যাবে কি না। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নিয়ম অনুযায়ী, স্মার্ট কার্ড ছাপার কাজ শেষ হলে আবেদনকারীকে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়। আবার অনুমোদনের পর নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল থেকে অস্থায়ী অনুমোদন স্লিপ বা ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তাই কার্ড পেতে দেরি হলে শুধু অপেক্ষা না করে আবেদনের অবস্থা যাচাই, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
প্রথমে জানুন, আপনার লাইসেন্সের আবেদন কোন পর্যায়ে আছে
স্মার্ট কার্ড হাতে না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে আবেদন আটকে আছে বা বাতিল হয়ে গেছে। লাইসেন্স তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েকটি ধাপ রয়েছে। কোনো ধাপে কাজ বাকি থাকলে কার্ড পেতে সময় লাগতে পারে।
সাধারণত প্রক্রিয়াটি এমন—
ড্রাইভিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া।
নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে চূড়ান্ত আবেদনের কার্যক্রম সম্পন্ন করা।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বায়োমেট্রিক তথ্য যাচাই।
বিআরটিএর অনুমোদন।
স্মার্ট কার্ড ছাপানো।
ডাকযোগে আবেদনকারীর দেওয়া ঠিকানায় কার্ড পাঠানো।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, স্মার্ট কার্ড প্রিন্টিং সম্পন্ন হলে আবেদনকারীকে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়। তাই প্রথমে নিজের মোবাইল ফোনে বিআরটিএর কোনো বার্তা এসেছে কি না, সেটি যাচাই করুন।
১. অনলাইনে আবেদনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করুন
ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন ও সংশ্লিষ্ট সেবা ব্যবস্থাপনার জন্য বিআরটিএর নিজস্ব সার্ভিস পোর্টাল রয়েছে। এর মাধ্যমে আবেদনকারী নিজের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে লাইসেন্সসংক্রান্ত সেবা ও তথ্য দেখতে পারেন।
অনলাইনে তথ্য যাচাইয়ের জন্য—
১. বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে প্রবেশ করুন:https://bsp.brta.gov.bd/
২. নিজের নিবন্ধিত অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।
৩. ড্রাইভিং লাইসেন্সসংক্রান্ত আবেদন ও জমা দেওয়া তথ্য দেখুন।
৪. আবেদন, ফি পরিশোধ বা অনুমোদনসংক্রান্ত কোনো তথ্য অসম্পূর্ণ আছে কি না যাচাই করুন।
পোর্টালে কোনো তথ্য বুঝতে অসুবিধা হলে অনুমান করে নতুন আবেদন বা পুনরায় ফি জমা দেবেন না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করুন।
২. সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করুন
অনেক দিন পার হওয়ার পরও কার্ড না পেলে যে বিআরটিএ সার্কেল অফিসের অধীনে আপনার আবেদন করা হয়েছে, সেখানে যোগাযোগ করুন। আবেদনকারীর প্রোফাইলে দেওয়া ঠিকানা ও থানার তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিস নির্ধারিত হতে পারে।
অফিসে গিয়ে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে চান—
আপনার আবেদন অনুমোদিত হয়েছে কি না।
স্মার্ট কার্ড ছাপানোর কাজ শেষ হয়েছে কি না।
কার্ড ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে কি না।
আবেদন বা ঠিকানাসংক্রান্ত কোনো সমস্যা রয়েছে কি না।
কোনো কাগজপত্র বা তথ্যের ঘাটতি আছে কি না।
শুধু কার্ড আসেনি বলে নতুন করে আবেদন করার প্রয়োজন নেই। আগে পুরোনো আবেদনের বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করুন।
৩. বিআরটিএর হটলাইনে অভিযোগ বা তথ্য জানতে পারেন
সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করেও সমাধান না পেলে বিআরটিএর কল সেন্টারে যোগাযোগ করতে পারেন। বিআরটিএর সরকারি নাগরিক সনদে কল সেন্টার নম্বর হিসেবে ১৬১০৭ উল্লেখ রয়েছে।
যোগাযোগের সময় নিজের সমস্যাটি স্পষ্টভাবে জানান। প্রয়োজনে আবেদনের তথ্য, ফি জমার রসিদ ও অন্যান্য প্রমাণপত্র প্রস্তুত রাখুন।
৪. কার্ড না পাওয়া পর্যন্ত ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স বা অস্থায়ী স্লিপ দেখুন
স্মার্ট কার্ড হাতে আসার আগেই অনুমোদিত আবেদনকারীর জন্য বিআরটিএর পোর্টালে অটো জেনারেটেড Temporary Authorization Slip পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বিআরটিএর প্রকাশিত নির্দেশনা অনুযায়ী, স্মার্ট কার্ড না পাওয়া পর্যন্ত এই স্লিপ প্রিন্ট করে সংরক্ষণ করা যায় এবং গাড়ি চালানোর কাজে ব্যবহার করা যায়।
এ ছাড়া অনুমোদনের পর ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু পরীক্ষায় পাস করা, ফি জমা দেওয়ার রসিদ বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্স থাকলেই সেটি চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিকল্প হয়ে যায় না।
আপনার আবেদন অনুমোদিত হয়েছে কি না এবং কোন অনুমোদিত নথি ব্যবহার করতে পারবেন, তা নিশ্চিত হয়ে নিন। প্রয়োজনে বিআরটিএর পোর্টালে থাকা ই-লাইসেন্স যাচাই সেবাও ব্যবহার করুন।
৫. ডাকযোগে কার্ড পাঠানো হয়েছে কি না নিশ্চিত করুন
বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী, স্মার্ট কার্ড প্রিন্টিং শেষ হলে আবেদনকারীর দেওয়া ঠিকানায় ডাকযোগে কার্ড পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তাই কার্ড ছাপা হয়ে গেলেও হাতে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় যাচাই করুন—
আবেদনে দেওয়া ঠিকানা সঠিক ছিল কি না।
বাড়িতে বা নির্ধারিত ঠিকানায় ডাক বিভাগের কোনো চিঠি এসেছে কি না।
কার্ড পাঠানোর বিষয়ে বিআরটিএ থেকে এসএমএস এসেছে কি না।
ডাকযোগে পাঠানোর পর কোনো কারণে কার্ড ফেরত গেছে কি না।
কার্ড পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হলেও না পেলে সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ অফিসে যোগাযোগ করে পরবর্তী করণীয় জেনে নিন।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ড পেতে কত দিন লাগে?
বিআরটিএর নাগরিক সনদে ই-ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য এক কর্মদিবস এবং ডাকযোগে স্মার্ট কার্ড পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ১৫–২০ কর্মদিবসের সময়সীমার উল্লেখ রয়েছে। তবে এটি সংশ্লিষ্ট সেবার নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও শর্তের ওপর নির্ভরশীল। আবেদন অনুমোদন, কার্ড ছাপানো, ডাকযোগে পাঠানো কিংবা কোনো তথ্যগত জটিলতার কারণে বাস্তবে সময় বেশি লাগতে পারে।
এ কারণে নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পরও কার্ড না পেলে আবেদনের অবস্থা যাচাই করা উচিত। শুধু অন্য কারও কার্ড পেতে কত দিন লেগেছে, তার সঙ্গে নিজের আবেদনের সময় তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
কার্ড পেতে দেরি হলে যেসব কাগজপত্র সঙ্গে রাখবেন
বিআরটিএ অফিসে যোগাযোগের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী নিচের কাগজপত্র সঙ্গে রাখতে পারেন—
জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনসংক্রান্ত তথ্য বা প্রিন্ট কপি।
ফি জমা দেওয়ার রসিদ।
বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কাগজ।
শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের কপি, যদি প্রযোজ্য হয়।
বিআরটিএ থেকে পাওয়া এসএমএস বা অন্যান্য বার্তার তথ্য।
সব কাগজ প্রত্যেক ক্ষেত্রে লাগবে এমন নয়। আপনার আবেদনের পর্যায় অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অফিস প্রয়োজনীয় নথি জানিয়ে দেবে।
যেসব ভুল করবেন না
ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ড পেতে দেরি হলে তাড়াহুড়ো করে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
একই ফি আবার জমা দেবেন না: আগে পেমেন্টের অবস্থা যাচাই করুন। টাকা জমা হয়েছে কি না নিশ্চিত না হয়ে পুনরায় অর্থ পরিশোধ করলে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
দালালের মাধ্যমে দ্রুত কার্ড পাওয়ার চেষ্টা করবেন না: সরকারি নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে অর্থ লেনদেন করলে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
শুধু পেমেন্ট রসিদ নিয়ে গাড়ি চালাবেন না: ফি জমার রসিদ চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স নয়। বিআরটিএর অনুমোদিত লাইসেন্স বা প্রযোজ্য অস্থায়ী অনুমোদন নথি থাকতে হবে।
অন্যের তথ্য দিয়ে আবেদন খুঁজবেন না: নিজের নিবন্ধিত অ্যাকাউন্ট ও আবেদনসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করুন। ব্যক্তিগত তথ্য অপরিচিত কাউকে দেবেন না।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড পেতে দেরি হলে প্রথম কাজ হলো আবেদনটি কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা নিশ্চিত করা। বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে নিজের তথ্য যাচাই করুন, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করুন এবং কার্ড ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে কি না জেনে নিন।
কার্ড হাতে না পাওয়া পর্যন্ত অনুমোদিত ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স বা Temporary Authorization Slip ব্যবহারের সুযোগ আছে কি না, সেটিও যাচাই করুন। সঠিক তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি হাতে থাকলে অযথা দৌড়ঝাঁপ না করেই সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।
পাঠকের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
১. ড্রাইভিং লাইসেন্সের স্মার্ট কার্ড পেতে দেরি হলে কোথায় যোগাযোগ করব?
প্রথমে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে নিজের আবেদনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করুন। এরপর সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজনে বিআরটিএর কল সেন্টার ১৬১০৭ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।
২. স্মার্ট কার্ড ছাপা হলে কি এসএমএস আসে?
হ্যাঁ। বিআরটিএর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, স্মার্ট কার্ড প্রিন্টিং সম্পন্ন হলে আবেদনকারীকে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়।
৩. স্মার্ট কার্ড হাতে না পেলেও কি গাড়ি চালানো যাবে?
আবেদন অনুমোদনের পর বিআরটিএ থেকে পাওয়া বৈধ ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স বা প্রযোজ্য Temporary Authorization Slip ব্যবহার করা যায়। তবে শুধু পরীক্ষায় পাসের কাগজ বা ফি জমার রসিদ চূড়ান্ত লাইসেন্সের বিকল্প নয়।
৪. স্মার্ট কার্ড ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে কি না কীভাবে জানব?
বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করে কার্ড প্রিন্টিং ও পাঠানোর অবস্থা জানতে পারেন। ঠিকানা সঠিক আছে কি না, সেটিও যাচাই করুন।
৫. ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ড পেতে কত দিন লাগে?
বিআরটিএর নাগরিক সনদে ডাকযোগে স্মার্ট কার্ড পৌঁছানোর জন্য ১৫–২০ কর্মদিবসের সময় উল্লেখ রয়েছে। তবে আবেদন ও ডাক বিভাগের প্রক্রিয়ায় জটিলতা হলে বেশি সময় লাগতে পারে।
তানভির ইসলাম/