ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

কেয়া কসমেটিকস কাণ্ডে নতুন মোড়, ব্যাংকিং অনিয়ম নাকি জালিয়াতি?

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ জুলাই ২৮ ১১:০১:২৭
কেয়া কসমেটিকস কাণ্ডে নতুন মোড়, ব্যাংকিং অনিয়ম নাকি জালিয়াতি?

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটের পেছনে রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ৬৬ কোটি মার্কিন ডলার) নিয়ে জটিলতার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রপ্তানির অর্থ দেশে এলেও তা কোম্পানির ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি। একই লেনদেনের বিপরীতে কোম্পানির নামে ফোর্সড লোন সৃষ্টি করে পরবর্তীতে তা টার্ম লোনে রূপান্তর করা হয়েছে।

বিষয়টি ঘিরে বর্তমানে যৌথ অনুসন্ধান চালাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত প্রায় দুই দশকে কেয়া গ্রুপের প্রায় ৬৬ কোটি ডলার রপ্তানি আয় দেশে এলেও সংশ্লিষ্ট চার ব্যাংকের মাধ্যমে সেই অর্থ কোম্পানির এফসি অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় সাউথইস্ট ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত লেনদেন তদন্তের আওতায় এসেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট রপ্তানি আয় বাংলাদেশ ব্যাংকের এক্সপোর্ট মনিটরিং সিস্টেমে (Export Monitoring System) ‘রিয়ালাইজড’ হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো প্রসিড রিয়ালাইজেশন সার্টিফিকেট (PRC) ইস্যু করেছে। ফলে রপ্তানি আয়ের অর্থের প্রকৃত গন্তব্য ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

কেয়া কসমেটিকসের দাবি, এই অনিয়মের কারণে তাদের নামে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি হিসাব তৈরি হয়েছে। এর ফলে কোম্পানির আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, পাশাপাশি উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোম্পানির মতে, এই সংকটই তাদের আর্থিক অবস্থার অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ।

এ ঘটনায় দুদক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খতিয়ে দেখছে। প্রথমত, রপ্তানি আয়ের অর্থ যথাযথভাবে দেশে এসেছে কি না। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে রপ্তানি আয় ‘রিয়ালাইজড’ দেখানোর পরও কেন সংশ্লিষ্ট ফোর্সড লোন বহাল রয়েছে। তৃতীয়ত, পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যাংকিং জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম কিংবা অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে কি না।

অন্যদিকে, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) রপ্তানি আয়, ফোর্সড লোন, এফডিবিপি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করে তাদের অনুসন্ধান শেষ করেছে। সংস্থাটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে বিএসইসি নিয়োগকৃত বিশেষ নিরীক্ষকের প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে এফআরসি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, রপ্তানি আয়ের অর্থ দেশে এসেছে কি না, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তে যার দায় প্রমাণিত হবে, তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কেয়া কসমেটিকসের ঘটনাটি শুধু একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক সংকট নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা, রপ্তানি আয় ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা প্রক্রিয়া এবং করপোরেট সুশাসনের কার্যকারিতা যাচাইয়েরও একটি বড় পরীক্ষা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা শুধু কোম্পানির ভবিষ্যৎ নয়, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতার ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ