ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

মাইডাসে ভয়াবহ সংকট, খেলাপি ঋণ ছাড়াল ৪৩২ কোটি টাকা

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ০১ ১৫:৫১:০৮
মাইডাসে ভয়াবহ সংকট, খেলাপি ঋণ ছাড়াল ৪৩২ কোটি টাকা

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান মাইডাস ফাইন্যান্সিং পিএলসির আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট লিজ, ঋণ ও অগ্রিমের ৫৫ শতাংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। এর পাশাপাশি বড় অঙ্কের লোকসান, মূলধন ঘাটতি, ঋণাত্মক শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি এবং তারল্য সংকট প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ইসলাম আফতাব কামরুল অ্যান্ড কোম্পানির ম্যানেজিং পার্টনার এ কে এম কামরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের মোট লিজ, ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ৭৮৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪৩২ কোটি ৪৭ লাখ টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণ ও অগ্রিমের প্রায় ৫৫ শতাংশ এখন অনাদায়ী বা খেলাপি।

শুধু খেলাপি ঋণই নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণেও ঘাটতি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪১টি পৃথক লিজ, ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ২৫ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এর বাইরে অন্যান্য প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ আরও প্রায় ৬ কোটি টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয়ের হিসাবেও সংকটের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৫ সালে মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের নিট সুদ আয় ছিল ৪৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। একই সময়ে মোট পরিচালন আয় দাঁড়ায় ৪৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। তবে আয় দিয়ে ব্যয় ও অন্যান্য আর্থিক চাপ সামাল দিতে না পারায় বছর শেষে কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ৩৩৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা।

মূলধনের অবস্থাও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির মূলধন পর্যাপ্ততার হার বা সিআরএআর ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৫০ কোটি ৭ লাখ টাকা। একই সময়ে শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে ২৬৬ কোটি ১ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের দায় ও আর্থিক চাপ তার সম্পদের তুলনায় বড় হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

নিরীক্ষক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আমানতকারীদের চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তারল্য সংকটে পড়েছে। আমানতকারীরা অর্থ ফেরত চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় নগদ অর্থের ব্যবস্থা করা প্রতিষ্ঠানটির জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।

এদিকে টানা তিন বছর কোনো লভ্যাংশ দিতে না পারায় মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের শেয়ার বর্তমানে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক দুরবস্থা শুধু আমানতকারী বা ঋণদাতাদের জন্য নয়, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের আর্থিক সংকটের কারণ হিসেবে সামগ্রিক আর্থিক খাতের দুর্বল পরিস্থিতির কথা বলছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। কোম্পানি সচিব তানভীর হাসান জানান, কয়েক বছর ধরে দেশের আর্থিক খাত ভালো অবস্থায় নেই। বিশেষ করে লিজিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় অনেক আমানতকারী নতুন করে অর্থ জমা রাখার পরিবর্তে নিজেদের জমা টাকা তুলে নিতে চাইছেন। এতে প্রতিষ্ঠানটির ওপর তারল্য চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাবও ব্যবসায়িক খাতে পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে না পারায় তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে। এর ফলে অনেক ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বেড়েছে।

সব মিলিয়ে মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের আর্থিক প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, বিপুল লোকসান, মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকটের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোই প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ