ঢাকা, সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

আর মাত্র ১০ বছর! এলন মাস্ক বলছেন, টাকা ছাড়াই চলবে পৃথিবী

অর্থনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ আগস্ট ২৪ ১১:২৬:২২
আর মাত্র ১০ বছর! এলন মাস্ক বলছেন, টাকা ছাড়াই চলবে পৃথিবী

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও রোবট প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির মধ্যে ভবিষ্যতের অর্থনীতি কেমন হবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এলন মাস্কের একটি সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। তাঁর দাবি, ২০৩৬ সালের মধ্যে অর্থাৎ আগামী এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে মানুষের জীবনে টাকার প্রয়োজনীয়তা প্রায় শেষ হয়ে যেতে পারে।

মাস্কের এই ধারণার ভিত্তি হলো এমন একটি অর্থনীতি, যেখানে AI ও হিউম্যানয়েড রোবট বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সেবা উৎপাদন করতে পারবে। ফলে মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ এত বেশি হতে পারে যে অর্থ দিয়ে পণ্য কেনাবেচার প্রচলিত ব্যবস্থার গুরুত্ব কমে যাবে।

তবে প্রশ্ন হলো—প্রযুক্তি কি সত্যিই এমন একটি পৃথিবী তৈরি করতে পারবে, যেখানে টাকার আর প্রয়োজন থাকবে না?

মাস্কের ‘প্রচুর্যের অর্থনীতি’ তত্ত্ব

মাস্কের যুক্তি অনুযায়ী, অর্থের প্রয়োজন তৈরি হয় মূলত সম্পদের অভাব থেকে। অর্থাৎ কোনো পণ্য বা সেবা সীমিত থাকলে সেটি পাওয়ার জন্য মানুষকে মূল্য দিতে হয়।

AI ও রোবট যদি মানুষের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং খাবার, বাড়ি, গাড়ি, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য ব্যাপক হারে উৎপাদন করতে পারে, তাহলে scarcity বা অভাব অনেকটাই কমে যেতে পারে।

এই পরিস্থিতিকে মাস্ক একটি ‘quasi-infinite economy’ বা প্রায় অসীম উৎপাদনক্ষম অর্থনীতির ধারণার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে, উৎপাদন যদি মানুষের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হয়, তাহলে অর্থের প্রচলিত ভূমিকা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।

কিন্তু বাস্তব জগতের সীমাবদ্ধতা কোথায়?

AI সফটওয়্যার, তথ্য ও ডিজিটাল কনটেন্ট উৎপাদনে বিপ্লব ঘটাতে পারে। কিন্তু ভৌত জগতের উৎপাদন এখনো প্রাকৃতিক সম্পদ ও অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।

একটি বাড়ি নির্মাণের জন্য জমি, সিমেন্ট, ইস্পাত ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন। হাসপাতাল নির্মাণেও প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল ও জমি। একইভাবে হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির জন্য প্রয়োজন লিথিয়াম, কপারসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদ।

এসব সম্পদ সীমাহীন নয়। ফলে AI ও রোবট উৎপাদন বাড়িয়ে দিলেও সব ধরনের scarcity একেবারে দূর করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ইউভাল নোয়া হারারির সতর্কতা

ইতিহাসবিদ ও লেখক ইউভাল নোয়া হারারি অর্থের প্রকৃতি নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, টাকার নিজস্ব বস্তুগত মূল্য নেই; মানুষের সম্মিলিত বিশ্বাসের কারণেই এটি কার্যকর একটি ব্যবস্থা হিসেবে টিকে আছে।

তবে AI-এর দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে হারারি সতর্ক করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, AI যদি বিপুলসংখ্যক মানুষের কাজের বিকল্প হয়ে ওঠে, তাহলে এমন একটি শ্রেণি তৈরি হতে পারে যারা অর্থনীতিতে আর প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে না।

এই সম্ভাবনাকে তিনি ‘useless class’ বা অর্থনৈতিকভাবে অপ্রয়োজনীয় শ্রেণির ধারণার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

উৎপাদন বাড়লেই কি সবার জীবন বদলাবে?

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সম্পদের মালিকানা কার হাতে থাকবে?

AI ও রোবট যদি বিপুল পরিমাণ সম্পদ উৎপাদন করতে সক্ষম হয়, কিন্তু সেই প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থার মালিকানা যদি অল্প কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, তাহলে উৎপাদন বাড়লেও তার সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

অর্থাৎ abundance বা প্রচুর সম্পদ থাকা এবং access বা সেই সম্পদে সবার প্রবেশাধিকার থাকা এক বিষয় নয়।

এই জায়গায় সম্পদের বণ্টন, করব্যবস্থা, মালিকানা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

টাকার বিকল্প হতে পারে UBI?

AI ও রোবটের কারণে যদি মানুষের কাজের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তাহলে প্রচলিত আয়ব্যবস্থার বিকল্প নিয়ে আলোচনা আরও বাড়তে পারে।

এ ক্ষেত্রে Universal Basic Income (UBI) বা সর্বজনীন মৌলিক আয়ের ধারণা সামনে আসতে পারে। এর মাধ্যমে সমাজের প্রত্যেক মানুষকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতে পারে।

অন্যদিকে Universal Basic Services-এর মতো ব্যবস্থায় মানুষের প্রয়োজনীয় কিছু সেবা—যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা আবাসনের সুযোগ—সবার জন্য নিশ্চিত করার ধারণাও আলোচনায় রয়েছে।

২০৩৬ সালেই কি টাকার যুগ শেষ?

এলন মাস্কের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। AI ও রোবট প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা ব্যাপকভাবে বাড়াতে পারে, কিন্তু জমি, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ ও অন্যান্য ভৌত সীমাবদ্ধতা রাতারাতি অদৃশ্য হবে না।

তার চেয়েও বড় বিষয় হলো সম্পদের মালিকানা ও বণ্টন। প্রযুক্তি প্রচুর সম্পদ তৈরি করলেও সেই সম্পদের সুফল কীভাবে সমাজের সব মানুষের কাছে পৌঁছাবে, সেটিই হতে পারে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তাই ২০৩৬ সালের মধ্যে টাকা পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তার চেয়ে মাস্কের বক্তব্যকে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি সাহসী পূর্বাভাস হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

পাঠকের মতামত: