ঢাকা, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩

আবেদন নাকচ, তবুও রিফাইনারি বানাচ্ছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল!

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ আগস্ট ২৩ ১১:৩৮:০৪
আবেদন নাকচ, তবুও রিফাইনারি বানাচ্ছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল!

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার ডাঙ্গারচরে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের বিদ্যমান সিআরইউ (ক্যাটালিস্ট রিফরমিং ইউনিট) প্ল্যান্টকে পূর্ণাঙ্গ রিফাইনারিতে সম্প্রসারণের কাজ চলছে—এমন অভিযোগ উঠেছে। তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, নতুন রিফাইনারির জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে কোনো প্রাথমিক বা চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান প্ল্যান্টে বছরে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার টন ন্যাফথা ও কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতের সক্ষমতা রয়েছে। প্রস্তাবিত সম্প্রসারণ বাস্তবায়িত হলে এর মোট সক্ষমতা প্রায় ২৫ লাখ ৭৫ হাজার টনে দাঁড়ানোর কথা।

প্রায় ৯ মাস আগেই আবেদন নাকচ

নথিপত্র অনুযায়ী, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত জ্বালানি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতের অনুমতি চেয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে আবেদন করে।

আবেদনে বিদ্যমান সিআরইউ প্ল্যান্টের পাশাপাশি বছরে প্রায় ১৯ লাখ ২৫ হাজার টন ক্রুড ও কনডেনসেট পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন একটি রিফাইনারি স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতিও চাওয়া হয়।

আবেদন পর্যালোচনায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) একটি কমিটি গঠন করে। সাত সদস্যের ওই কমিটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির প্ল্যান্ট ও প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে এবং পরে প্রতিবেদন জমা দেয়।

কমিটি নীতিমালার আলোকে প্রাথমিক অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার সুপারিশ করলেও শেষ পর্যন্ত জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ আবেদনটি নাকচ করে দেয়।

২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর জারি করা চিঠিতে মন্ত্রণালয় জানায়, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রস্তাব বিবেচনার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির রিফাইনারি স্থাপন ও অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের জন্য কোনো চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি বলেও জানানো হয়।

তাহলে নির্মাণকাজ এগোচ্ছে কীভাবে?

আবেদন নাকচ হওয়ার পরও নতুন রিফাইনারির নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি রিফাইনারির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের পাইপলাইনও নির্মাণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

তবে পাইপলাইনটি এখনো ব্যবহার শুরু হয়নি।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রিফাইনারি নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয় বা বিপিসির কোনো অনুমোদন তাদের দেওয়া হয়নি।

বিপিসির বোর্ড সভাতেও উঠেছিল বিষয়টি

২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতেও সুপার পেট্রোকেমিক্যালের আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।

সভায় বলা হয়, ইস্টার্ন রিফাইনারির ইউনিট-২ প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। সেটি বাস্তবায়িত হলে দেশে সরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এ অবস্থায় নতুন করে কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অপরিশোধিত তেল আমদানি ও প্রক্রিয়াজাত করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সরকারের অনুমোদন ছাড়া রিফাইনারি নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি একটি কৌশলগত ও সংবেদনশীল অবকাঠামো। এ ধরনের প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন, নিরাপত্তা, পরিবেশগত বিষয়, আমদানি ব্যবস্থা এবং জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।

বিপিসির সাবেক ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক আবু হানিফের মতে, মন্ত্রণালয় বা বিপিসির অনুমোদন ছাড়া রিফাইনারি সম্প্রসারণ বা নির্মাণ বৈধ নয়। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েক ধাপে সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলমও বিষয়টির কঠোর তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ করলে তা রাষ্ট্রীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

মন্ত্রণালয় কী বলছে?

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের আগের সিআরইউ প্ল্যান্ট ছাড়া নতুন রিফাইনারির জন্য কোনো প্রাথমিক বা চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি।

বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, নতুন রিফাইনারি নির্মাণের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো অনুমোদনপত্র নেই।

অন্যদিকে, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

সামনে বড় প্রশ্ন

সুপার পেট্রোকেমিক্যালের আবেদন যখন ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় নাকচ করেছে, তখন প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে রিফাইনারির নির্মাণকাজ এগিয়ে নিচ্ছে—এটাই এখন মূল প্রশ্ন।

একই সঙ্গে প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি, ব্যাংকিং সুবিধা, অর্থায়ন, নির্মাণ অনুমোদন এবং কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে পাইপলাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা কী ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রকল্পটির বৈধতা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

পাঠকের মতামত: