ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

৬ হাজার ৫০০ কারখানায় গ্যাস সংকট, এলো নতুন প্রস্তাব

অর্থনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৭ ২০:৫৭:৪১
৬ হাজার ৫০০ কারখানায় গ্যাস সংকট, এলো নতুন প্রস্তাব

দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কারখানাকে সচল রাখতে গ্যাস সরবরাহের প্রচলিত ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। প্রতিদিন কম চাপের গ্যাস দেওয়ার বদলে শিল্পাঞ্চলকে কয়েকটি জোনে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে পূর্ণ চাপের গ্যাস সরবরাহের দাবি জানিয়েছে খাতটির চারটি শীর্ষ সংগঠন।

তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি এলাকায় সপ্তাহে টানা পাঁচ দিন স্বাভাবিক পূর্ণ চাপে গ্যাস দেওয়া যেতে পারে। অন্য দুই দিন সংযোগ বন্ধ রাখা অথবা সীমিত চাপ বজায় রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে কোন সময়ে উৎপাদন করতে হবে, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করে নেওয়ার সুযোগ পাবে কারখানাগুলো।

এই দাবিতে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) কাছে যৌথভাবে আবেদন করেছে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ ও বিটিটিএলএমইএ।

গ্যাসের ঘাটতি কোথায়, কতটা

সংগঠনগুলোর দেওয়া হিসাব বলছে, সমস্যাটির বড় অংশ তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আওতাধীন শিল্পাঞ্চলগুলোতে কেন্দ্রীভূত। ২০২৬ সালের ৫ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনের সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছে, শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ খাতে দেশের অনুমোদিত মোট গ্যাস চাহিদার ৭৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ প্রয়োজন হয় তিতাস এলাকায়। দৈনিক হিসেবে এই চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৪৮৮ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)।

তিতাসের জন্য জিটিসিএল থেকে প্রতিদিন ৯৮০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়ার কথা। কিন্তু ওই পাঁচ দিনে গড়ে সরবরাহ হয়েছে ৮৮৩ দশমিক ২০ এমএমসিএফডি। ফলে নির্ধারিত পরিমাণের সঙ্গে প্রকৃত সরবরাহের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে দৈনিক গড়ে ৯৬ দশমিক ৮০ এমএমসিএফডি।

অন্যদিকে, দেশের আরও পাঁচটি আঞ্চলিক গ্যাস বিতরণ কোম্পানি একই সময়ে মোট ৩৭৩ দশমিক ৬০ এমএমসিএফডি গ্যাস পেয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনগুলো। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিমাণ সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর আনুপাতিক বরাদ্দের চেয়ে ৭০ দশমিক ৩৭ এমএমসিএফডি বেশি।

এই পরিস্থিতিতে যেসব এলাকায় বরাদ্দের তুলনায় বেশি গ্যাস যাচ্ছে, সেখানকার অতিরিক্ত অংশের কিছুটা তিতাস অঞ্চলে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

কেন এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থা চাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা

চার সংগঠনের বক্তব্য, প্রতিদিন অল্প চাপের গ্যাস নিয়ে কারখানা চালু রাখলে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যায়। এর পরিবর্তে আগে থেকে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী কোনো একটি অঞ্চলে টানা কয়েক দিন পূর্ণ চাপের গ্যাস পাওয়া গেলে উৎপাদন কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে দক্ষতার সঙ্গে চালানো সম্ভব।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম যৌথ চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন নামমাত্র গ্যাসের চাপ নিয়ে কম উৎপাদনশীলতার মধ্যে কারখানা চালানোর চেয়ে পর্যায়ক্রমে নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে পূর্ণ চাপের গ্যাস সরবরাহ করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি কার্যকরভাবে উৎপাদন করতে পারবে।

মোহাম্মদ হাতেমের মতে, জিটিসিএল যদি এলাকাভিত্তিক রেশনিং চালু করে, তাহলে কারখানাগুলো আগে থেকেই তাদের উৎপাদন পরিকল্পনা সাজাতে পারবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের কাজ না থাকলেও বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়ার পরিস্থিতি কমানো সম্ভব হবে।

শিল্প ও কর্মসংস্থানে বড় অংশ তিতাসনির্ভর

চার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের ৯০ শতাংশের বেশি কারখানা তিতাসের আওতাধীন এলাকায় অবস্থিত। মোট টেক্সটাইল ও পোশাক কারখানার প্রায় ৯৪ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০টি কারখানা এই এলাকার মধ্যে রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ শ্রমিক। এ সংখ্যা সংশ্লিষ্ট খাতের মোট জনবলের প্রায় ৯২ শতাংশ।

সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, দেশের পোশাক খাত থেকে বছরে যে প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় হয়, তার সিংহভাগ আসে তিতাসের আওতাধীন এসব কারখানা থেকে।

রেশনিংয়ের সূচি তৈরিতে থাকছে একাধিক শর্ত

তবে প্রস্তাবিত রেশনিং ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সব ধরনের কারখানার কার্যক্রম বিবেচনায় নিয়ে সময়সূচি তৈরির পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনগুলো। বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়াকরণে থাকা কারখানা, বয়লার পরিচালনা, পণ্য শিপমেন্টের নির্ধারিত সময়, শ্রম আইন এবং কারখানার নিরাপত্তা বিধিকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তাদের আরেকটি দাবি হলো, গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিতরণ অঞ্চলের মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে, তা দূর করা। যেসব এলাকায় নির্ধারিত বরাদ্দের চেয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, সেখান থেকে একটি অংশ তিতাস এলাকায় পুনর্বণ্টন করে শিল্পকারখানার প্রয়োজনীয় লাইন প্রেসার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রপ্তানি আদেশ নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা

যৌথ চিঠিতে সংগঠনগুলো জানিয়েছে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রপ্তানি আদেশ সম্পন্ন করা এবং পণ্য জাহাজীকরণের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

তাদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় চললে শুধু উৎপাদন কার্যক্রম নয়, কারখানা চালু রাখা এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রভাব রপ্তানি আদেশ পূরণ, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও পড়তে পারে বলে মনে করছে তারা।

এ কারণেই শিল্পাঞ্চলগুলোতে দ্রুত এলাকাভিত্তিক গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে গ্যাসের সুষম পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় চাপ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ ও বিটিটিএলএমইএ।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ