ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর নেই

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৭ ১১:৪৫:৩২
বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর নেই

দেশে গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও নিজস্ব উৎপাদন কমছে। ফলে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরবরাহ ধরে রাখতে বাংলাদেশকে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের চাপও বাড়ছে। অথচ দেশের মাটির নিচে এবং বঙ্গোপসাগরে গ্যাস ও জ্বালানি সম্পদের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, সম্ভাবনার কথা জানার পরও এসব সম্পদ কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে। লালমাই, কসবা-তারাপুর, শালবাহান ও ধলিয়ার মতো স্থলভাগের ক্ষেত্র থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরের অনুসন্ধান—বিভিন্ন জায়গায় কাজ থেমে যাওয়া বা প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ার বিষয় সামনে এসেছে।

তবে কোনো ক্ষেত্রের প্রকৃত অবস্থা বোঝার জন্য শুধু সম্ভাবনার কথা যথেষ্ট নয়। কোথায় প্রকৃত মজুত রয়েছে, কতটা গ্যাস বা জ্বালানি বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন সম্ভব এবং কোন প্রকল্প কী কারণে বন্ধ বা ধীরগতির—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তরই পারে বাংলাদেশের জ্বালানি সম্পদের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে।

উৎপাদন কমছে, আমদানির চাপ বাড়ছে

বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে নিজস্ব গ্যাসের পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। নিজস্ব উৎপাদন কমে যাওয়া এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই নির্ভরতা বাড়ছে।

এর প্রভাব পড়ছে জ্বালানি খাতের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে। একই সঙ্গে শিল্প, বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র ও কূপের কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। এসব স্থবিরতার পেছনে ভূ-রাজনৈতিক ও নীতিগত বিভিন্ন কারণ থাকার অভিযোগ রয়েছে।

লালমাইয়ে অনুসন্ধানের পর থেমে গেল কার্যক্রম

কুমিল্লার লালমাই পাহাড়কে ঘিরে গ্যাস ও কাঁচা তেলের সম্ভাবনার আলোচনা বহুদিনের। সেখানে ২০০৪ সাল থেকে অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন তৎপরতা শুরু হয়।

এরপর ২০১৭-২০১৮ সালে ‘লালমাই-১’ ও ‘লালমাই-২’ নামে দুটি কূপ খনন করা হয়। অনুসন্ধানের সময় তেল ও গ্যাসের সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিললেও পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম আর এগোয়নি।

এখন এই এলাকার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—প্রকৃত মজুত কত এবং সেখানকার সম্পদ বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য কি না।

কসবা-তারাপুরের কূপ ঘিরে অভিযোগ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা-তারাপুরও সম্ভাবনাময় গ্যাস অঞ্চল হিসেবে আলোচনায় এসেছে। সেখানে প্রায় ৩ হাজার মিটার গভীরতায় অনুসন্ধান চালিয়ে গ্যাস পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু অনুসন্ধানের পর কূপটির কার্যক্রম কীভাবে এগিয়েছে, তা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, একটি গোপন চুক্তির মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওই কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন বন্ধ রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছিল।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে কসবার ওই কূপ থেকে গ্যাস বের হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কূপটি সিল করে দেন বলে এতে বলা হয়েছে।

কয়েক বছর পর বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে আবার সামনে আসে। ২০২৪ সালের আগস্টে স্থানীয় বাসিন্দা ও আন্দোলনকারীরা ‘কসবার গ্যাস কসবায় চায়’ স্লোগানে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেন। তাদের দাবি ছিল প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা।

উত্তরের শালবাহান, দক্ষিণের ধলিয়াতেও স্থবিরতা

পঞ্চগড়ের শালবাহানের ক্ষেত্রেও অনুসন্ধানের ইতিহাস পুরোনো। ১৯৮৮ সালে সেখানে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

শালবাহানের সঙ্গে একই ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলের ভারতের অংশে পরবর্তী সময়ে জ্বালানি অনুসন্ধানের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে বাংলাদেশের অংশে অনুসন্ধান বন্ধ হওয়ার কারণের সঙ্গে ভারতের অংশে উত্তোলনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ফেনীর ধলিয়া গ্যাসক্ষেত্রের চিত্রও দীর্ঘদিনের উৎপাদন স্থবিরতার। একসময় এই ক্ষেত্র থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ করা হতো। পরে বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে ক্ষেত্রটি।

সমুদ্রসীমাতেও প্রত্যাশিত ফল মেলেনি

বাংলাদেশের গ্যাস অনুসন্ধানের প্রশ্ন শুধু স্থলভাগে সীমাবদ্ধ নয়। বঙ্গোপসাগরেও দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

২০১২ সালে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসি ও অয়েল ইন্ডিয়া বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার দুটি ব্লকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব পায়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।

এর বিপরীতে ভারতের নিজস্ব সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস উৎপাদনের উদাহরণ তুলে ধরে বাংলাদেশের সমুদ্রভাগে অনুসন্ধানের ধীরগতির বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে।

সীমান্তের গ্যাস নিয়ে কী অভিযোগ রয়েছে?

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ভূগর্ভস্থ গ্যাস নিয়েও আলাদা আলোচনা রয়েছে। দুই দেশের সীমান্তের দুই পাশে ভূগর্ভে গ্যাসের চাপের পার্থক্য থাকলে এক পাশের সম্পদ অন্য দিকে সরে যেতে পারে—এমন বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নির্দিষ্ট গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ভারত ‘লো প্রেসার জোন’ তৈরি করে ভূগর্ভস্থ গ্যাস টেনে নিচ্ছে—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে।

তবে বাংলাদেশের অংশে অনুসন্ধান বন্ধ থাকা এবং ভারতের অংশে জ্বালানি উত্তোলনের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও যাচাইয়ের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।

প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পুনর্মূল্যায়ন

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এসব ক্ষেত্রের সম্ভাব্য অবদান কতটা হতে পারে, তা জানতে পুরোনো কূপগুলোর নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন অনুসন্ধান চালানো, সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে লালমাই ও কসবা-তারাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকৃত মজুত এবং উত্তোলনযোগ্য সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করা গেলে সম্ভাবনার বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের গ্যাস ও তেলসম্পদের সম্ভাবনা নিয়ে যত আলোচনা বা অভিযোগই থাকুক, সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ভূতাত্ত্বিক তথ্য। কোন এলাকায় কত সম্পদ রয়েছে, কোনটি বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা সম্ভব এবং কোনো প্রকল্প কেন বন্ধ বা ধীরগতিতে রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে দরকার স্বচ্ছ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশ্য তথ্য।

অভিযোগ কিংবা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে এই তথ্যগুলোই নির্ধারণ করতে পারে বাংলাদেশের মাটির নিচে ও সমুদ্রভাগে থাকা জ্বালানি সম্পদের প্রকৃত সম্ভাবনা।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ