ঢাকা, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রতিদিন ডিম খেলে শরীরে কী পরিবর্তন আসে, কতটি খাওয়া ঠিক?

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৭ ১৬:২০:৪৭
প্রতিদিন ডিম খেলে শরীরে কী পরিবর্তন আসে, কতটি খাওয়া ঠিক?

সকালের নাশতায় ডিম—বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পরিচিত একটি খাবার। কেউ সেদ্ধ ডিম খান, কেউ ভাজি বা অমলেট। কিন্তু প্রতিদিন ডিম খেলে শরীরে আসলে কী পরিবর্তন আসে? ডিম কি প্রতিদিন খাওয়া নিরাপদ, নাকি কোলেস্টেরলের ভয়ে এর পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া উচিত?

পুষ্টিবিদদের আলোচনায় ডিমকে শুধু কোলেস্টেরলের উৎস হিসেবে দেখার প্রবণতা এখন অনেকটাই বদলেছে। ডিমে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি কোলিন, ভিটামিন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। তবে ডিমের উপকার কতটা পাওয়া যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে কতটি ডিম খাওয়া হচ্ছে এবং ডিমের সঙ্গে আর কী খাবার খাওয়া হচ্ছে তার ওপর।

বিশেষ করে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন একটি সম্পূর্ণ ডিম সাধারণত স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। অন্যদিকে যাদের LDL কোলেস্টেরল বেশি, ডায়াবেটিস বা হৃদ্‌রোগের মতো নির্দিষ্ট ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ডিমের পরিমাণ ব্যক্তিগতভাবে ঠিক করা প্রয়োজন।

ডিমে শরীরের জন্য কী কী পুষ্টি আছে?

ডিমকে পুষ্টিকর খাবার বলার অন্যতম কারণ হলো—অল্প পরিমাণ খাবারের মধ্যেই বেশ কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়। ডিম প্রোটিনের একটি ভালো উৎস এবং এতে B ভিটামিন, আয়রন, জিঙ্কসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে।

ডিমের কুসুমে কোলিন থাকে। জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (NIH) তথ্য অনুযায়ী, একটি বড় সেদ্ধ ডিমে প্রায় ১৪৭ মিলিগ্রাম কোলিন থাকে, যা প্রাপ্তবয়স্ক নারীর দৈনিক প্রয়োজনের প্রায় ২৭ শতাংশ। কোলিন মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমসহ শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রয়োজন।

এ ছাড়া ডিমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে।

প্রতিদিন একটি ডিম খেলে কী পরিবর্তন হতে পারে?

১. খাদ্যতালিকায় ভালো মানের প্রোটিন যোগ হয়

ডিমের প্রোটিন শরীরের পেশি, টিস্যু ও অন্যান্য কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড সরবরাহ করে। তাই নিয়মিত ডিম খাওয়া দৈনিক প্রোটিন গ্রহণের একটি সহজ উপায় হতে পারে।

তবে শুধু ডিম খেলেই শরীরের সব প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হয় না। মাছ, ডাল, বাদাম, দুধ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎসও খাদ্যতালিকায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

২. দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সহায়তা করতে পারে

প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার সাধারণত তৃপ্তি বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে নাশতায় ডিমের সঙ্গে শাকসবজি বা পূর্ণ শস্যজাত খাবার রাখলে অনেকের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত নাশতা করার প্রবণতা কমতে পারে।

তবে ডিম নিজে ওজন কমানোর কোনো “ম্যাজিক” খাবার নয়। মোট ক্যালরি গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম এবং পুরো খাদ্যতালিকাই ওজন নিয়ন্ত্রণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৩. কোলিনের ভালো উৎস পাওয়া যায়

ডিমের একটি বড় পুষ্টিগত সুবিধা হলো কোলিন। এই পুষ্টি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে এবং কোষের আবরণ তৈরিতেও প্রয়োজন হয়।

একটি বড় সেদ্ধ ডিমে প্রায় ১৪৭ মিলিগ্রাম কোলিন থাকে।

৪. প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ যোগ হয়

ডিমে B ভিটামিন, ভিটামিন A, আয়রন, জিঙ্কসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ফলে একটি সুষম খাদ্যতালিকায় ডিম যুক্ত করলে একাধিক পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

৫. চোখের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু পুষ্টি পাওয়া যায়

ডিমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন রয়েছে—এগুলো চোখে পাওয়া যায় এমন ক্যারোটিনয়েড অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।

তবে শুধু ডিম খেলেই চোখের সব ধরনের সমস্যা প্রতিরোধ হবে—এমন দাবি করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

ডিম খেলেই কি কোলেস্টেরল বেড়ে যায়?

এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা যায়। ডিমের কুসুমে খাদ্যতালিকাগত কোলেস্টেরল থাকে। American Heart Association-এর তথ্য অনুযায়ী, একটি বড় সম্পূর্ণ ডিমে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম খাদ্যতালিকাগত কোলেস্টেরল থাকতে পারে।

তবে খাবারের কোলেস্টেরল এবং রক্তের কোলেস্টেরল এক বিষয় নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তের কোলেস্টেরলের ওপর খাদ্যের মোট চর্বির ধরন—বিশেষ করে স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট—গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অর্থাৎ ডিম খাওয়ার পাশাপাশি যদি নিয়মিত বেকন, সসেজ, অতিরিক্ত মাখন বা অন্যান্য উচ্চ স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার খাওয়া হয়, তাহলে পুরো খাদ্যাভ্যাসটি বিবেচনা করা জরুরি।

তাহলে প্রতিদিন কয়টি ডিম খাওয়া ঠিক?

সবার জন্য নির্দিষ্ট করে “প্রতিদিন দুইটি” বা “তিনটি” ডিম নিরাপদ—এমন সাধারণ নিয়ম নেই।

American Heart Association-এর বিজ্ঞানভিত্তিক পরামর্শ অনুযায়ী, সুস্থ ব্যক্তিরা প্রতিদিন সর্বোচ্চ একটি সম্পূর্ণ ডিম খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন। একই সঙ্গে খাদ্যতালিকায় স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম রাখা এবং সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, স্বাভাবিক কোলেস্টেরল থাকা বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য AHA-র একই পরামর্শে দিনে দুইটি পর্যন্ত ডিমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই “ডিম যত বেশি, শরীর তত বেশি শক্তিশালী”—এমন ধারণা ঠিক নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।

কারা ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন?

যাদের LDL কোলেস্টেরল বেশি, তাদের ডিমসহ খাদ্যতালিকাগত কোলেস্টেরল ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের উৎসগুলো নিয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

এ ছাড়া ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনো বিশেষ স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকলে নিয়মিত বেশি পরিমাণ ডিম খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো। AHA-ও ডিসলিপিডেমিয়া বা রক্তে চর্বির মাত্রা অস্বাভাবিক থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডিম খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছে।

ডিম কীভাবে খেলে বেশি স্বাস্থ্যকর?

ডিমের উপকার শুধু ডিমের ওপর নির্ভর করে না; রান্নার পদ্ধতি ও সঙ্গে খাওয়া খাবারও গুরুত্বপূর্ণ।

সেদ্ধ ডিম বা অল্প তেলে রান্না করা ডিমের সঙ্গে সবজি, সালাদ, ডাল বা পূর্ণ শস্যজাত খাবার রাখা যেতে পারে। বিপরীতে অতিরিক্ত মাখন, ঘি, চিজ, সসেজ বা বেকনের সঙ্গে নিয়মিত ডিম খেলে পুরো খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ক্যালরি বেড়ে যেতে পারে।

আর কাঁচা বা আধসেদ্ধ ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। Salmonella সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে ডিমের সাদা ও কুসুম ভালোভাবে রান্না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

ডিম নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা

ডিমকে একদিকে যেমন অস্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, অন্যদিকে প্রতিদিন অনেকগুলো ডিম খেলেই অতিরিক্ত স্বাস্থ্য উপকার হবে—এমন প্রমাণও নেই।

সুস্থ অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য প্রতিদিন একটি সম্পূর্ণ ডিম একটি বাস্তবসম্মত পরিমাণ, যদি সামগ্রিক খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও অন্যান্য প্রোটিনের উৎসও থাকে। তবে উচ্চ LDL কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস বা হৃদ্‌রোগের মতো পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।

অর্থাৎ, ডিমের ক্ষেত্রে মূল বিষয় শুধু “কতটি?” নয়—“কীভাবে এবং কোন খাদ্যের সঙ্গে?” সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

FAQ

প্রশ্ন: প্রতিদিন একটি ডিম খাওয়া কি নিরাপদ?

উত্তর: সুস্থ ব্যক্তিদের জন্য প্রতিদিন একটি সম্পূর্ণ ডিম স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে বলে American Heart Association জানিয়েছে।

প্রশ্ন: প্রতিদিন দুই-তিনটি ডিম খাওয়া যাবে?

উত্তর: সবার জন্য একই পরিমাণ প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে নিয়মিত বেশি ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বিবেচনা করা উচিত।

প্রশ্ন: ডিমের কুসুম কি বাদ দিতে হবে?

উত্তর: কুসুমে কোলেস্টেরলের পাশাপাশি কোলিন ও অন্যান্য পুষ্টি রয়েছে। তাই সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে শুধু কোলেস্টেরলের ভয়ে কুসুম সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া প্রয়োজন—এমন সাধারণ নির্দেশনা নেই।

প্রশ্ন: ডিম খেলে কি ওজন কমে?

উত্তর: ডিম প্রোটিনসমৃদ্ধ হওয়ায় পেট ভরা রাখতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু ডিম নিজে ওজন কমানোর খাবার নয়। মোট ক্যালরি গ্রহণ ও পুরো খাদ্যাভ্যাসই ওজন নিয়ন্ত্রণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন: কোলেস্টেরল বেশি থাকলে কি ডিম খাওয়া যাবে?

উত্তর: খাওয়া যাবে কি না এবং কতটা খাওয়া উচিত, তা ব্যক্তির LDL ও সামগ্রিক হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে। এমন অবস্থায় চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করা নিরাপদ।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: