ঘুমানোর আগে মোবাইল দেখলে শরীরে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে
রাতে বিছানায় যাওয়ার পরও হাতে মোবাইল নিয়ে স্ক্রল করা, ভিডিও দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কিংবা খবর পড়া এখন অনেকেরই প্রতিদিনের অভ্যাস। কিন্তু ঘুমানোর ঠিক আগে এই অভ্যাস শরীরকে বিশ্রামের প্রস্তুতি থেকে আবারও সক্রিয় অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে মোবাইলের স্ক্রিন থেকে আসা আলো, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা এবং উত্তেজক কনটেন্ট দেখার কারণে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে, ঘুমের সময় কমে যেতে পারে এবং সামগ্রিক ঘুমের মানও খারাপ হতে পারে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বড় পর্যালোচনা ও মেটা-অ্যানালাইসিসে ২০টিরও বেশি দেশের ৪১ হাজার ৭১৬ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়া ব্যবহারের সঙ্গে কম ঘুমের মান ও বেশি ঘুম-সংক্রান্ত সমস্যার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সমস্যার সম্পর্ক ছিল উল্লেখযোগ্য।
মোবাইলের আলো কেন ঘুমে বাধা দিতে পারে
মানুষের শরীরে ঘুম ও জাগরণের একটি স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ রয়েছে, যাকে সার্কাডিয়ান রিদম বলা হয়। সন্ধ্যার পর শরীর ধীরে ধীরে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয় এবং মেলাটোনিন নামের হরমোনের মাত্রা বাড়তে থাকে। কিন্তু রাতে উজ্জ্বল কৃত্রিম আলো এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে।
স্মার্টফোনের স্ক্রিনে স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো, বিশেষ করে নীল আলোর অংশ থাকে। রাতে এ ধরনের আলোর সংস্পর্শ মেলাটোনিন নিঃসরণ দেরি বা কমিয়ে দিতে পারে এবং ঘুমের সময় পিছিয়ে দিতে পারে।
তবে বিষয়টি শুধু ‘নীল আলো’তেই সীমাবদ্ধ নয়। মোবাইল ব্যবহার করতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় কখন ঘুমানোর কথা ছিল সেটি ভুলে যায়, ফলে স্বাভাবিক ঘুমের সময়ও কমে যায়। গবেষণায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের এই সময়-বিলম্বকেও ঘুমের সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে।
ঘুম আসতে দেরি হতে পারে
ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করলে মস্তিষ্ককে বিশ্রামের অবস্থায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় কমে যেতে পারে। একটি পরীক্ষামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে আলো-নিঃসরণকারী ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের ঘুমানোর সময় গড়ে প্রায় আধা ঘণ্টা পিছিয়ে গিয়েছিল এবং মেলাটোনিনের স্বাভাবিক সময়সূচিও প্রভাবিত হয়েছিল।
অর্থাৎ, বিছানায় যাওয়ার সময় ঠিক থাকলেও মোবাইল দেখতে দেখতে ঘুমের সময় পিছিয়ে যেতে পারে। নিয়মিত এমন হলে প্রতিদিনের মোট ঘুমের সময় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
শুধু আলো নয়, মোবাইলে কী দেখছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ
ঘুমের আগে মোবাইলে শান্ত ধরনের কোনো বিষয় পড়া এবং উত্তেজনাপূর্ণ খবর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ক, ভয় বা উদ্বেগ তৈরি করে এমন ভিডিও দেখার প্রভাব এক নয়।
ঘুমের আগে আবেগপূর্ণ বা উত্তেজক কনটেন্ট মস্তিষ্ককে আরও সক্রিয় রাখতে পারে। ফলে শরীর বিছানায় থাকলেও মন সহজে শান্ত হতে চায় না। CDC-এর ঘুমবিষয়ক নির্দেশনাতেও ঘুমের আগে উত্তেজক কনটেন্ট ও স্ক্রিন এড়িয়ে শান্ত পরিবেশ তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটির পর একটি পোস্ট, ভিডিও বা খবর দেখার ক্ষেত্রে ‘আরেকটি দেখেই বন্ধ করব’—এমন অভ্যাস সহজেই দীর্ঘ স্ক্রিন টাইমে পরিণত হতে পারে।
ঘুমের মান খারাপ হওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে
শুধু ঘুমের সময় কমে যাওয়া নয়, মোবাইল ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের মান কমে যাওয়ার সম্পর্কও বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া গেছে।
২০২৪ সালের মেটা-অ্যানালাইসিসে ৫৫টি গবেষণা ও ৪১ হাজার ৭১৬ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে সাধারণ ইলেকট্রনিক মিডিয়া ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের মান কমে যাওয়ার এবং সমস্যাজনক ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সমস্যার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়।
আরেকটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ১৭টি গবেষণার ৩৬ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে খারাপ ঘুমের মান, ঘুমের ঘাটতি এবং ঘুম আসতে বেশি সময় লাগার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ ধরনের গবেষণাগুলো মূলত পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় এগুলো থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে মোবাইলই সরাসরি কারণ—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
সকালে ক্লান্তি ও মনোযোগে প্রভাব পড়তে পারে
রাতে ঘুমের সময় কমে গেলে তার প্রভাব পরের দিনেও থাকতে পারে। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম মনোযোগ, স্মৃতি, মেজাজ এবং দৈনন্দিন কর্মক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। CDC বলছে, ভালো ঘুম মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহারের সমস্যা শুধু রাতের ঘুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত দেরিতে ঘুমানো বা পর্যাপ্ত ঘুম না হলে দিনের বেলায় ঝিমুনি, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা কিংবা কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো বিষয় দেখা দিতে পারে।
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ
শিশু ও কিশোরদের ঘুমের ক্ষেত্রে রাতে মোবাইল বা অন্য স্ক্রিন ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় সিস্টেমেটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসে স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোরদের মধ্যে শোয়ার সময় মিডিয়া ডিভাইস ব্যবহার কম ঘুম, খারাপ ঘুমের মান এবং দিনের অতিরিক্ত ঘুমভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
CDC-ও কিশোরদের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে সন্ধ্যার পর প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ এবং সম্ভব হলে শোবার ঘর থেকে ডিজিটাল ডিভাইস দূরে রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
ঘুমানোর কতক্ষণ আগে মোবাইল বন্ধ করা ভালো?
সবার জন্য একই সময়সীমা নির্ধারণ করা কঠিন হলেও, স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস হিসেবে ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করার পরামর্শ দেয় CDC।
American Academy of Sleep Medicine-ও ঘুমের আগে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট হ্যান্ডহেল্ড ইলেকট্রনিক ডিভাইসের নীল আলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
যাদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে শুধু মোবাইল বন্ধ করাই নয়—প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও জাগা, ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখা এবং ঘুমের আগে আরামদায়ক রুটিন তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল ব্যবহার করতেই হলে কী করবেন?
কাজ বা জরুরি প্রয়োজনে ঘুমের আগে মোবাইল ব্যবহার করতেই হলে কয়েকটি বিষয় মেনে চলা যেতে পারে—
স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখুন।
ফোনের Night Mode বা blue-light reduction ফিচার ব্যবহার করতে পারেন।
ঘুমের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ক, উত্তেজক ভিডিও বা উদ্বেগ তৈরি করে এমন খবর এড়িয়ে চলুন।
নোটিফিকেশন বন্ধ বা সাইলেন্ট করে রাখুন।
বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় স্ক্রল না করে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে ফোন সরিয়ে রাখুন।
সম্ভব হলে ফোনটি বিছানা থেকে দূরে রাখুন।
ঘুমের আগে মোবাইলের পরিবর্তে বই পড়া, হালকা স্ট্রেচিং বা শান্ত কোনো রুটিন বেছে নিন।
তবে মনে রাখা দরকার, শুধু Night Mode বা blue-light filter চালু করলেই মোবাইল ব্যবহারের সব সমস্যা দূর হয়ে যায়—এমন প্রমাণ নেই। একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় blue-light filter ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের মানের শক্তিশালী উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তাই ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
মোবাইল ব্যবহার কমানোর পরও যদি নিয়মিত ঘুম আসতে সমস্যা হয়, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়, সকালে ঘুম থেকে উঠে সতেজ না লাগে অথবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমভাব থাকে, তাহলে বিষয়টি শুধু মোবাইল ব্যবহারের কারণে হচ্ছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ঘুমের সমস্যার পেছনে অনিদ্রা, মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচি, ওষুধ, ক্যাফেইনসহ আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
ঘুমানোর আগে মোবাইল দেখা নিজে থেকেই সবার শরীরে একই ধরনের ক্ষতি করবে—এমন কথা বৈজ্ঞানিকভাবে বলা যায় না। তবে বর্তমান গবেষণায় রাতের ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার, বিশেষ করে দীর্ঘ বা সমস্যাজনক স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের সময় কমে যাওয়া, ঘুম আসতে দেরি হওয়া এবং ঘুমের মান খারাপ হওয়ার ধারাবাহিক সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাই ঘুমকে অগ্রাধিকার দিতে চাইলে সবচেয়ে সহজ পরিবর্তন হতে পারে—ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে মোবাইল দূরে রাখা এবং সেই সময়টুকু শান্ত একটি ঘুমের রুটিনে ব্যবহার করা।
FAQ
১. ঘুমানোর কতক্ষণ আগে মোবাইল বন্ধ করা উচিত?
CDC অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করার পরামর্শ দেয়। AASM ৩০–৬০ মিনিট আগে হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইসের নীল আলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
২. মোবাইলের নীল আলো কি ঘুম নষ্ট করে?
রাতে কৃত্রিম আলো, বিশেষ করে স্বল্প তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো, মেলাটোনিনের স্বাভাবিক নিঃসরণে বাধা দিতে পারে এবং ঘুমের সময় পিছিয়ে দিতে পারে। তবে মোবাইল ব্যবহারের প্রভাব শুধু নীল আলো নয়; স্ক্রিনে দীর্ঘ সময় থাকা ও উত্তেজক কনটেন্টও ভূমিকা রাখতে পারে।
৩. Night Mode চালু করলে কি মোবাইল দেখার ক্ষতি পুরোপুরি কমে যায়?
না। Night Mode বা blue-light filter কিছু আলোর এক্সপোজার কমাতে পারে, কিন্তু এগুলো মোবাইল ব্যবহারের সব প্রভাব দূর করে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ঘুমের আগে স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ঘুমের আগে মোবাইল দেখলে কি অনিদ্রা হয়?
মোবাইল ব্যবহার অনিদ্রার একমাত্র কারণ নয়। তবে রাতে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের সঙ্গে ঘুম আসতে দেরি, কম ঘুম এবং খারাপ ঘুমের মানের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
৫. ঘুমানোর আগে মোবাইলের বদলে কী করা যেতে পারে?
শান্ত পরিবেশে বই পড়া, হালকা স্ট্রেচিং, প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত প্রস্তুতি নেওয়া বা নিয়মিত একটি শান্ত bedtime routine অনুসরণ করা যেতে পারে। CDC-ও ঘুমের আগে শান্ত রুটিন ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস কমানোর পরামর্শ দেয়।
তানভির ইসলাম/