প্রতিদিন কত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত? বয়সভেদে জানুন
শুধু বেশি সময় ঘুমালেই যে শরীর ভালো থাকবে, তা নয়; বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত সময় ঘুমানো এবং ঘুমের মান—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। নবজাতকের যেখানে দিনে ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুম প্রয়োজন হতে পারে, সেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্কের সাধারণত অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুম দরকার। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমে আসে।
অনেকেই ব্যস্ততার কারণে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা ঘুমিয়েই দিনের কাজ চালিয়ে নেন। আবার কেউ ছুটির দিনে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে সপ্তাহের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেন। কিন্তু নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তার প্রভাব মনোযোগ, স্মৃতি, মেজাজ, শারীরিক স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন কর্মক্ষমতায় পড়তে পারে।
তাহলে বয়স অনুযায়ী একজন মানুষের আসলে কত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত?
বয়সভেদে প্রতিদিন কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন
যুক্তরাষ্ট্রের Centers for Disease Control and Prevention (CDC) এবং American Academy of Sleep Medicine (AASM)-এর সুপারিশ অনুযায়ী ঘুমের প্রয়োজন বয়সের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। নিচের হিসাবটি সাধারণভাবে সুস্থ মানুষের জন্য প্রযোজ্য।
নবজাতকের সবচেয়ে বেশি ঘুম কেন প্রয়োজন?
জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসে শিশুর শরীর ও মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়। এ সময় ঘুমের প্রয়োজনও বেশি থাকে। CDC অনুযায়ী, ০ থেকে ৩ মাস বয়সী নবজাতকের দিনে মোট ১৪–১৭ ঘণ্টা ঘুম হতে পারে। ৪–১২ মাস বয়সে প্রয়োজন হয় ১২–১৬ ঘণ্টা, যার মধ্যে দিনের ঘুমও অন্তর্ভুক্ত।
তবে নবজাতকের ঘুম সাধারণত একটানা হয় না। দিনের বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট পর্বে ঘুমানো স্বাভাবিক। তাই বড়দের মতো শিশুর ঘুমকে শুধু রাতের সময় দিয়ে হিসাব করা ঠিক নয়।
১ থেকে ৫ বছর বয়সে ঘুমের প্রয়োজন
শিশু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোট ঘুমের প্রয়োজন কমতে থাকে। ১–২ বছর বয়সী শিশুর প্রতিদিন ১১–১৪ ঘণ্টা এবং ৩–৫ বছর বয়সী শিশুর ১০–১৩ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। এই হিসাবের মধ্যে দিনের ঘুমও ধরা হয়।
এই বয়সে পর্যাপ্ত ঘুম শিশুর মনোযোগ, আচরণ, শেখার ক্ষমতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। AASM-এর সুপারিশ অনুযায়ী নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম শিশুদের ভালো স্বাস্থ্য ও দিনের সতর্কতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
স্কুলপড়ুয়া শিশুর কত ঘণ্টা ঘুম দরকার?
৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন ৯–১২ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। স্কুল, পড়াশোনা, খেলাধুলা ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজের মধ্যে অনেক শিশুর ঘুমের সময় কমে যেতে পারে।
নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম শিশুদের মনোযোগ, শেখা, স্মৃতি ও আচরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। বিপরীতে ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে মনোযোগ ও আচরণগত সমস্যা এবং স্কুলের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাবের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
কিশোরদের জন্য ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম জরুরি
১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের প্রতিদিন ৮–১০ ঘণ্টা ঘুমের সুপারিশ রয়েছে। এই বয়সে শরীর ও মস্তিষ্কের বিকাশ চলতে থাকে, অথচ স্কুল, পড়াশোনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমিং ও অন্যান্য কারণে অনেক কিশোর রাত জাগার অভ্যাস তৈরি করে।
AASM জানিয়েছে, নিয়মিত সুপারিশের চেয়ে কম ঘুম কিশোরদের মনোযোগ, আচরণ ও শেখার সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে দুর্ঘটনা, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও বিষণ্নতার মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
প্রাপ্তবয়স্কদের কত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত?
১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। ৬১–৬৪ বছর বয়সীদের জন্য ৭–৯ ঘণ্টা এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমের সুপারিশ রয়েছে।
তবে ‘৭ ঘণ্টা’কে সবার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন কিছুটা আলাদা হতে পারে। তাই শুধু ঘুমের সময় নয়, ঘুম থেকে উঠে সতেজ লাগছে কি না এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমভাব হচ্ছে কি না—সেটিও বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কী হতে পারে?
ঘুম শরীরের নিষ্ক্রিয় সময় নয়; বরং এটি শরীর ও মস্তিষ্কের পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ, স্মৃতি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি হলে দিনের বেলায় মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, অতিরিক্ত ক্লান্তি ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব শেখা ও আচরণের ওপরও পড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে পর্যাপ্ত ঘুম না পাওয়ার সঙ্গে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্কও পাওয়া গেছে। তবে কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট রোগের কারণ শুধু ঘুমের ঘাটতি—এমন সরল সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না; স্বাস্থ্যঝুঁকির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে।
বেশি ঘুমালেই কি বেশি উপকার?
এখানেও একটি ভুল ধারণা রয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় ঘুমানো মানেই অতিরিক্ত স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া—এমন নিয়ম নেই। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণ সুপারিশ অন্তত ৭ ঘণ্টা হলেও ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন আলাদা হতে পারে।
অস্বাভাবিকভাবে বেশি ঘুমের প্রয়োজন যদি নিয়মিত দেখা দেয়, বিশেষ করে পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি সারাদিন ক্লান্তি বা ঘুমভাব থাকে, তাহলে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
শুধু কত ঘণ্টা ঘুমালেন, সেটিই কি গুরুত্বপূর্ণ?
না। স্বাস্থ্যকর ঘুমের জন্য সময়, নিয়মিততা, উপযুক্ত সময় এবং ঘুমের মান—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ ৮ ঘণ্টা বিছানায় থাকলেও যদি বারবার ঘুম ভেঙে যায় বা ঘুমের মান খারাপ হয়, তাহলে সেই ঘুম পর্যাপ্ত বিশ্রাম নাও দিতে পারে। CDC-ও পর্যাপ্ত সময়ের পাশাপাশি ভালো মানের ঘুমকে স্বাস্থ্যকর ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তাই ঘুমের হিসাব করার সময় শুধু ঘড়ির দিকে না তাকিয়ে ঘুমের ধারাবাহিকতা এবং পরের দিনের শারীরিক অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
ভালো ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলতে যা করতে পারেন
প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে কয়েকটি সহজ অভ্যাস কাজে আসতে পারে—
প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।
ঘুমের আগে মোবাইল, কম্পিউটার বা অন্য স্ক্রিনের ব্যবহার কমিয়ে দিন।
রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ এড়িয়ে চলুন।
ঘুমের পরিবেশ শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন।
প্রতিদিন নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করুন।
ঘুমের সময়কে কাজ বা বিনোদনের জন্য নিয়মিত বাদ দেবেন না।
কখন ঘুমের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
পর্যাপ্ত সময় বিছানায় থাকার পরও যদি নিয়মিত ঘুম না আসে, বারবার ঘুম ভেঙে যায়, খুব সকালে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আর ঘুম না আসে অথবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমভাব থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। CDC ঘুমের সমস্যা থাকলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেয়।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা চলতে থাকলে শুধু ঘুমের সময় বাড়ানোর চেষ্টা না করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
প্রতিদিন সবার জন্য একই পরিমাণ ঘুম প্রয়োজন হয় না। বয়সের সঙ্গে ঘুমের চাহিদা বদলায়। নবজাতকের জন্য ১৪–১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুম স্বাভাবিক হতে পারে, শিশুদের প্রয়োজন হয় আরও বেশি সময়, কিশোরদের ৮–১০ ঘণ্টা এবং অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
তাই ‘আমি মাত্র ৫ ঘণ্টা ঘুমিয়েও ঠিক আছি’—এমন অভ্যাসকে দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ঘুমের পাশাপাশি ঘুমের মান ও নিয়মিততার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
FAQ
১. একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন কত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত?
১৮–৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমানোর সুপারিশ করা হয়। ৬১–৬৪ বছর বয়সে ৭–৯ ঘণ্টা এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সে ৭–৮ ঘণ্টা সুপারিশ করা হয়েছে।
২. ৫–৬ ঘণ্টা ঘুম কি যথেষ্ট?
অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিয়মিত ৫–৬ ঘণ্টা ঘুম সুপারিশকৃত মাত্রার নিচে। প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিত অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ রয়েছে।
৩. কিশোরদের কত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত?
১৩–১৮ বছর বয়সী কিশোরদের প্রতিদিন ৮–১০ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত।
৪. শিশুদের ঘুম কত ঘণ্টা প্রয়োজন?
বয়স অনুযায়ী প্রয়োজন আলাদা। ৪–১২ মাস বয়সী শিশুর ১২–১৬ ঘণ্টা, ১–২ বছরের শিশুর ১১–১৪ ঘণ্টা, ৩–৫ বছরের শিশুর ১০–১৩ ঘণ্টা এবং ৬–১২ বছরের শিশুর ৯–১২ ঘণ্টা ঘুমের সুপারিশ রয়েছে। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে দিনের ঘুমও এই হিসাবের মধ্যে পড়ে।
৫. বেশি ঘুমানো কি সবসময় ভালো?
না। ঘুমের প্রয়োজন বয়স ও ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত হয়। সুপারিশের চেয়ে বেশি ঘুম মানেই বেশি স্বাস্থ্য উপকার—এমন নয়। আবার নিয়মিত অস্বাভাবিক বেশি ঘুমের প্রয়োজন হলে বা পর্যাপ্ত ঘুমের পরও অতিরিক্ত ঘুমভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
তানভির ইসলাম/