ঢাকা, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মাঝরাতে বারবার ঘুম ভাঙে? যে বিষয়গুলো খেয়াল করবেন

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৮ ২০:০২:২৬
মাঝরাতে বারবার ঘুম ভাঙে? যে বিষয়গুলো খেয়াল করবেন

রাতে ঘুমিয়ে পড়ার পর একবার-দুবার চোখ খুলে যাওয়া সবসময় কোনো রোগের লক্ষণ নয়। তবে মাঝরাতে নিয়মিত বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া, দীর্ঘ সময় জেগে থাকা এবং পরে ঘুম ফিরতে না চাওয়া যদি দিনের ক্লান্তি বা কাজে মনোযোগের সমস্যার কারণ হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। এর পেছনে অনিয়মিত জীবনযাপন থেকে শুরু করে অনিদ্রা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, অতিরিক্ত ক্যাফেইন, অ্যালকোহল, মানসিক চাপ, ব্যথা কিংবা রাতে বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন—বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।

বিশেষ করে ঘুম ভাঙার সঙ্গে যদি জোরে নাক ডাকা, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, হাঁসফাঁস করে ওঠা, দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব কিংবা দীর্ঘদিনের ক্লান্তি থাকে, তাহলে শুধু ঘুমের অভ্যাসকে দায়ী না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

মাঝরাতে ঘুম ভাঙার সাধারণ কারণ কী?

ঘুমের মধ্যে বারবার জেগে ওঠার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সবার ক্ষেত্রে একই কারণ কাজ করে না। তাই কখন ঘুম ভাঙছে, কেন ভাঙছে এবং জেগে ওঠার পর কী হচ্ছে—এসব বিষয় খেয়াল করা গুরুত্বপূর্ণ।

১. অনিদ্রা বা ইনসমনিয়া

অনিদ্রার একটি সাধারণ লক্ষণ হলো রাতে একাধিকবার ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং পরে আবার ঘুমাতে সমস্যা হওয়া। ঘুমানোর পর বারবার জেগে ওঠা, খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং দিনের বেলা ক্লান্ত লাগাও এর সঙ্গে থাকতে পারে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অনিয়মিত ঘুমের সময়, ক্যাফেইন, নিকোটিন, অ্যালকোহলসহ বিভিন্ন বিষয় অনিদ্রার সঙ্গে সম্পর্কিত।

২. স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ আছে কি না দেখুন

রাতে ঘুম ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া। এ অবস্থায় ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস বারবার বন্ধ হয়ে আবার শুরু হতে পারে।

যদি আপনার ক্ষেত্রে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস বা দম বন্ধ হওয়ার মতো শব্দ, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া এবং দিনের বেলা অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে বুঝতে পারেন না; পাশে থাকা কেউ এসব লক্ষণ লক্ষ্য করতে পারেন।

৩. রাতে বেশি ক্যাফেইন বা নিকোটিন

বিকেল বা সন্ধ্যার পর চা, কফি কিংবা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় বেশি খেলে ঘুমের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে। নিকোটিনও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই শুধু রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে কী খাচ্ছেন তা নয়, দিনের শেষ ভাগে কী গ্রহণ করছেন সেটিও খেয়াল করা দরকার।

৪. অ্যালকোহল ঘুম আনলেও ঘুম ধরে রাখতে সমস্যা করতে পারে

অ্যালকোহল খাওয়ার পর অনেকের দ্রুত ঘুম চলে আসতে পারে। কিন্তু এটি রাতের ঘুমকে বিঘ্নিত করতে পারে এবং ঘুমের মধ্যে জেগে ওঠার প্রবণতা বাড়াতে পারে। তাই ঘুমানোর আগে অ্যালকোহলকে ঘুমের সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়।

৫. ঘরের পরিবেশও বড় কারণ

অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা ঘর, বাইরের শব্দ, অস্বস্তিকর বিছানা কিংবা ঘুমের সময় অতিরিক্ত আলো—এসব কারণেও মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। শোবার ঘরকে শান্ত, অন্ধকার এবং আরামদায়ক তাপমাত্রায় রাখা ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়ক।

৬. রাতে বারবার প্রস্রাবের চাপ

কিছু মানুষের ঘুম ভাঙার প্রধান কারণ হতে পারে রাতে প্রস্রাবের প্রয়োজন হওয়া। আবার কখনো উদ্বেগ, ব্যথা বা অনিদ্রার কারণে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর মানুষ টয়লেটে যান—অর্থাৎ সব ক্ষেত্রে মূত্রথলি পূর্ণ থাকাই প্রথম কারণ নয়। নিয়মিতভাবে রাতে একাধিকবার টয়লেটে যেতে হলে এর পেছনের কারণ খুঁজে দেখা দরকার।

৭. ব্যথা, অস্বস্তি বা অন্য শারীরিক সমস্যা

দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, অস্বস্তি, অ্যাসিড রিফ্লাক্সসহ রাতের বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গ ঘুমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। পায়ে অস্বস্তি, টান বা নড়াচড়া করার তীব্র ইচ্ছা থাকলেও ঘুম বারবার ভাঙতে পারে।

৮. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ

দিনের দুশ্চিন্তা রাতে ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর মাথায় নানা চিন্তা ঘুরতে থাকলে আবার ঘুমিয়ে পড়া কঠিন হয়ে যায়। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস, উদ্বেগ বা বিষণ্নতাও অনিদ্রার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে কী করবেন?

ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল হাতে নিয়ে সময় দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বা উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা আবার ঘুমিয়ে পড়াকে কঠিন করে তুলতে পারে। বরং পরিবেশ অন্ধকার ও শান্ত রাখা এবং শরীর-মনকে আবার বিশ্রামের অবস্থায় নেওয়ার চেষ্টা করা ভালো।

ঘুমের অভ্যাস ঠিক রাখতে প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমানোর আগে কিছুটা শান্ত হওয়ার সময় রাখা, বিকেল-সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন কমানো এবং শোবার ঘরকে আরামদায়ক রাখা উপকারী হতে পারে।

আর যদি বিছানায় শুয়ে থেকেও ঘুম না আসে, ঘুমের চিকিৎসায় ব্যবহৃত CBT-I বা Cognitive Behavioral Therapy for Insomnia-তে নির্দিষ্ট আচরণগত কৌশল ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ঘুম না এলে কিছু সময়ের জন্য বিছানা ছেড়ে থাকা এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার মতো কৌশল রয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্কদের কত ঘণ্টা ঘুম দরকার?

বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের সাধারণত রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন; অনেকের জন্য ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম উপযোগী হতে পারে। তবে শুধু মোট কত ঘণ্টা ঘুম হলো সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়—ঘুম কতটা uninterrupted বা ধারাবাহিক এবং ঘুম থেকে ওঠার পর শরীর-মন কতটা সতেজ থাকে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

রাতে বারবার ঘুম ভাঙার কারণে যদি পর্যাপ্ত সময় বিছানায় থাকার পরও সকালে ক্লান্ত লাগে, দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম পায় বা মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

মাঝে মধ্যে এক-দুদিন ঘুমের সমস্যা হওয়া সাধারণত বড় উদ্বেগের বিষয় নয়। কিন্তু নিয়মিতভাবে রাতে একাধিকবার ঘুম ভাঙলে এবং এই সমস্যা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। বিশেষ করে কয়েক মাস ধরে ঘুমের সমস্যা চলতে থাকলে বা ঘুমের অভ্যাস পরিবর্তন করেও উন্নতি না হলে চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।

নিচের লক্ষণগুলো থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার—

রাতে বারবার ঘুম ভেঙে গিয়ে আবার ঘুমাতে সমস্যা হওয়া

পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও সবসময় ক্লান্ত লাগা

দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব

জোরে নাক ডাকা

ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা হাঁসফাঁস করে ওঠা

রাতে বারবার টয়লেটে যেতে হওয়া

দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সমস্যা চলা

ঘুমের সমস্যা কাজ, পড়াশোনা বা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলা।

প্রয়োজনে চিকিৎসক ঘুমের অভ্যাস ও উপসর্গ সম্পর্কে জানতে পারেন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ঘুমের ডায়েরি রাখতে বা স্লিপ স্টাডির মতো পরীক্ষা করতে বলতে পারেন।

ঘুমের ওষুধ নিজে থেকে শুরু করা ঠিক নয়

বারবার ঘুম ভাঙছে বলে নিজের ইচ্ছায় ঘুমের ওষুধ বা ঘুমের জন্য ব্যবহৃত কোনো পণ্য শুরু করা উচিত নয়। দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার ক্ষেত্রে কারণ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের গাইডলাইনে দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার জন্য আচরণগত ও মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা, বিশেষ করে CBT-I, গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

মাঝরাতে ঘুম ভাঙলেই যে শরীরে কোনো গুরুতর সমস্যা হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। তবে যদি বিষয়টি নিয়মিত হয়, ঘুম ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় লাগে কিংবা দিনের কর্মক্ষমতা ও সতেজতায় প্রভাব পড়ে, তাহলে কারণটি খুঁজে দেখা জরুরি। বিশেষ করে নাক ডাকা, শ্বাস আটকে যাওয়া বা হাঁসফাঁস করে ওঠার মতো লক্ষণ থাকলে স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: CDC, NHS, National Institute for Occupational Safety and Health (NIOSH) এবং American Academy of Sleep Medicine-এর প্রকাশিত তথ্য।

FAQ

১. রাতে একবার-দুবার ঘুম ভাঙা কি স্বাভাবিক?

মাঝে মধ্যে ঘুমের মধ্যে জেগে ওঠা হতে পারে এবং সবসময় এটি রোগের লক্ষণ নয়। তবে নিয়মিত বারবার ঘুম ভাঙা এবং পরে ঘুমাতে সমস্যা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

২. মাঝরাতে ঘুম ভাঙার সবচেয়ে সাধারণ কারণ কী?

একটি নির্দিষ্ট কারণ সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অনিদ্রা, মানসিক চাপ, ক্যাফেইন বা নিকোটিন, অ্যালকোহল, ঘরের পরিবেশ, ব্যথা, রাতে প্রস্রাবের প্রয়োজন এবং স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।

৩. নাক ডাকলে কি মাঝরাতে ঘুম ভাঙতে পারে?

জোরে নাক ডাকার সঙ্গে যদি ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়া, হাঁসফাঁস বা দম বন্ধ হওয়ার মতো শব্দ এবং দিনের অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকে, তাহলে স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করা উচিত।

৪. রাতে বারবার ঘুম ভাঙলে মোবাইল ব্যবহার করা উচিত?

ঘুমের সমস্যা থাকলে রাতে ঘুম ভাঙার পর উজ্জ্বল স্ক্রিন ব্যবহার না করাই ভালো। ঘুমের আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার কমানোও ঘুমের অভ্যাস উন্নত করার একটি পরামর্শ।

৫. কখন ঘুমের সমস্যার জন্য ডাক্তার দেখানো উচিত?

যদি ঘুমের সমস্যা নিয়মিত হয়, কয়েক মাস ধরে চলে, দিনের কাজকর্মে প্রভাব ফেলে বা পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নাক ডাকা, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁসের মতো লক্ষণ থাকলেও চিকিৎসা মূল্যায়ন জরুরি।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: