রাতে দেরিতে ঘুমান? অভ্যাস বদলাতে মানুন এই নিয়মগুলো
রাত বাড়লেও ঘুম আসে না—মোবাইল স্ক্রল করা, কাজ শেষ করা কিংবা টিভি দেখার কারণে অনেকেরই নিয়মিত ঘুমানোর সময় পিছিয়ে যায়। একসময় রাত জাগার এই অভ্যাসই দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। তবে ঘুমের সময়কে নিয়মিত করা অসম্ভব নয়। কিছু সহজ কিন্তু ধারাবাহিক অভ্যাস মেনে চললে শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ ছন্দকে ধীরে ধীরে আগের দিকে আনা সম্ভব।
মানবদেহের একটি নিজস্ব জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম রয়েছে, যা আলো-অন্ধকারসহ বিভিন্ন পরিবেশগত সংকেতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঘুম ও জাগরণের সময় নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। রাতে উজ্জ্বল কৃত্রিম আলো এবং দিনে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলোর অভাব এই ছন্দকে বিঘ্নিত করতে পারে।
প্রথমেই ঠিক করুন ঘুম ও জাগার নির্দিষ্ট সময়
রাতে কখন ঘুমাবেন, শুধু সেটি ঠিক করলেই হবে না—প্রতিদিন সকালে কখন উঠবেন, সেটিও নির্ধারণ করা জরুরি। ছুটির দিনসহ প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস শরীরের ঘুম-জাগরণ ছন্দকে নিয়মিত রাখতে সাহায্য করে।
সপ্তাহের কর্মদিবসের সঙ্গে ছুটির দিনের ঘুমের সময়ের বড় পার্থক্যও এড়িয়ে চলা ভালো। জাতীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে ঘুম ও জাগার সময়ের পার্থক্য প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
যারা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন, তারা হঠাৎ করে খুব আগের সময়ে বিছানায় যাওয়ার বদলে নিয়মিত একটি সময়সূচিতে আসার চেষ্টা করতে পারেন। এতে নতুন রুটিনে অভ্যস্ত হওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
সকালে আলো নিন, রাতে আলো কমান
ঘুমের সময় এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে আলো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দিনের আলো শরীরকে দিনের সময় সম্পর্কে সংকেত দেয়, আর সন্ধ্যার অন্ধকার ঘুমের প্রস্তুতিতে সহায়তা করে। অন্যদিকে রাতে অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো, বিশেষ করে উজ্জ্বল স্ক্রিনের আলো, ঘুমের প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
তাই সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছু সময় বাইরে বা প্রাকৃতিক আলোর মধ্যে থাকা উপকারী হতে পারে। আর রাতে ঘুমানোর সময় যত এগিয়ে আসবে, ঘরের আলোও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা ভালো।
যাদের ঘুমের সময় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে গেছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে নির্দিষ্ট সময়ে আলো ব্যবহারের থেরাপিও কিছু সার্কাডিয়ান রিদম সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। তবে এটি সবার জন্য নিজে থেকে শুরু করার বিষয় নয়।
ঘুমের আগে মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস বদলান
রাতে বিছানায় যাওয়ার পরও মোবাইল হাতে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কিংবা বিভিন্ন ওয়েবসাইট দেখা অনেকের ঘুম দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোর প্রভাবও যুক্ত হয়।
CDC-এর ঘুমসংক্রান্ত পরামর্শে ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।
তাই ঘুমানোর আগে শেষ আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টাকে ‘স্ক্রিন-মুক্ত সময়’ হিসেবে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। মোবাইলের বদলে বই পড়া, শান্ত সংগীত শোনা, হালকা স্ট্রেচিং বা অন্য কোনো আরামদায়ক কাজে সময় কাটানো যেতে পারে।
বিকেল বা সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন কমান
রাতে ঘুম না আসার পেছনে চা, কফি বা অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের ভূমিকাও থাকতে পারে। ক্যাফেইন একটি উদ্দীপক পদার্থ এবং এর প্রভাব কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। NHLBI-এর তথ্য অনুযায়ী, ক্যাফেইনের প্রভাব ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ফলে বিকেলের শেষ দিকে বা সন্ধ্যায় কফি কিংবা অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ রাতের ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে।
যাদের রাতে ঘুমাতে সমস্যা হয়, তারা দিনের শেষভাগে ক্যাফেইন গ্রহণ কমিয়ে দেখেতে পারেন। চা, কফি, কিছু কোমল পানীয় ও চকোলেটেও ক্যাফেইন থাকতে পারে।
দিনের বেলা শরীরকে সক্রিয় রাখুন
সারাদিন প্রায় বসে থাকা এবং শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকার অভ্যাসও ঘুমের রুটিনকে প্রভাবিত করতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম ঘুমের জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে খুব জোরালো ব্যায়াম করলে কারও কারও ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।
তাই দিনের সময় হাঁটা বা নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের অভ্যাস করা যেতে পারে। ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে ভারী ব্যায়ামের পরিবর্তে শরীর ও মনকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করাই ভালো।
দিনের ঘুমের সময় নিয়ন্ত্রণ করুন
রাতে দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে নেওয়া অনেক সময় সমস্যাটি আরও জটিল করতে পারে। বিশেষ করে বিকেলের দিকে দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতে ঘুমের চাপ কমে যেতে পারে।
রাতে ঘুমাতে সমস্যা হলে দিনের ঘুম সীমিত করা বা বিকেলের পর না ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ঘুমের প্রয়োজন হলে ছোট ন্যাপ নেওয়া যেতে পারে; NHLBI সর্বোচ্চ ২০ মিনিটের ন্যাপের কথা উল্লেখ করেছে।
ঘুমের আগে একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করুন
প্রতিদিন ঘুমানোর আগে একই ধরনের শান্ত কিছু কাজ করার অভ্যাস শরীর ও মস্তিষ্ককে বিশ্রামের সময়ের সংকেত দিতে পারে। যেমন—বই পড়া, হালকা গান শোনা, গরম পানিতে গোসল করা কিংবা শিথিল হওয়ার কিছু কৌশল চর্চা করা।
NHLBI ঘুমের আগের সময়টিকে শান্ত রাখার এবং ঘুমের পরিবেশকে ঠান্ডা, নীরব ও অন্ধকার রাখার পরামর্শ দেয়।
এ কারণে ঘুমের সময় যত এগিয়ে আসবে, কাজের চাপ, উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট এবং উজ্জ্বল আলো থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
রাতের খাবার ও পানীয়ের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ
ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খুব ভারী বা বেশি পরিমাণ খাবার খেলে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তাই রাতে খুব দেরিতে বড় খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে সেটিও পরিবর্তন করা দরকার।
একইভাবে ঘুমের কাছাকাছি সময়ে অতিরিক্ত তরল পান করলে রাতে বারবার বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। NHLBI নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া এবং ঘুমের কাছাকাছি সময়ে অতিরিক্ত তরল গ্রহণ সীমিত করার পরামর্শ দেয়।
ঘুম না এলে জোর করে বিছানায় পড়ে থাকবেন না
নির্দিষ্ট সময়ে বিছানায় যাওয়ার পরও যদি ঘুম না আসে, ঘড়ির দিকে বারবার তাকিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। ঘুম না এলে কিছু সময়ের জন্য উঠে শান্ত কোনো কাজ করা এবং ঘুমঘুম ভাব এলে আবার বিছানায় যাওয়ার পদ্ধতি কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
তবে নিয়মিতভাবে ঘুমাতে সমস্যা হলে শুধু রুটিন বদলানোর ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
রাত জাগার অভ্যাস বদলাতে একটি সহজ রুটিন
যারা দীর্ঘদিন ধরে রাত জাগেন, তারা প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে রাখার চেষ্টা করতে পারেন—
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা।
সকালে প্রাকৃতিক আলোতে কিছু সময় থাকা।
দিনের বেলা নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা।
বিকেল বা সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন কমানো।
বিকেলের দীর্ঘ ন্যাপ এড়িয়ে চলা।
ঘুমের আগে অন্তত ৩০ মিনিট স্ক্রিন থেকে দূরে থাকা।
ঘুমের আগে শান্ত ও একই ধরনের একটি রুটিন তৈরি করা।
শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখা।
রাতে খুব ভারী খাবার না খাওয়া।
সপ্তাহান্তেও ঘুমের সময় খুব বেশি পরিবর্তন না করা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাত জাগার অভ্যাস বদলাতে শুধু ‘তাড়াতাড়ি বিছানায় যাওয়া’ যথেষ্ট নয়। কখন ঘুম থেকে উঠছেন, সকালে কতটা আলো পাচ্ছেন, দিনে কতটা সক্রিয় থাকছেন এবং রাতে কী করছেন—সবগুলো বিষয় মিলেই শরীরের ঘুম-জাগরণ ছন্দ তৈরি হয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
নিয়মিত ঘুমের সময় মেনে চলার পরও যদি দীর্ঘদিন ঘুমাতে সমস্যা হয়, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায়, দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম পায় বা দৈনন্দিন কাজকর্মে ঘুমের সমস্যার প্রভাব পড়ে, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মিত ঘুমের পেছনে ইনসমনিয়া বা সার্কাডিয়ান রিদম-সংক্রান্ত সমস্যা থাকতে পারে।
ঘুমের ওষুধ বা মেলাটোনিন নিজে থেকে শুরু না করে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। কারণ ঘুমের সমস্যার কারণ অনুযায়ী চিকিৎসার ধরন ভিন্ন হতে পারে।
FAQ
প্রশ্ন: রাতে দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস কি একদিনে বদলানো সম্ভব?
উত্তর: সম্ভব হলেও দীর্ঘদিনের অভ্যাস হলে নিয়মিত সময়সূচি মেনে ধীরে ধীরে রুটিনে আসা বেশি বাস্তবসম্মত। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও জাগার অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন: ঘুমানোর কতক্ষণ আগে মোবাইল বন্ধ করা ভালো?
উত্তর: CDC ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়।
প্রশ্ন: রাতে ঘুম না এলে চা বা কফি খাওয়া যাবে?
উত্তর: ঘুমের সমস্যায় ক্যাফেইন এড়িয়ে চলাই ভালো, বিশেষ করে বিকেল ও সন্ধ্যার পর। ক্যাফেইনের প্রভাব কয়েক ঘণ্টা থাকতে পারে।
প্রশ্ন: সকালে আলোতে থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: আলো শরীরের সার্কাডিয়ান ঘড়ির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। দিনের আলো জাগ্রত থাকার সময়ের সঙ্গে শরীরের ঘড়িকে সামঞ্জস্য করতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন: একজন প্রাপ্তবয়স্কের কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন?
উত্তর: বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের প্রতি রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। তবে ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- আজ ব্রাজিল বনাম অস্ট্রেলিয়া: কখন, কোথায় ও কীভাবে লাইভ দেখবেন
- বাংলাদেশ বনাম সিঙ্গাপুর ম্যাচ: সরাসরি দেখুন Live
- কলা খাওয়ার সঠিক সময় কখন? সকাল নাকি রাত, জানুন
- ব্রাজিল বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ: সরাসরি দেখুন Live
- চলছে বাংলাদেশ বনাম সিঙ্গাপুর ম্যাচ: সরাসরি দেখুন Live
- HONOR X9e Pro: ১১,০০০mAh ব্যাটারি ও ১০,০০০ নিটস ডিসপ্লে
- বাংলাদেশ বনাম সিঙ্গাপুর: শেষ হাসি হাসল কোন দল?
- বাংলাদেশ বনাম সিঙ্গাপুর ম্যাচ আজ, সময় ও লাইভ দেখার উপায়
- আজকের টাকার রেট কত: কমেছে ১৯টি দেশের টাকার মান