ঢাকা, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রকল্প বাড়ছে, কিন্তু দক্ষতা? সরকারি টাকার হিসাবে বড় প্রশ্ন

অর্থনীতি ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১২ ১৪:৪০:২০
প্রকল্প বাড়ছে, কিন্তু দক্ষতা? সরকারি টাকার হিসাবে বড় প্রশ্ন

বছর শুরুর দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আর্থিক বাস্তবায়ন থমকে আছে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে। প্রকল্পের তালিকা লম্বা হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কাজের দক্ষতা বাড়ছে কি না, এই প্রশ্ন এখন আর এড়ানো যাচ্ছে না।

সংখ্যা কী বলছে

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এডিপির আর্থিক বাস্তবায়ন ছিল ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সেই হার নেমে এসেছে ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে।

অবশ্য খরচের হার দেখে প্রকল্পের প্রকৃত অগ্রগতি কিংবা নির্মাণের মান পুরোপুরি মাপা যায় না। তবু কাজ ধীরে এগোলে বোঝা যায়, প্রকল্প পরিচালনায় কোথাও সমস্যা আছে।

টাকার টান, তাই প্রতিটি বিলম্বের মাশুল ভারী

সরকারের কাছে অর্থ চাওয়ার তালিকা দীর্ঘ, অথচ রাজস্ব আদায় দুর্বল। এ অবস্থায় কোনো প্রকল্প অপ্রস্তুত থাকলে বা দেরি করলে যে বাড়তি অর্থ গুনতে হয়, তার ধাক্কা গিয়ে পড়ে অন্য জরুরি খাতের বরাদ্দে। সে কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নকে শুধু দপ্তরি কাজ ভাবলে চলে না। এর সঙ্গে সরকারি অর্থ ঠিকভাবে সামলানোর বিষয়টিও জড়িয়ে আছে।

অথচ অবকাঠামোতে বিনিয়োগের সুফল দেশ ইতিমধ্যে পেয়েছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, বন্দর ও নগর পরিবহন সম্প্রসারণে যোগাযোগ সহজ হয়েছে, উৎপাদন ও বাণিজ্য এগিয়েছে, বাজারে পৌঁছানোও সহজ হয়েছে। বড় ও জটিল প্রকল্প শেষ করার সামর্থ্যও বাংলাদেশ দেখিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও অবকাঠামো বিনিয়োগ লাগবে। প্রশ্ন হলো, সরকারি বিনিয়োগ কতটা দক্ষভাবে, যুক্তিসংগত খরচে ও সময়মতো কাজে রূপ নিচ্ছে।

যেসব জায়গায় জট পাকায়

শুরুর আগেই গলদ। প্রকল্প অনুমোদনের আগের ধাপ বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা। সম্ভাব্যতা যাচাই দুর্বল হলে, নকশা অসম্পূর্ণ থাকলে, জমি অধিগ্রহণ বাকি থাকলে কিংবা ইউটিলিটি সরানোর পরিকল্পনা ছাড়াই কাজ শুরু হলে পরে ধাক্কা খেতে হয়। তখন নকশা ও চুক্তি বদলাতে হয়, সময় বাড়াতে হয়, খরচও বাড়ে।

হাতে বেশি, সামর্থ্য কম। সীমিত সম্পদ নিয়ে অনেক প্রকল্প ধরলে টাকা টুকরো টুকরো হয়ে যায়। ফলে জরুরি প্রকল্পও দরকারমতো বরাদ্দ পায় না, কাজ লম্বা হয়, আর আধাখেঁচড়া প্রকল্পের বোঝা চেপে বসে পরের বাজেটে।

সব খরচ বাড়াই অব্যবস্থাপনা নয়। টাকার মান কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি এবং বিশ্ববাজারে যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়ার কারণেও ব্যয় ওপরে ওঠে। এই বাইরের কারণগুলোকে আলাদা করে দেখতে হবে ত্রুটিপূর্ণ নকশা, জমি অধিগ্রহণে দেরি, ক্রয়প্রক্রিয়ার সমস্যা বা সমন্বয়ের অভাবে বাড়া খরচ থেকে।

দক্ষ লোক ও সংস্থার সমন্বয়ের ঘাটতি। বড় প্রকল্প শুধু প্রকৌশলের বিষয় নয়। সেখানে সরকারি ক্রয়, অর্থ, চুক্তি, আইন, পরিবেশ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সামলাতে হয়। এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতা কম থাকলে কাজের গতি ও মান দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর কিংবা অনুমোদনের মতো কাজে এক সংস্থার দেরি গোটা প্রকল্পকে পিছিয়ে দিতে পারে।

ব্যবস্থা আছে, ঘাটতি প্রয়োগে

নতুন করে সব শুরু করার দরকার নেই। পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট রিফর্ম স্ট্র্যাটেজি ২০২৫-২০৩০-এ সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয়–সুবিধা বিশ্লেষণ, প্রকল্প প্রস্তুতি ও তদারকির দুর্বলতার পাশাপাশি ব্যয় ও মেয়াদ বেড়ে যাওয়ার সমস্যাও চিহ্নিত করা আছে। পরিকল্পনা কমিশনও সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির নির্দেশিকা বানিয়েছে।

ক্রয়ের ক্ষেত্রেও সংস্কার হয়েছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০২৫-এর আওতায় ই–জিপিসহ নানা ব্যবস্থা জোরদার হয়েছে, আর ডিজিটাল পদ্ধতির কল্যাণে স্বচ্ছতা ও নজরদারির সুযোগ বেড়েছে। কাজেই নিয়মের অভাবকে মূল সমস্যা বলা যায় না। আসল প্রশ্ন, প্রকল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এসব নিয়ম ও নির্দেশিকা কতটা নিয়মিত মানা হচ্ছে।

ঋণের হিসাব বদলাতে পারে উত্তরণের পর

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে এলে প্রকল্পের অর্থায়ন ও তার যথাযথ ব্যবহার আরও বেশি গুরুত্ব পাবে। তবে উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে স্বল্প সুদের সব উন্নয়ন ঋণ বন্ধ হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানের ঋণের শর্ত মাথাপিছু আয়, ঋণ শোধের সামর্থ্য এবং ঋণের টেকসই অবস্থাসহ নানা বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

তবু আয় ও অর্থায়নের অবস্থান বদলালে দেশকে ক্রমে কম রেয়াতি ও বাজারভিত্তিক অর্থায়নের ওপর বেশি ভর করতে হতে পারে। তাতে সুদ চড়া হতে পারে, শোধের শর্তও কঠিন হতে পারে। তাই কোন প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে, সেই বাছাইয়ের গুরুত্ব বাড়বে।

সমাধানের পথ: শুরু, চলার পথ ও জবাবদিহি

শুরুর আগে: সম্ভাব্যতা যাচাই, বিস্তারিত নকশা, জমির চাহিদা, পরিবেশগত দিক, অর্থায়ন ও ক্রয় পরিকল্পনা তৈরি না থাকলে বড় প্রকল্পে অনুমোদন দেওয়া ঠিক নয়। শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল এবং পরে রক্ষণাবেক্ষণে কত খরচ হবে, তাও হিসাবে ধরতে হবে।

চলার পথে: নতুন প্রকল্পের সংখ্যা সীমিত রেখে আগে চলমান গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো শেষ করা দরকার। অর্থ ছড়িয়ে না দিয়ে যেসব প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল বেশি, সেগুলোতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। কম গুরুত্বপূর্ণ, দুর্বলভাবে তৈরি কিংবা দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকা প্রকল্প নতুন করে যাচাই করা উচিত।

পাশাপাশি বড় প্রকল্পে অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালক এবং কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতাসম্পন্ন দল রাখতে হবে। পরিচালকসহ মূল কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বদলি এড়ানো জরুরি। ঠিকাদার ও পরামর্শকদের আগের কাজের মান, সময় মানার রেকর্ড এবং চুক্তি পালনের ইতিহাস সংরক্ষণ করে পরবর্তী কাজ দেওয়ার সময় তা দেখা দরকার।

সংস্থাগুলোর সমন্বয়ও আগেভাগে ঠিক করতে হবে। জমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি সরানো ও নানা অনুমোদনে কোন সংস্থার কী দায়িত্ব, কখন তা শেষ হবে, প্রকল্প শুরুর আগেই স্পষ্ট থাকা চাই। বড় প্রকল্পে সমন্বয়ের জট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কীভাবে খুলবে, তারও ব্যবস্থা রাখতে হবে।

ফলাফলের হিসাব: বড় প্রকল্পের মূল ও সংশোধিত ব্যয়, নির্ধারিত ও সংশোধিত শেষ হওয়ার সময় এবং বাস্তব ও আর্থিক অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত। ব্যয় বা সময় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লে কারণ খুঁজে বের করতে হবে। যে সমস্যা এড়ানো যেত, তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে পরবর্তী প্রকল্প পরিচালনা ও ঠিকাদার বাছাইয়ে।

নতুন আইনের চেয়ে বিদ্যমান নিয়মের প্রয়োগই আসল

প্রকল্প মূল্যায়ন, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, ক্রয় ও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণের অনেক কাঠামো দেশে আগেই আছে। এখন দরকার সেগুলো ধারাবাহিকভাবে কাজে লাগানো এবং প্রকল্পের ফলাফলের সঙ্গে জবাবদিহি জুড়ে দেওয়া।

অবকাঠামোতে আরও বিনিয়োগ লাগবেই। তবে এখন লক্ষ্য হওয়া উচিত বিনিয়োগ করা প্রতিটি টাকা আর ঋণ নেওয়া প্রতিটি ডলার থেকে সর্বোচ্চ উন্নয়ন সুফল ঘরে তোলা।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে এডিপি বাস্তবায়নের হার কত?

আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দুই মাসে আর্থিক বাস্তবায়নের হার ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আগের অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এই হার ছিল ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ।

২. খরচের হার দেখেই কি প্রকল্পের অগ্রগতি বোঝা যায়?

পুরোপুরি যায় না। এতে বাস্তব অগ্রগতি বা কাজের মান ধরা পড়ে না। তবে ধীরগতি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।

৩. প্রকল্পের ব্যয় বাড়লেই কি তা অব্যবস্থাপনার ফল?

না। টাকার অবমূল্যায়ন, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়লেও খরচ বাড়তে পারে। তবে এগুলোকে দুর্বল নকশা, জমি অধিগ্রহণে দেরি, ক্রয়প্রক্রিয়ার সমস্যা বা সমন্বয়হীনতার কারণে বাড়া ব্যয় থেকে আলাদা করে দেখা দরকার।

৪. এলডিসি উত্তরণের পর কি স্বল্প সুদের ঋণ পুরোপুরি বন্ধ হবে?

না। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানের ঋণের শর্ত মাথাপিছু আয়, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও ঋণের টেকসই অবস্থাসহ নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তবে ধীরে ধীরে কম রেয়াতি ও বাজারভিত্তিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।

৫. প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন সবচেয়ে বেশি কিসের ওপর জোর দেওয়া দরকার?

নতুন নিয়ম তৈরির চেয়ে বিদ্যমান নীতি ও নিয়মের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং প্রকল্পের ফলাফলের সঙ্গে জবাবদিহি যুক্ত করার ওপর।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ