ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার ৭টি কারণ, কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন?

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৭ ১৭:২৯:৫২
প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার ৭টি কারণ, কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন?

প্রস্রাব করার সময় জ্বালাপোড়া, ব্যথা কিংবা অস্বস্তি হলে এর পেছনে মূত্রনালির সংক্রমণ থেকে শুরু করে কিডনিতে পাথর, যৌনবাহিত সংক্রমণ ও পরিচ্ছন্নতার পণ্যের কারণে সৃষ্ট জ্বালাও থাকতে পারে। অনেকেই এ সমস্যাকে সাময়িক ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু বারবার প্রস্রাবের চাপ, তলপেটে ব্যথা, প্রস্রাবে রক্ত কিংবা জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসা নিতে দেরি করা উচিত নয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা জ্বালাপোড়াকে ডিসইউরিয়া (Dysuria) বলা হয়। নারী-পুরুষ উভয়েরই এই সমস্যা হতে পারে। তবে শুধু জ্বালাপোড়ার ধরন দেখে এর সঠিক কারণ নির্ধারণ করা যায় না। কারণ বুঝতে উপসর্গের পাশাপাশি চিকিৎসকের মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।

প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়ার সাধারণ কারণ

১. মূত্রনালির সংক্রমণ

প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার অন্যতম পরিচিত কারণ হলো মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI)। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া মূত্রনালিতে প্রবেশ করে বংশবৃদ্ধি করলে এই সংক্রমণ হয়। মূত্রথলিতে সংক্রমণ হলে প্রস্রাবের সময় জ্বালা, ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ এবং তলপেটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

এ ছাড়া প্রস্রাব ঘোলা হওয়া, দুর্গন্ধ বা প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়ার মতো লক্ষণও থাকতে পারে। সংক্রমণ কিডনি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে জ্বর, কাঁপুনি, পিঠের পাশ বা কোমরে ব্যথা এবং বমি বমি ভাব হতে পারে। এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

২. শরীরে পানির ঘাটতি

পর্যাপ্ত পানি পান না করলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যেতে পারে এবং প্রস্রাব গাঢ় রঙের হতে পারে। কখনো ঘন প্রস্রাবের কারণে অস্বস্তিও অনুভূত হয়। তবে শুধু প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হচ্ছে বলে পানিশূন্যতাকেই কারণ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

পানি কম পান করার পাশাপাশি প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া বা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে শরীরে পানির ঘাটতির বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। পর্যাপ্ত তরল পান করা সহায়ক হতে পারে, তবে সংক্রমণ থাকলে শুধু পানি পান করে তার চিকিৎসা হয় না।

৩. যৌনবাহিত সংক্রমণ

কিছু যৌনবাহিত সংক্রমণ, যেমন গনোরিয়া ও ক্ল্যামাইডিয়া, প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রস্রাবের সময় ব্যথা, যৌনাঙ্গ থেকে অস্বাভাবিক তরল বা স্রাব বের হওয়া এবং যৌনাঙ্গে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। কারও কারও আবার স্পষ্ট কোনো লক্ষণও থাকে না।

এ ধরনের উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত। সংক্রমণের কারণ শনাক্ত না করে নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে সঠিক চিকিৎসা ব্যাহত হতে পারে।

৪. সাবান বা পরিচ্ছন্নতার পণ্যে জ্বালা

যৌনাঙ্গের আশপাশে সুগন্ধিযুক্ত সাবান, স্প্রে, লোশন বা অন্য কোনো রাসায়নিক পণ্য ব্যবহারের কারণে ত্বকে জ্বালা ও প্রদাহ হতে পারে। প্রস্রাব ওই সংবেদনশীল স্থানে লাগলে জ্বালাপোড়া আরও বেশি অনুভূত হতে পারে।

নতুন কোনো পণ্য ব্যবহারের পর সমস্যা শুরু হলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করে দেখুন। তবে জ্বালাপোড়া না কমলে কিংবা সঙ্গে অন্য উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৫. কিডনি বা মূত্রথলিতে পাথর

কিডনি কিংবা মূত্রথলিতে পাথর হলে প্রস্রাবের সময় অস্বস্তি হতে পারে। পাথরের অবস্থান ও আকার অনুযায়ী কোমর, পিঠের পাশ, তলপেট বা কুঁচকিতে ব্যথা দেখা দিতে পারে। কখনো প্রস্রাবে রক্তও পাওয়া যায়।

বিশেষ করে তীব্র ব্যথা, বমি, জ্বর বা প্রস্রাবের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। শুধু জ্বালাপোড়ার ভিত্তিতে পাথর হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

৬. প্রোস্টেটের প্রদাহ বা সংক্রমণ

পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রোস্টেট গ্রন্থিতে প্রদাহ বা সংক্রমণ—যাকে প্রোস্টাটাইটিস বলা হয়—প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়ার কারণ হতে পারে। এর সঙ্গে ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ, প্রস্রাব শুরু করতে অসুবিধা, তলপেট বা শ্রোণিতে ব্যথা এবং কখনো জ্বর দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে প্রস্রাব আটকে গেলে, জ্বরের সঙ্গে ব্যথা হলে কিংবা শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

৭. নারীদের যোনিপথের সংক্রমণ বা হরমোনজনিত পরিবর্তন

নারীদের ক্ষেত্রে যোনিপথ বা বাইরের যৌনাঙ্গে প্রদাহ ও সংক্রমণের কারণেও প্রস্রাবের সময় জ্বালা হতে পারে। ছত্রাকজনিত সংক্রমণ, যোনিপথের প্রদাহ কিংবা মেনোপজের পর হরমোনের পরিবর্তনে টিস্যু শুষ্ক ও সংবেদনশীল হয়ে পড়লে এমন অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

যোনিপথে চুলকানি, অস্বাভাবিক স্রাব, শুষ্কতা বা যৌনমিলনের সময় ব্যথা থাকলে চিকিৎসককে বিষয়গুলো জানানো জরুরি। কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা ভিন্ন হতে পারে।

প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার সঙ্গে যেসব লক্ষণ থাকলে সতর্ক হবেন

প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া সামান্য মনে হলেও কিছু উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। যেমন—

জ্বর, কাঁপুনি বা শরীর খুব খারাপ লাগা।

কোমর বা পিঠের এক পাশে ব্যথা।

প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়া।

বমি হওয়া বা বমি বমি ভাবের সঙ্গে তীব্র ব্যথা।

প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া বা করতে না পারা।

যৌনাঙ্গ থেকে অস্বাভাবিক স্রাব বের হওয়া।

উপসর্গ দ্রুত বেড়ে যাওয়া বা বারবার ফিরে আসা।

গর্ভাবস্থায় প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া হলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। পুরুষ, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিদেরও এ সমস্যা অবহেলা না করে চিকিৎসা নেওয়া ভালো।

প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হলে কী করবেন?

প্রথমে পর্যাপ্ত পানি পান করুন, যদি চিকিৎসকের পক্ষ থেকে তরল গ্রহণে কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকে। প্রস্রাবের বেগ দীর্ঘ সময় আটকে রাখবেন না। যৌনাঙ্গের আশপাশে সুগন্ধিযুক্ত বা জ্বালা তৈরি করতে পারে এমন পণ্য ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।

তবে জ্বালাপোড়া থাকলে শুধু পানি পান বা ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর করবেন না। উপসর্গ স্থায়ী হলে, বাড়তে থাকলে বা সঙ্গে অন্য লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্রাব পরীক্ষা, কালচার কিংবা অন্য পরীক্ষা করা হতে পারে।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না। সব ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ দায়ী নয়। আবার সংক্রমণ থাকলেও কোন ওষুধ প্রয়োজন, তা রোগের ধরন ও পরীক্ষার ফল অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হয়।

প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া প্রতিরোধে কী খেয়াল রাখবেন?

প্রতিদিন প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করুন এবং প্রস্রাবের বেগ হলে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করবেন না। যৌনাঙ্গের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন, তবে অতিরিক্ত সুগন্ধিযুক্ত সাবান বা স্প্রে ব্যবহার না করাই ভালো। নারীদের ক্ষেত্রে টয়লেট ব্যবহারের পর সামনে থেকে পেছনের দিকে পরিষ্কার করা মূত্রনালিতে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

বারবার মূত্রনালির সংক্রমণ হলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কারণ ও প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলোচনা করুন।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম নয়; এটি বিভিন্ন সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তাই সমস্যাটি দীর্ঘস্থায়ী হলে বা সতর্কসংকেত দেখা দিলে কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: প্রস্রাবের সময় জ্বালা করে কেন?

উত্তর: মূত্রনালির সংক্রমণ, যৌনবাহিত সংক্রমণ, কিডনি বা মূত্রথলিতে পাথর, প্রোস্টেটের প্রদাহ কিংবা পরিচ্ছন্নতার পণ্যে জ্বালার কারণে প্রস্রাবের সময় অস্বস্তি হতে পারে। সঠিক কারণ জানতে প্রয়োজনে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

প্রশ্ন ২: পানি বেশি পান করলে কি প্রস্রাবের জ্বালা কমে?

উত্তর: শরীরে পানির ঘাটতি থাকলে পর্যাপ্ত পানি পান উপকারী হতে পারে। তবে সংক্রমণ বা অন্য কোনো রোগের কারণে জ্বালাপোড়া হলে শুধু পানি পান যথেষ্ট নয়।

প্রশ্ন ৩: প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হলে কি অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে?

উত্তর: সব ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না। কারণ শনাক্ত করে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ নির্ধারণ করবেন। নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া উচিত নয়।

প্রশ্ন ৪: প্রস্রাবে জ্বালাপোড়ার সঙ্গে জ্বর হলে কী করবেন?

উত্তর: জ্বরের সঙ্গে কাঁপুনি, কোমর বা পিঠের পাশে ব্যথা কিংবা বমি থাকলে কিডনির সংক্রমণসহ গুরুতর সমস্যার আশঙ্কা থাকতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা নিন।

প্রশ্ন ৫: কত দিন প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া থাকলে চিকিৎসক দেখাবেন?

উত্তর: জ্বালাপোড়া স্থায়ী হলে, এক দিনের বেশি থাকলে, বারবার ফিরে এলে বা অন্য উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। গর্ভাবস্থা, জ্বর, প্রস্রাবে রক্ত বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অপেক্ষা করবেন না।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: