Md Razib Ali
Senior Reporter
বাংলাদেশের পোশাক খাতে আসছে বড় পরিবর্তন
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামোকে ঘিরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতে শুরুতে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হলেও বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনও শুল্ক নয়। বরং আগে থেকেই কার্যকর থাকা ১০ শতাংশ শুল্ককে নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় স্থায়ী রূপ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ব্যবস্থা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যনীতির ধারাবাহিকতা। আগে সাময়িকভাবে কার্যকর থাকা ১০ শতাংশ বেজলাইন শুল্ক এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইন ধারা ৩০১-এর আওতায় স্থায়ী কাঠামো পেয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে এই শুল্ক পরিবর্তন বা আইনি চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে বাতিল করা আগের তুলনায় কঠিন হতে পারে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘পারস্পরিক শুল্ক’ বাতিল করে দেয়। এরপর একই মাত্রার শুল্ক বহাল রাখার জন্য বিকল্প আইনি পথ খুঁজতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন।
অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে প্রেসিডেন্টের ধারা ১২২-এর ক্ষমতা ব্যবহার করে সব দেশের জন্য ১০ শতাংশের একটি অস্থায়ী সর্বজনীন শুল্ক আরোপ করা হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, এই শুল্ক সর্বোচ্চ ১৫০ দিন পর্যন্ত কার্যকর রাখা সম্ভব ছিল।
এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দফতর ধারা ৩০১-এর অধীনে জোরপূর্বক শ্রমসংক্রান্ত তদন্ত এগিয়ে নেয়। তদন্ত, জনমত গ্রহণ এবং চূড়ান্ত বিধিমালা তৈরির প্রক্রিয়া এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে ধারা ১২২-এর অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধারা ৩০১-এর নতুন শুল্ক কার্যকর করা যায়।
ফলে কোনও ধরনের শুল্ক-শূন্যতা ছাড়াই আগের ১০ শতাংশ শুল্ক নতুন আইনি ভিত্তিতে বহাল থাকে।২৪ জুলাই কার্যকর হওয়া নতুন শুল্ক কাঠামোয় ইউএসটিআর মোট ৬০টি অর্থনীতিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
এর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে ১৭টি অর্থনীতির সেই গ্রুপে, যাদের জন্য শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ। অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডসহ আরও ৩৪টি অর্থনীতির জন্য শুল্কহার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বর্তমান কাঠামোয় বাংলাদেশের রফতানিপণ্য প্রধান কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ কম শুল্কের সুবিধা পাচ্ছে।বাংলাদেশের ১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় থাকার অন্যতম কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্বে নেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) আওতায় বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে অঙ্গীকার করে।
এই অঙ্গীকারের কারণেই বাংলাদেশ শুরু থেকেই ১০ শতাংশ শুল্ক গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।অন্যদিকে কম্বোডিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো প্রথমে উচ্চ শুল্কের তালিকায় থাকলেও জুনে প্রস্তাবিত বিধিমালা এবং জুলাইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মধ্যবর্তী সময়ে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা গ্রহণ করায় পরে তারা নিম্ন শুল্ক স্তরে যাওয়ার সুযোগ পায়।
নতুন কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ট্যারিফ রেট কোটা (টিআরকিউ) ব্যবস্থা।
ইউএসটিআরকে সুযোগ তৈরি হলে তিন বছর মেয়াদি দুটি টিআরকিউ চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর একটি হবে সাধারণ টেক্সটাইল আমদানির জন্য এবং অন্যটি বিশেষভাবে মার্কিন তুলাভিত্তিক টেক্সটাইলের জন্য।
এই ব্যবস্থা চালু হলে নির্ধারিত একটি সীমা পর্যন্ত বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও পোশাকপণ্য শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সম্ভাব্য এই সুবিধার জন্য মাত্র চারটি দেশকে যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে—বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম, চীন ও ভারত এই সম্ভাব্য সুবিধার বাইরে রয়েছে।
তবে টিআরকিউ এখনও কার্যকর হয়নি। কবে থেকে এটি চালু হবে, সে বিষয়ে ইউএসটিআর কোনও সময়সূচিও ঘোষণা করেনি। ফলে বর্তমানে সব পণ্যের ক্ষেত্রেই ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে।
নতুন শুল্ক কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনও নেতিবাচক অবস্থানে নেই। বরং ভিয়েতনাম, চীন ও থাইল্যান্ডের তুলনায় শুল্কের দিক থেকে কিছুটা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়েছে।
ভবিষ্যতে টিআরকিউ চালু হলে বাংলাদেশ আরও একটি সম্ভাব্য সুবিধা পেতে পারে। তবে এই সুযোগ কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শুল্ক কম থাকলেই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্বের পোশাকবাজারে প্রতিযোগিতা এখন আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় বেশি। ক্রেতারা শুধু কম দামের পণ্য নয়, বরং দ্রুত সরবরাহ, উন্নত মান, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রমমান, উদ্ভাবন এবং পণ্যের বৈচিত্র্যকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন শুল্ক কাঠামো একটি সম্ভাবনার দরজা খুলে দিলেও সেই সুযোগ বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে শিল্প খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে।
বিশেষজ্ঞের মত
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নতুন মার্কিন শুল্ক কাঠামোকে তিনি ‘পুরোনো মোড়কে নতুন মিষ্টি’ হিসেবে দেখছেন।
তার ভাষায়, গত কয়েক মাস ধরেই বাংলাদেশি পণ্যের ওপর কার্যত ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর ছিল। এবার যুক্তরাষ্ট্র মূলত সেই শুল্ককেই নতুন আইনি কাঠামোর আওতায় স্থায়ী রূপ দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত কোনও শুল্কের বোঝা তৈরি হয়নি কিংবা বাস্তব শুল্ক পরিস্থিতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি।
তিনি বলেন, আগে যে ১০ শতাংশ বেজলাইন শুল্ক কার্যকর ছিল, সেটিই এখন ধারা ৩০১-এর আওতায় স্থায়ী আইনি ভিত্তি পেয়েছে। ফলে এটি ভবিষ্যতে পরিবর্তন বা চ্যালেঞ্জ করা আগের তুলনায় আরও কঠিন হতে পারে।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, চীন ও থাইল্যান্ডের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শুল্কহার ১০ শতাংশ হওয়ায় প্রতিযোগিতার দিক থেকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে দেশটি।
মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তুলা ও কিছু কাঁচামালভিত্তিক পণ্যের জন্য ট্যারিফ রেট কোটা (টিআরকিউ) চালুর পরিকল্পনা করছে। সেখানে বাংলাদেশ সম্ভাব্য সুবিধাভোগী দেশগুলোর তালিকায় থাকলেও ভারত ও ভিয়েতনাম নেই। যদিও এই সুবিধা এখনও কার্যকর হয়নি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও হয়নি, তবু এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য নতুন রফতানি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে তার মতে, শুধু শুল্কের তুলনামূলক সুবিধা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করা সম্ভব হবে না। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য আনা এবং উচ্চমূল্যের ও মূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে বাজারের চাহিদা, ক্রেতাদের পরিবর্তিত রুচি এবং নতুন ভোক্তা প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে আরও কার্যকর বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
রুবেলের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন শুধু দামের ওপর নির্ভর করছে না। পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ, উদ্ভাবন, টেকসই উৎপাদন এবং কমপ্লায়েন্সও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশ বিদ্যমান শুল্ক সুবিধাকে দীর্ঘমেয়াদে রফতানি বৃদ্ধির সুযোগে পরিণত করতে পারবে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নতুন শুল্ক কাঠামোর প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব ভোক্তাদের ক্রয় আচরণ, পণ্যের চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সোর্সিং কৌশলেও পড়তে পারে। তাই বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামোকে কেবল স্বল্পমেয়াদি সুবিধা হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটিকে দীর্ঘমেয়াদি বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে।
সেজন্য উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানো, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং নতুন উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, বন্দর ও লজিস্টিকস উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রম ও পরিবেশগত মান আরও শক্তিশালী করতে পারলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্তমান সুবিধাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে ২৪ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ধারা ৩০১ শুল্ক কাঠামো বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক কোনও বড় ধাক্কা নয়। বরং এটি আগের শুল্ক ব্যবস্থারই একটি স্থায়ী আইনি রূপ, যেখানে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে অনুকূল অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তবে এই সুবিধাকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতামূলক শক্তিতে রূপ দিতে হলে কেবল কম শুল্কের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। উৎপাদন দক্ষতা, মূল্য সংযোজন, উদ্ভাবন এবং বাজার বৈচিত্র্য—এই চার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারলেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নতুন সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যে পরিণত করতে পারবে।
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- সাহাবুদ্দিনের পর বঙ্গভবনে কে, আলোচনায় যে ৬ নাম
- পদত্যাগের পরে যেসব সুবিধা পাবেন মো. সাহাবুদ্দিন
- বিশ্বকাপ ফাইনাল পুনরায় চেয়ে পিটিশন, যা বললেন তাপিয়া
- ইনজুরিতে ছিটকে গিয়ে বিয়ে সারলেন নাহিদ রানা
- ম্যানইউর ১৫ বছরের বিস্ময়বালক গ্যাব্রিয়েলকে নিয়ে বড় ইঙ্গিত এমবেউমোর
- বালেবাকে নিয়ে ম্যানইউর সাথে ফের যোগাযোগ, দাবি রোমানোর
- স্পিকার জানালো রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবে কে
- আজকের মুদ্রা বিনিময় হার: এক নজরে সব দেশের রেট
- রাষ্ট্রপতির শেষ চিঠিতে উঠে এলো যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
- ৫ স্বাস্থ্য সমস্যার কথা উল্লেখ রাষ্ট্রপতি
- বঙ্গভবন ছাড়ছেন চুপ্পু, নতুন যাত্রার সময় জানা গেল
- আন্দোলনের মাঝেই মোদির মন্ত্রীর পদত্যাগ