ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

এআইয়ের কারণে বাংলাদেশে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে যেসব চাকরিজীবী

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৯ ১৪:৪৫:১৩
এআইয়ের কারণে বাংলাদেশে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে যেসব চাকরিজীবী

একজন অফিস সহকারী যে কাজ শেষ করতে ৮ ঘণ্টা সময় নেন, একই ধরনের কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ১ ঘণ্টারও কম সময়ে করতে পারে। এমন পরিবর্তন শুধু অফিসের কাজেই সীমাবদ্ধ নেই; ডাটা এন্ট্রি, ক্যাশিয়ার, টিকিট বিক্রি, ব্যাংকের কাউন্টার, প্রশাসনিক সহায়তা থেকে শুরু করে গণমাধ্যম ও সফটওয়্যার তৈরির কাজেও প্রযুক্তির প্রভাব বাড়ছে। বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রেও অটোমেশন ও এআইভিত্তিক সফটওয়্যারের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ায় কম দক্ষতাভিত্তিক চাকরিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রশ্ন।

তবে প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রার অর্থ সব চাকরি একসঙ্গে হারিয়ে যাওয়া নয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় বরং উঠে এসেছে—কিছু কাজ মানুষের বদলে যন্ত্র করবে, আবার কিছু পেশায় মানুষের দায়িত্ব ও কাজের ধরন পাল্টে যাবে।

২০৩০ সালের মধ্যে ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি হারানোর আশঙ্কা

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম বা ডব্লিউইএফের সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও অটোমেশনের প্রভাবের একটি বড় চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে।

একই সময় নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি হবে। তবে ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এমন কাজ, যেগুলো প্রতিদিন একই পদ্ধতিতে বারবার করতে হয়।

এই পরিবর্তনের পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটালাইজেশন এবং রোবোটিক অটোমেশনের দ্রুত বিস্তার বড় ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা রয়েছে

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রায় ৭ শতাংশ চাকরি সরাসরি এআইয়ের কারণে ঝুঁকিতে রয়েছে।

অন্যদিকে প্রায় ১৫ শতাংশ চাকরিতে প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

অর্থাৎ একই প্রযুক্তি শ্রমবাজারে দুই ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—কিছু কাজের ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজন কমতে পারে, আবার কিছু কাজে মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

কাদের চাকরিতে চাপ বাড়তে পারে

ডব্লিউইএফের তথ্য অনুযায়ী, রুটিন কাজনির্ভর বেশ কয়েকটি পেশা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ক্যাশিয়ার, বাস, ট্রেন ও বিমানসহ বিভিন্ন টিকিট বিক্রেতা, ডাটা এন্ট্রি কর্মী, প্রশাসনিক সহকারী, নির্বাহী সচিব, ব্যাংক কাউন্টার কর্মকর্তা এবং ডাক বিভাগের কর্মকর্তাদের মতো কাজের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির প্রভাব বাড়ছে।

এসব কাজের একটি বড় অংশ ডিজিটাল সিস্টেম ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে কর্মীর ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

পরিবহন খাতেও একই ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। বাস, ট্রেনসহ বেশিরভাগ যানবাহন কোনো চালক ছাড়াই চলাচল করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশ এখনো এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়নি।

কেরানি ও অফিস সহকারীদের সামনে বড় পরিবর্তন

অফিসের নিয়মিত প্রশাসনিক কাজগুলোর ওপর এআইয়ের প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, নথি ব্যবস্থাপনা এবং নির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে কাজ করার মতো দায়িত্ব এআই সহজে সম্পন্ন করতে পারে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে এখনো এসব কাজ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কর্মীরাই করেন। কিন্তু একজন অফিস সহকারী ৮ ঘণ্টায় যে কাজ করেন, এআই সেটি ১ ঘণ্টার কম সময়ে করতে সক্ষম। ফলে দ্রুত এসব চাকরির প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আর্কাইভ-এ প্রকাশিত ‘দ্য ফিউচার অব অফিস অ্যান্ড এডমিনিস্ট্রেটিভ সাপোর্ট অকুপেশনস ইন দ্য এরা অফ এআই’ শীর্ষক গবেষণাতেও অফিস সহকারী পেশার ওপর এআইয়ের প্রভাবের কথা বলা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ অফিস সহকারী চাকরি কমে যেতে পারে।

বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ইতোমধ্যে ডকুমেন্টেশন, সময়সূচি তৈরি, প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং গ্রাহক পরিচালনার মতো কাজে এআইভিত্তিক সফটওয়্যার ব্যবহার শুরু করেছে বলেও ওই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সংবাদ তৈরির কাজেও বদল আসছে

এআইয়ের ব্যবহার গণমাধ্যমের কাজের ধরনও পাল্টাচ্ছে। দ্রুত সংবাদ সারাংশ তৈরি, অনুবাদ এবং তথ্য বিশ্লেষণের মতো কাজে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে।

এর ফলে শুধু প্রেস বিজ্ঞপ্তিনির্ভর সংবাদ তৈরি, সাধারণ অনুবাদ কিংবা রুটিন কনটেন্ট তৈরির দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ওপর চাপ বাড়তে পারে।

তবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, মাঠপর্যায়ের রিপোর্টিং এবং তথ্য যাচাইয়ের মতো দক্ষতার প্রয়োজন হয় এমন কাজে চাহিদা বরং বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

সব চাকরি হারানোর কথা বলছে না ম্যাককিনজি

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনজি অ্যান্ড কোম্পানির ‘জেনারেটিভ এআই অ্যান্ড দ্য ফিউচার অফ ওয়ার্ক ইন আমেরিকা’ গবেষণাতেও অফিসের কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে একই ধরনের পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে।

গবেষণায় গ্রাহক পরিষেবা, অ্যাকাউন্টিং সহায়তা, বেতন প্রক্রিয়াকরণ, ডাটা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সহায়তাকে দ্রুত অটোমেটেড হওয়ার সম্ভাবনাময় কাজ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে গবেষণাটি বলছে, প্রতিটি চাকরি মানুষের হাতছাড়া হবে এমন নয়। বরং অনেক পেশায় দায়িত্বের ধরন বদলাবে।

যেখানে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা জটিল বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে মানুষের ভূমিকা বজায় থাকবে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ব্যবস্থাপনা ও সৃজনশীল খাতের কথাও এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রযুক্তিখাতও পুরোপুরি নিরাপদ নয়

এআইয়ের প্রভাব এবার এমন একটি খাতেও দেখা যাচ্ছে, যেটিকে দীর্ঘদিন নিরাপদ বলে বিবেচনা করা হয়েছে। ‘এআই ইমপ্যাক্ট অন লেবার ফোর্স অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়রস’ শীর্ষক গবেষণায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের কাজের পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

এআই-সহায়ক কোডিং টুল এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সফটওয়্যার তৈরির প্রযুক্তি এই পেশার কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে।

গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু কোড লেখার দক্ষতা যথেষ্ট হবে না। জটিল সমস্যা সমাধান, সিস্টেম ডিজাইন, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা এবং মানবিক দক্ষতার গুরুত্ব বাড়বে।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই বাড়ছে ব্যবহার

বাংলাদেশের ব্যাংকিং, কলসেন্টার, গার্মেন্টস ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যম এবং সরকারি অফিসে ধীরে ধীরে অটোমেশন ও এআইভিত্তিক সফটওয়্যারের ব্যবহার বাড়ছে।

এ কারণে কম দক্ষতাভিত্তিক অফিসের চাকরিগুলো ভবিষ্যতে বেশি চাপে পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে দক্ষতা উন্নয়নের দিকে জোর দেওয়া প্রয়োজন।

কারণ প্রযুক্তির ইতিহাসে প্রতিটি বড় পরিবর্তনের সময় কিছু কাজ কমেছে, আবার নতুন ধরনের কাজের সুযোগও তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানুষ কত দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ