ঢাকা, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

Md Razib Ali

Senior Reporter

প্রতিদিন এলাচ খেলে মিলতে পারে যেসব উপকার, জানুন

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২১ ১২:৩১:৩৯
প্রতিদিন এলাচ খেলে মিলতে পারে যেসব উপকার, জানুন

রান্নায় সুগন্ধ ও স্বাদ বাড়াতে এলাচের ব্যবহার বহুদিনের। চা, পায়েস, পোলাও কিংবা বিভিন্ন মিষ্টান্ন—প্রায় সব ধরনের রান্নাঘরেই মেলে এই মসলা। তবে শুধু খাবারের স্বাদ-গন্ধের জন্যই নয়, এলাচে থাকা কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগ শরীরের জন্যও সম্ভাব্য উপকারী হতে পারে।

বিশেষ করে ছোট এলাচ বা সবুজ এলাচ নিয়ে মানুষের ওপর পরিচালিত কয়েকটি গবেষণায় রক্তচাপ, প্রদাহ ও কিছু বিপাকীয় সূচকের ওপর ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এলাচকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা ওষুধের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষণাগুলোর অনেকগুলোতেই তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক মানুষ অংশ নিয়েছেন এবং ফলাফলও সব ক্ষেত্রে এক নয়।

এলাচে কী আছে?

এলাচের বীজ ও ফলের মধ্যে বিভিন্ন সুগন্ধি ও উদ্ভিজ্জ যৌগ থাকে। গবেষণায় এলাচের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহ-সম্পর্কিত কার্যকারিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব যৌগের কারণেই মসলাটি নিয়ে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

তবে কোনো মসলায় উপকারী যৌগ থাকা মানেই সেটি বেশি পরিমাণে খেলে বেশি স্বাস্থ্য উপকার হবে—এমনটা বলা যায় না। খাবার হিসেবে স্বাভাবিক পরিমাণে ব্যবহার এবং উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট বা নির্যাস গ্রহণ—দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে

এলাচ নিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মানব-গবেষণার একটি হলো উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ওপর পরিচালিত গবেষণা। সেখানে স্টেজ-১ হাইপারটেনশনে আক্রান্ত ২০ জনকে ১২ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ৩ গ্রাম এলাচের গুঁড়া দেওয়া হয়েছিল। গবেষণায় সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ কমার পাশাপাশি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট স্ট্যাটাস বৃদ্ধির কথা পাওয়া যায়।

তবে সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা এবং প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৮০ নারীর ওপর পরিচালিত একটি র‍্যান্ডমাইজড গবেষণায় দুই মাস প্রতিদিন ৩ গ্রাম এলাচ দেওয়ার পর প্লাসিবোর তুলনায় রক্তচাপে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।

আরও বড় পরিসরে করা একটি সিস্টেম্যাটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসে আটটি ক্লিনিক্যাল স্টাডি বিশ্লেষণ করে এলাচ গ্রহণের সঙ্গে সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ এবং কয়েকটি প্রদাহজনিত সূচক কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরা একই সঙ্গে সীমিত সংখ্যক গবেষণার কারণে ফলাফল ব্যাখ্যায় সতর্ক থাকার কথা বলেছেন।

অর্থাৎ, এলাচ রক্তচাপের জন্য সহায়ক হতে পারে—এমন বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত আছে; কিন্তু উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের পরিবর্তে এলাচ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার মতো প্রমাণ নেই।

শরীরের প্রদাহ কমাতে সম্ভাব্য ভূমিকা

দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমাত্রার প্রদাহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এলাচের ওপর পরিচালিত গবেষণায় এর কিছু প্রদাহ-সম্পর্কিত সূচক কমানোর সম্ভাবনা দেখা গেছে।

২০২৩ সালের একটি সিস্টেম্যাটিক রিভিউ ও মেটা-অ্যানালাইসিসে প্রাপ্ত গবেষণাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এলাচ গ্রহণের সঙ্গে hs-CRP, IL-6 ও TNF-α-এর মতো কয়েকটি প্রদাহজনিত সূচকের পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে গবেষণার সংখ্যা সীমিত হওয়ায় এ ফলকে চূড়ান্ত চিকিৎসা-প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উৎস হিসেবে এলাচ

শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের সঙ্গে লড়াইয়ে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এলাচে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে।

একটি মানব-গবেষণায় ১২ সপ্তাহ এলাচ গ্রহণের পর অংশগ্রহণকারীদের মোট অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট স্ট্যাটাস উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। তবে এটি ছিল নির্দিষ্ট একটি গবেষণার ফল; তাই শুধু এলাচ খেলেই শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা একইভাবে বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

হজমের জন্য এলাচ কতটা উপকারী?

এলাচ দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহ্যগতভাবে হজমের সমস্যা, পেটের অস্বস্তি ও বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গবেষণাতেও এলাচের সম্ভাব্য গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল প্রভাব নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

তবে বদহজম, গ্যাস বা পেটের কোনো রোগ সারানোর জন্য এলাচকে চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহারের পক্ষে শক্তিশালী মানব-প্রমাণ এখনও সীমিত। তাই পেটের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা থাকলে শুধু এলাচের ওপর নির্ভর না করে কারণটি শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।

মুখের দুর্গন্ধ কমাতে কি কাজে লাগে?

এলাচের সুগন্ধের কারণে অনেকেই খাবারের পর এটি চিবিয়ে থাকেন। এর পাশাপাশি এলাচের কিছু যৌগের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণাও হয়েছে।

ল্যাবরেটরি গবেষণায় এলাচের নির্যাস মুখের বিভিন্ন রোগসৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকারিতা দেখিয়েছে। তবে এসব গবেষণা মূলত নির্যাস বা নির্দিষ্ট ঘনত্বের উপাদান নিয়ে; রান্নাঘরের সাধারণ এলাচ চিবিয়ে একই মাত্রার ফল পাওয়া যাবে—এমন প্রমাণ নেই।

অর্থাৎ মুখের দুর্গন্ধে এলাচ সাময়িকভাবে সতেজ অনুভূতি দিতে পারে, কিন্তু এটি ব্রাশ, জিহ্বা পরিষ্কার বা প্রয়োজনীয় দাঁতের চিকিৎসার বিকল্প নয়।

রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের ক্ষেত্রে কী জানা গেছে?

এলাচের বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ছয়টি গবেষণায় মোট ৪১০ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে প্রতিদিন প্রায় ৩ গ্রাম এলাচ ৮ সপ্তাহ থেকে ৩ মাস ব্যবহার করার ফল বিশ্লেষণ করা হয়।

সেখানে শরীরের ওজন, BMI, কোমরের পরিধি ও ফাস্টিং ব্লাড গ্লুকোজে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পাওয়া যায়নি। তবে HbA1c ও insulin resistance-এর একটি সূচক HOMA-IR-এ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় এলাচ গ্রহণের পর মোট কোলেস্টেরল ও LDL-এর কিছু পরিবর্তন দেখা গেলেও গবেষকেরা প্লাসিবোর তুলনায় সব বিপাকীয় সূচকে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাননি।

তাই ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ হিসেবে এলাচ ব্যবহার করার কোনো ভিত্তি নেই।

প্রতিদিন কতটি এলাচ খাওয়া উচিত?

এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া দরকার। গবেষণায় যেখানে এলাচের নির্দিষ্ট মাত্রা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি সাধারণ রান্নাঘরের মসলা হিসেবে প্রতিদিন কতটি এলাচ চিবিয়ে খেতে হবে—তার সরাসরি নির্দেশনা নয়।

সাধারণ খাবারে মসলা হিসেবে স্বাভাবিক পরিমাণে এলাচ ব্যবহার করা বেশিরভাগ মানুষের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু গবেষণায় ব্যবহৃত ৩ গ্রাম এলাচকে সরাসরি ‘প্রতিদিন এতটি এলাচ’ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

বিশেষ করে এলাচের ক্যাপসুল, ঘন নির্যাস বা এসেনশিয়াল অয়েলকে সাধারণ মসলা হিসেবে দেখা যাবে না। এসব পণ্যে সক্রিয় উপাদানের ঘনত্ব অনেক বেশি হতে পারে।

কারা এলাচ খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন?

স্বাভাবিক খাদ্যপরিমাণে এলাচ সাধারণত নিরাপদ হলেও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

বিশেষ করে যাদের পিত্তথলিতে পাথর রয়েছে, তাদের এলাচকে কোনো ধরনের চিকিৎসামূলক বা বেশি মাত্রায় ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি হারবাল মেডিসিন মনোগ্রাফেও পিত্তথলির পাথর থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সতর্কতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া এলাচে অ্যালার্জি থাকলে তা এড়িয়ে চলতে হবে। বেশি মাত্রায় বা ঘন নির্যাস ব্যবহারের আগে বিশেষ করে গর্ভাবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ বা নিয়মিত ওষুধ সেবনের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

তাহলে প্রতিদিন এলাচ খাওয়া কি ভালো?

এলাচকে প্রতিদিনের খাবারের অংশ হিসেবে স্বাভাবিক পরিমাণে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর সুগন্ধ ও স্বাদের পাশাপাশি এতে থাকা উদ্ভিজ্জ যৌগ শরীরে কিছু সম্ভাব্য উপকার করতে পারে। রক্তচাপ ও প্রদাহের ক্ষেত্রে মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে।

কিন্তু ‘প্রতিদিন এলাচ খেলেই সব রোগ দূর হবে’—এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়। সবচেয়ে ভালো উপায় হলো এলাচকে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে রাখা, আর কোনো রোগ থাকলে চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত ওষুধ ও চিকিৎসকের পরামর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ করা।

সংক্ষেপে এলাচের সম্ভাব্য উপকার

রক্তচাপের ওপর সামান্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে

কিছু প্রদাহজনিত সূচক কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতার সম্ভাবনা রয়েছে

মুখের সতেজতা ও দুর্গন্ধ কমাতে সহায়ক হতে পারে

বিপাকীয় স্বাস্থ্যের কিছু সূচকে সম্ভাব্য প্রভাব দেখা গেছে

তবে এসব উপকারের সবগুলোর পক্ষে সমান শক্তিশালী মানব-প্রমাণ নেই

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

এলাচ কোনো রোগের চিকিৎসা নয় এবং চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের বিকল্পও নয়। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে শুধুমাত্র এলাচ খেয়ে চিকিৎসা বন্ধ করা উচিত নয়। গবেষণায় উপকারের ইঙ্গিত থাকলেও মানুষের ওপর প্রমাণ এখনও সীমিত ও কিছু ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ