ঢাকা, বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫ আশ্বিন ১৪৩৩

রাতে দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস বদলাতে কাজে লাগবে যে নিয়মগুলো

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ৩০ ১৮:৩৩:৫৭
রাতে দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস বদলাতে কাজে লাগবে যে নিয়মগুলো

রাতে বিছানায় যাওয়ার পরও ঘুম আসে না, কখনো মোবাইল স্ক্রল করতে করতে সময় গড়িয়ে যায়, আবার কখনো ঘুমানোর সময় প্রতিদিনই পিছিয়ে যায়—এমন অভ্যাস ধীরে ধীরে রাত জাগাকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। তবে ঘুমের সময় ঠিক করতে এক রাতেই বড় পরিবর্তন আনার চেয়ে নির্দিষ্ট ঘুম ও জাগার সময়, রাতের আলো কমানো, ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণ এবং ঘুমের আগে শান্ত পরিবেশ তৈরির মতো নিয়মিত অভ্যাস বেশি কাজে লাগতে পারে।

শরীরের ঘুম-জাগার নিজস্ব ছন্দ রয়েছে। আলো, অন্ধকার ও দৈনন্দিন রুটিন এই ছন্দকে প্রভাবিত করে। রাতে কৃত্রিম আলো বা ক্যাফেইনের মতো উদ্দীপক উপাদান ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা দিতে পারে। তাই দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস বদলাতে শুধু রাতে তাড়াতাড়ি বিছানায় যাওয়ার চেষ্টা করলেই হবে না; দিনের শুরু থেকে রাত পর্যন্ত কয়েকটি অভ্যাসে পরিবর্তন আনা দরকার।

প্রথম কাজ হতে পারে ঘুম ও জাগার সময় নির্দিষ্ট করা

দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি হলো প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠা। ছুটির দিনেও সময়ের বড় পরিবর্তন না করাই ভালো। নিয়মিত সময়সূচি শরীরের ঘুম-জাগার ছন্দকে স্থির রাখতে সহায়তা করতে পারে।

অনেকেই সপ্তাহের কর্মদিবসে তাড়াতাড়ি ওঠার পর ছুটির দিনে অনেক দেরি পর্যন্ত ঘুমান। এতে ঘুমের সময়সূচিতে বড় পার্থক্য তৈরি হতে পারে এবং নিয়মিত ছন্দ বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। তাই সপ্তাহের সব দিনেই কাছাকাছি সময় ধরে ঘুম ও জাগার অভ্যাস তৈরি করা উপকারী।

ঘুমের আগে মোবাইল থেকে দূরে থাকুন

রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে মোবাইল, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের পর্দায় দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকার অভ্যাস ঘুমের জন্য সহায়ক নয়। এসব যন্ত্রের আলো মস্তিষ্ককে জেগে থাকার সংকেত দিতে পারে এবং ঘুম-জাগার ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।

CDC-এর পরামর্শ অনুযায়ী, ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করে রাখা ঘুমের ভালো অভ্যাসের অংশ হতে পারে।

তাই বিছানায় যাওয়ার পর মোবাইল হাতে নেওয়ার বদলে ঘুমের আগের সময়টিকে ধীরে ধীরে শান্ত হওয়ার সময় হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিকেল বা সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন কমান

রাতে ঘুম না আসার পেছনে বিকেল বা সন্ধ্যার ক্যাফেইনও ভূমিকা রাখতে পারে। কফি, চা, ক্যাফেইনযুক্ত কোমল পানীয় এবং চকোলেটেও ক্যাফেইন থাকতে পারে। এর প্রভাব কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে; NHLBI বলছে, ক্যাফেইনের প্রভাব ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে।

তাই রাতে দ্রুত ঘুমাতে চাইলে দিনের শেষভাগে ক্যাফেইন গ্রহণের অভ্যাসটি পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

ঘুমের আগে ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন

রাতে ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে খুব ভারী বা বড় খাবার খাওয়ার অভ্যাসও বদলানো ভালো। স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাসের অংশ হিসেবে ঘুমের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারী খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ কারণে রাতের খাবারের সময় ও পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া এবং ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার না খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।

দিনের বেলা শরীরকে সক্রিয় রাখুন

শুধু রাতের রুটিন নয়, দিনের অভ্যাসও রাতের ঘুমে প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং দিনের বেলা বাইরে সময় কাটানো ঘুমের অভ্যাস উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।

তবে ঘুমানোর একেবারে কাছাকাছি সময়ে তীব্র ব্যায়াম না করাই ভালো। NHLBI ঘুমের আগে শরীরকে শান্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেয়।

দিনের ঘুমের সময়ও খেয়াল করুন

দিনে দীর্ঘ সময় ঘুমানোর অভ্যাস রাতে ঘুম আসতে দেরি করতে পারে। বিশেষ করে বিকেলের দিকে দীর্ঘক্ষণ ঘুমালে রাতের ঘুমের সময়সূচি আরও পিছিয়ে যেতে পারে। রাতে ঘুমাতে সমস্যা থাকলে দিনের ঘুম সীমিত রাখা বা দিনের শুরুতেই ঘুমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

NHLBI-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনের বেলা ঘুমানোর প্রয়োজন হলে তা ২০ মিনিটের মধ্যে সীমিত রাখা যেতে পারে।

ঘুমের আগে তৈরি করুন শান্ত পরিবেশ

বিছানায় যাওয়ার আগের এক ঘণ্টাকে কাজ, উত্তেজনাপূর্ণ বিনোদন বা উজ্জ্বল আলোর পরিবর্তে শান্ত হওয়ার সময় হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বই পড়া, শান্ত সংগীত শোনা, গরম পানিতে গোসল করা বা রিল্যাক্সেশন কৌশল অনুসরণ করা ঘুমের প্রস্তুতিতে সহায়ক হতে পারে।

একই সঙ্গে শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও ঠান্ডা বা আরামদায়ক তাপমাত্রায় রাখা ঘুমের পরিবেশ উন্নত করতে পারে।

সপ্তাহান্তেও রুটিন ভাঙবেন না

অনেকের ক্ষেত্রে সপ্তাহের কয়েক দিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমালেও ছুটির দিনে রাত জাগার অভ্যাস ফিরে আসে। পরে আবার স্বাভাবিক সময়ে ঘুমাতে সমস্যা হয়। NHLBI সপ্তাহের দিন ও ছুটির দিনের ঘুমের সময়ের পার্থক্য প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে রাখার পরামর্শ দেয়।

তাই দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস বদলাতে চাইলে শুধু কর্মদিবসের জন্য নয়, পুরো সপ্তাহের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ঘুমের রুটিন তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারে।

নিয়ম মেনেও ঘুমের সমস্যা থাকলে কী করবেন?

ঘুমের সময় ঠিক করার চেষ্টা করার পরও যদি নিয়মিত ঘুমাতে সমস্যা হয়, বারবার রাতে জেগে উঠতে হয় বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার চিকিৎসায় কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি ফর ইনসমনিয়া (CBT-I) একটি স্বীকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

নিজে থেকে ঘুমের ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট শুরু করার বদলে ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে কথা বলা নিরাপদ পদ্ধতি।

দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস বদলাতে যে নিয়মগুলো মনে রাখবেন

সংক্ষেপে, রাতের ঘুমের সময় এগিয়ে আনতে চাইলে—

প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যান ও ঘুম থেকে উঠুন।

ঘুমের অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখুন।

বিকেল ও সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন গ্রহণ কমান।

ঘুমানোর কয়েক ঘণ্টা আগে ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন।

দিনের বেলা নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকুন।

রাতে দীর্ঘ সময়ের ঘুমের সমস্যা থাকলে দিনের ঘুম সীমিত রাখুন।

শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন।

ঘুমের আগে কিছু সময় শান্ত ও স্বস্তিদায়ক কাজে কাটান।

সপ্তাহান্তেও ঘুমের সময়সূচি খুব বেশি পরিবর্তন করবেন না।

রাতে দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস সাধারণত শুধু বিছানায় যাওয়ার সময় বদলালেই সহজে পরিবর্তন হয় না। নিয়মিত ঘুমের সময়, সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ওঠা, রাতের আলো ও স্ক্রিন কমানো, ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণ এবং দিনের রুটিন ঠিক রাখা—সবগুলো অভ্যাস একসঙ্গে কাজ করে। তাই পরিবর্তন আনতে হলে রাতের শেষ মুহূর্তের বদলে পুরো দিনের রুটিনের দিকেই নজর দেওয়া বেশি কার্যকর হতে পারে।

FAQ

প্রশ্ন: রাতে দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস কীভাবে বদলানো যায়?

উত্তর: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও জাগা, রাতে স্ক্রিনের ব্যবহার কমানো, ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণ এবং ঘুমের আগে শান্ত পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে অভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার করা কি সমস্যা তৈরি করতে পারে?

উত্তর: মোবাইলসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের আলো ঘুম-জাগার ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই CDC ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখার পরামর্শ দেয়।

প্রশ্ন: বিকেলে চা বা কফি খেলে রাতে ঘুমে সমস্যা হতে পারে?

উত্তর: ক্যাফেইনের প্রভাব কয়েক ঘণ্টা থাকতে পারে এবং NHLBI-এর তথ্য অনুযায়ী তা ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তাই রাতে ঘুমের সমস্যা থাকলে দিনের শেষভাগে ক্যাফেইন গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

প্রশ্ন: দিনে ঘুমালে রাতে ঘুমাতে সমস্যা হতে পারে?

উত্তর: দীর্ঘ বা দেরিতে নেওয়া দিনের ঘুম রাতে ঘুমাতে অসুবিধা করতে পারে। রাতে ঘুমের সমস্যা থাকলে দিনের ঘুম সীমিত রাখা বা দিনের শুরুতে নেওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন: নিয়ম মেনেও দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে কী করবেন?

উত্তর: নিয়মিত ঘুমের সমস্যা থাকলে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সঙ্গে কথা বলা উচিত। দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার ক্ষেত্রে CBT-I-এর মতো চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: