প্রিপেইড মিটারের রিচার্জ, চার্জ ও রিবেটের নিয়ম, জানুন সব কিছু
জানুয়ারির প্রথম রিচার্জে ১ হাজার টাকা দিলে ২ কিলোওয়াট লোডের একজন আবাসিক গ্রাহকের মিটারে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য থাকে ৮৩২ টাকা ৫২ পয়সা। বাকি টাকা কীভাবে কাটা হয়, তার হিসাব আছে নিচে। সরকার পর্যায়ক্রমে সারা দেশের সব গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনতে চায়। গ্রাহকদের উৎসাহ দিতে রিচার্জের অর্থের ওপর দেওয়া হচ্ছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট।
১ হাজার টাকার হিসাব
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড সংযোগ নিতে কোনো নিরাপত্তা জামানত লাগে না। চার্জ কাটার নিয়মগুলো এ রকম:
আবাসিক গ্রাহকের অনুমোদিত লোডের প্রতি কিলোওয়াটের জন্য মাসে ডিমান্ড চার্জ ৪২ টাকা। এর সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার সরবরাহ করা সিঙ্গেল ফেজ মিটারের মাসিক ভাড়া ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজ মিটারের ২৫০ টাকা।
প্রতি মাসের প্রথম রিচার্জের সময় ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সমন্বয় হয়। এরপর যে অর্থ থাকে, তার ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট যোগ হয়।
উদাহরণ হিসেবে ২ কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের একজন আবাসিক গ্রাহক জানুয়ারিতে প্রথমবার ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া বাবদ কাটা হবে ১৭১ টাকা ৬২ পয়সা। রিবেট যোগ হওয়ার পর বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে থাকবে ৮৩২ টাকা ৫২ পয়সা।
দুটি বিষয় মনে রাখা দরকার:
আগের মাসের ব্যালেন্স মিটারে থেকে গেলে পরের মাসে নতুন রিচার্জ ছাড়াই সেই টাকায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়।
কোনো মাসে রিচার্জ না করলে সেই মাস ও আগের মাসগুলোর প্রযোজ্য ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া পরবর্তী রিচার্জের সময় সমন্বয় হয়।
প্রিপেইড ও পোস্টপেইডের পার্থক্য কোথায়
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের পর অবশিষ্ট ব্যালেন্স ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ সহজেই দেখা যায়। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করা যায় এবং মাসিক ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। পোস্টপেইড মিটারে সাধারণত মাস শেষে বিলের অঙ্ক জানা যায়, তাই আগে থেকে খরচের হিসাব রাখা তুলনামূলক কঠিন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রিপেইড মিটারে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো সম্ভব।
রিচার্জ করবেন যেভাবে
মোবাইল ব্যাংকিং এবং ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে যেকোনো সময়।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ভেন্ডিং স্টেশন, পিওএস এজেন্ট ও ব্যাংকের বুথ থেকেও রিচার্জ করা যায়।
ব্যালেন্স কমে গেলে মিটারে সতর্কসংকেত আসে। নির্ধারিত 'ফ্রেন্ডলি আওয়ারে' ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলেও জরুরি ক্রেডিট সুবিধায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়।
বিতরণ সংস্থা ও সরকারের লাভ কী
বিদ্যুৎ বিভাগের তালিকা অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটারের সুবিধা হলো:
অগ্রিম রাজস্ব আদায়
সিস্টেম লস হ্রাস
ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ ও লোড ব্যবস্থাপনা
নির্ভুল বিলিং
বিল তৈরি ও বিতরণে জনবল ব্যয় কমানো
গ্রাহকসেবার মান বৃদ্ধি
জরুরি ব্যালেন্স ও 'ফ্রেন্ডলি আওয়ার' সুবিধা
সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনেও বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ
ভাড়াটিয়া ও সরকারি আবাসনে বিলিং-সংক্রান্ত জটিলতা কমাতেও এ ব্যবস্থা ভূমিকা রাখছে বলে জানানো হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেন, প্রিপেইড মিটারের কারণে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রিডিং নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী বিল তৈরি ও বিতরণের দরকার পড়ে না। এতে জনবল ও যাতায়াত খরচ বাঁচে। অগ্রিম পরিশোধের কারণে রাজস্ব আদায় সহজ হয় এবং বকেয়া বিল আদায়ের জটিলতাও কমে।
গ্রাহকেরা কী বলছেন
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সালেহ হাসান বাসসকে জানান, মাসের শুরুতে কত টাকা রিচার্জ করছেন, তার ওপর ভিত্তি করেই তিনি পুরো মাসের বিদ্যুৎ ব্যবহার সাজান। ঘরে বসে রিচার্জ করা যায়, মিটারে কত টাকা আছে তাও দেখা যায়। তাই এখন অপ্রয়োজনে বিদ্যুৎ খরচের ব্যাপারে তিনি আগের চেয়ে সচেতন।
বগুড়া শহরের নেসকো গ্রাহক মুজাহিদ শেখের বাসায় প্রিপেইড মিটার বসেছে কিছুদিন আগে। তিনি বলেন, আগে মাস শেষে কত বিল আসবে, তা আগাম বোঝা যেত না। এখন পরিকল্পনা করে রিচার্জ করেন। তাঁর মতে, প্রিপেইড ও পোস্টপেইডে বিদ্যুতের মূল খরচ একই। তবে সচেতন হয়ে ব্যবহার করলে প্রিপেইডে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের মত
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বাসসকে বলেন, গ্রাহকদের উদ্বেগ কমিয়ে ব্যবস্থাটিকে জনপ্রিয় করতে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ডেসকোর অ্যাপে মিটারের অবশিষ্ট ব্যালেন্স ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণসহ নানা তথ্য পাওয়া যায়। এতে বিল নিয়ে উদ্বেগ কমতে পারে। জরুরি ব্যালেন্সের সুবিধা থাকায় টাকা শেষ হলেও সাময়িকভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এড়ানো যায়। তিনি মনে করেন, সুবিধা ও ব্যবহারবিধি নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি ও গণমাধ্যমে প্রচারের উদ্যোগ নিতে পারে বিতরণ সংস্থাগুলো।
বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) নূর আহমদের ভাষ্য, রিবেটসহ নানা সুবিধা গ্রাহকের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতি অপরিহার্য। এতে কাজের বিভিন্ন ধাপ কমিয়ে আনা সম্ভব।
নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান বাসসকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশের সব গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে। নেসকোর ৬০ শতাংশের বেশি গ্রাহকের মিটার ইতোমধ্যে প্রিপেইড হয়েছে। শুরুতে কিছু এলাকায় নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও এখন তেমন সমস্যা নেই বলে জানান তিনি।
কোন সংস্থায় কতজন প্রিপেইডে
| বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা | মোট গ্রাহক | প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী |
|---|---|---|
| ডিপিডিসি | প্রায় ২০ লাখ | ১২ লাখ |
| নেসকো | ২৩ লাখের বেশি | প্রায় ১৪ লাখ |
| ডেসকো | ১৪ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ | ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮১ |
| ওজোপাডিকো | ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৪ | ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৭ |
| বাবিউবো | ৪৬ লাখ ৫ হাজার ১৯ | ৩৬ লাখ ৮ হাজার ৩৩১ |
| বিআরইবি | প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ | প্রায় ১৫ লাখ |
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী।
অভিযোগ জানাবেন কোথায়
প্রিপেইড মিটারসংক্রান্ত তথ্য বা অভিযোগ জানাতে বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় হটলাইন ১৬৯৯৯ চালু আছে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোরও নিজস্ব হটলাইন রয়েছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ করলে কত রিবেট পাওয়া যায়?
প্রতি মাসের প্রথম রিচার্জে ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সমন্বয়ের পর অবশিষ্ট অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট যোগ হয়।
২. রিচার্জের টাকা থেকে কী কী কাটা হয়?
আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের জন্য মাসে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ, ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং মিটার ভাড়া। সিঙ্গেল ফেজ মিটারের ভাড়া ৪০ টাকা, থ্রি ফেজের ২৫০ টাকা।
৩. প্রিপেইড মিটারে ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে কী হবে?
নির্ধারিত 'ফ্রেন্ডলি আওয়ারে' ব্যালেন্স শেষ হলেও জরুরি ক্রেডিট সুবিধায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। ব্যালেন্স কমলে মিটারে সতর্কসংকেতও আসে।
৪. প্রিপেইড মিটারে কীভাবে রিচার্জ করা যায়?
মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে যেকোনো সময়। এ ছাড়া বিতরণ সংস্থার ভেন্ডিং স্টেশন, পিওএস এজেন্ট ও ব্যাংকের বুথ থেকেও।
৫. প্রিপেইড মিটারের অভিযোগ কোথায় জানাতে হবে?
বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় হটলাইন ১৬৯৯৯ নম্বরে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর নিজস্ব হটলাইনও আছে।
আল-মামুন/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- Redmi Note 17 Pro 5G: বড় ব্যাটারি ও আকর্ষণীয় ফিচার
- আপনার নামে কত জমি আছে? মোবাইলেই জানুন অনলাইনে
- আজকের আবহাওয়ার খবর: কোথায় গরম, কোথায় বৃষ্টির সম্ভাবনা?
- আজকের টাকার রেট কত: বেড়েছে ৮টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- জমির খতিয়ান অনলাইনে বের করার নিয়ম, ঘরে বসেই দেখুন
- OPPO Find X10 Pro Max: স্পেসিফিকেশন, দাম ও লঞ্চের তারিখ