ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘি কে?

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৯ ১৯:১৯:৩৯
ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মেহরদাদ আখলাঘি কে?

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, সামরিক উৎপাদন এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দায়িত্ব এখন মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচির হাতে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে দেশটির নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর নিয়োগ অনুমোদন করেছে পার্লামেন্ট। দায়িত্ব নেওয়ার পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে সতর্ক করে আখলাঘি বলেছেন, ইরান প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। একই সঙ্গে এই অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ওয়াশিংটনকে বিবেচনা করতে হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

রোববার (১৮ অক্টোবর) ইরানের পার্লামেন্টে আখলাঘির নিয়োগের পক্ষে ভোট দেন ২৩৭ জন আইনপ্রণেতা। বিপক্ষে ভোট পড়ে ১৫টি। ৬৮ বছর বয়সী আখলাঘি সামরিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ইঞ্জিন তৈরির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ। নতুন দায়িত্বে তাঁকে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক শিল্প পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের কাজ সামলাতে হবে।

ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে আখলাঘির অভিজ্ঞতা

ইরানের প্রতিরক্ষা খাতে আখলাঘির কাজের অভিজ্ঞতা চার দশকেরও বেশি। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোতে তাঁর অভিজ্ঞতা ৪২ বছরের বেশি। তাঁর পরিকল্পনাগুলো শীর্ষ সামরিক কর্তৃপক্ষ, প্রেসিডেন্ট এবং পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির অনুমোদন পেয়েছে।

আখলাঘির বিশেষজ্ঞতার ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কঠিন জ্বালানির রকেট ইঞ্জিন, অ্যারোস্পেস প্রযুক্তি এবং সামরিক পণ্য উৎপাদন। এর আগে তিনি শাহিদ বাঘেরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপ, অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশন ও ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিজ অর্গানাইজেশনের প্রধান ছিলেন। তাঁর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ—দুই পক্ষেরই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

তাসনিম নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ছিলেন আখলাঘি। ‘সেজিল’ ও ‘জুলফিকার’ সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ‘আলমাস’ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘ইয়াসিন’ নির্ভুল গাইডেড বোমা তৈরিতে তাঁর ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া সেমনানের ইমাম খোমেনি স্পেস সেন্টারের অবকাঠামো উন্নয়নেও তিনি কাজ করেছেন।

হামলার পর প্রতিরক্ষা খাতে নতুন দায়িত্ব

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা শুরু করার পর দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসে। হামলার প্রথম দিনেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং আরও অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন।

এরপর মজিদ ইবনে রেজা ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। আখলাঘির নিয়োগের পর তিনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন।

হামলার কারণে ইরানের সামরিক শিল্পের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্গঠন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। এই মাসের শুরুতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজা তালাই নিক জানিয়েছিলেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন বিবেচনায় আখলাঘিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের সামরিক উৎপাদন সক্ষমতার বেশির ভাগই ধ্বংস করা হয়েছে। তবে তেহরানের বক্তব্য, বোমা হামলার নাগালের বাইরেও তাদের পর্যাপ্ত সক্ষমতা রয়েছে। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সেই সক্ষমতা আরও উন্নত করার কাজ চলছে বলেও জানিয়েছে ইরান।

ইরানের অবস্থান তুলে ধরলেন পেজেশকিয়ান

আখলাঘির নিয়োগের বিষয়ে পার্লামেন্টে বক্তব্য দেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আগে থেকে কারও ওপর আক্রমণ করবে না। তবে কেউ দেশটির ওপর হামলা চালালে ইরানের অখণ্ডতা রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই করা হবে।

এ বক্তব্যে ইরানের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের কথা তুলে ধরেন প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে, নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সামনে সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়নও অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে হুমকির জবাব

ইরানের পারমাণবিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ব্যবহারের হুমকির জবাবে আখলাঘি বলেছেন, তাঁরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন এবং নিশ্চিন্তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে কীভাবে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়া হবে, এখন সেই বিষয়টি তাঁকে ভাবতে হবে। ইরানে একটি বোমা ফেলা হলে কতজন মার্কিন সেনাকে কফিনে করে ফিরিয়ে নিতে হবে, তা ট্রাম্প নিজেই দেখতে পাবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন আখলাঘি।

সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠকে যেসব অগ্রাধিকার

যুদ্ধ চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন নির্ধারণে আইআরজিসি প্রধান জেনারেল আহমেদ ওয়াহিদিসহ শীর্ষ কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আখলাঘি।

এসব বৈঠকে সামরিক শিল্পের দ্রুত বিকাশ, আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে সেনাসদস্যদের কল্যাণ নিশ্চিত করাকেও অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

আখলাঘির নিয়োগের মধ্য দিয়ে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব এসেছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও সামরিক উৎপাদনে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প পুনর্গঠন এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্প্রসারণের দায়িত্ব এখন তাঁর ওপর।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী কে?

ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হয়েছেন মেহরদাদ আখলাঘি কেতাবচি। রোববার (১৮ অক্টোবর) পার্লামেন্ট তাঁর নিয়োগ অনুমোদন করে।

২. আখলাঘির নিয়োগের পক্ষে কতজন ভোট দিয়েছেন?

তাঁর নিয়োগের পক্ষে ২৩৭ জন আইনপ্রণেতা ভোট দিয়েছেন। বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ১৫ জন।

৩. মেহরদাদ আখলাঘি কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ?

তিনি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, কঠিন জ্বালানির রকেট ইঞ্জিন, অ্যারোস্পেস প্রযুক্তি ও সামরিক পণ্য উৎপাদনে বিশেষজ্ঞ।

৪. ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব কী?

হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক শিল্প পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

৫. আখলাঘি যুক্তরাষ্ট্রকে কী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন?

তিনি বলেছেন, ইরান প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। পাশাপাশি এই অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনীকে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনকে বিবেচনা করতে হবে বলে সতর্ক করেছেন।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: