ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

বার্সেলোনা-পিএসজি ম্যাচে ৬ গোল, শেষ পর্যন্ত জিতল যারা

খেলা ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২১ ১০:২৫:২৩
বার্সেলোনা-পিএসজি ম্যাচে ৬ গোল, শেষ পর্যন্ত জিতল যারা

উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে দারুণ এক লড়াইয়ে বার্সেলোনাকে ৪-২ গোলে হারিয়েছে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পার্ক দে প্রিন্সেসে অনুষ্ঠিত ম্যাচে দুইবার সমতায় ফিরেও শেষ পর্যন্ত হার এড়াতে পারেনি বার্সেলোনা। পিএসজির হয়ে গোল করেন দেজিরে দুয়ে, লুকাস হার্নান্দেজ, ভিতিনিয়া ও ফাবিয়ান রুইজ। অন্যদিকে, বার্সেলোনার হয়ে জালের দেখা পান জাভি এসপার্ট ও লামিনে ইয়ামাল।

ম্যাচের শেষ দিকে টানা দুই গোল করে জয় নিশ্চিত করে পিএসজি। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই জয়ের আনন্দের মধ্যেও স্বস্তিতে নেই ফরাসি ক্লাবটি। চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে হয়েছে উসমান দেম্বেলে, মারকিনিওস ও খভিচা কাভারাস্খেলিয়াকে। ফলে সামনে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে এই তিন খেলোয়াড়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রথমার্ধে আধিপত্য, দুয়ের গোলে এগিয়ে পিএসজি

খেলা শুরুর পর থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে দুই দল। তবে শুরুতে গোলের বেশি সুযোগ তৈরি করে পিএসজি। দ্বিতীয় মিনিটেই খভিচা কাভারাস্খেলিয়ার শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফিরতি বল পেয়ে উসমান দেম্বেলে শট নিলেও তা লক্ষ্যে রাখতে পারেননি।

এরপরও পিএসজির আক্রমণ থামাতে ব্যস্ত থাকতে হয় বার্সেলোনার গোলরক্ষক হোয়ান গার্সিয়াকে। দেম্বেলে, দেজিরে দুয়ে ও ফেরান তোরেসের প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দলকে ম্যাচে ধরে রাখেন তিনি। ৩১ মিনিটের দিকে অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি গোলের সুযোগ তৈরি করেও সেগুলো কাজে লাগাতে পারেনি পিএসজি।

তবে ৩৮ মিনিটে আর রক্ষা হয়নি বার্সেলোনার। নিজেদের অর্ধে লামিনে ইয়ামালের কাছ থেকে বল পেয়ে যান দুয়ে। দ্রুত বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডান পায়ে জোরালো শট করেন তিনি। হোয়ান গার্সিয়া এবার আর বল ঠেকাতে পারেননি। দেজিরে দুয়ের গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় পিএসজি।

গোল হজমের পরপরই সমতা ফেরানোর সুযোগ পেয়েছিল বার্সেলোনা। ফারমিন লোপেজের শট ঠেকিয়ে দেন পিএসজির গোলরক্ষক মাতভেই সাফোনভ। প্রথমার্ধের শেষ দিকে কাভারাস্খেলিয়ার আরও একটি প্রচেষ্টা আটকে দেন গার্সিয়া। ফলে বিরতিতে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকে পিএসজি।

দেম্বেলের চোটের পর বিরতির আগেই মাঠ ছাড়েন ওলমো

ম্যাচের ১৯ মিনিটে দৌড়ানোর সময় পেশিতে টান অনুভব করে মাঠে বসে পড়েন পিএসজির উসমান দেম্বেলে। পরে ২০ মিনিটে তাঁকে তুলে ফেরান তোরেসকে মাঠে নামান কোচ লুইস এনরিকে।

এরপর ২৭ মিনিটে চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে হয় বার্সেলোনার দানি ওলমোকেও। তাঁর পরিবর্তে খেলতে নামেন ফারমিন লোপেজ।

প্রথমার্ধে গোলের সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে ছিল পিএসজি। বিরতির আগে বার্সেলোনার বিপক্ষে ১০টি শট নেয় তারা। ২০১০-১১ মৌসুমের পর লা লিগা বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোনো ম্যাচের প্রথমার্ধে বার্সেলোনার গোলমুখে এত বেশি শটের ঘটনা ঘটেনি। অন্যদিকে, প্রথমার্ধে আটটি সেভ করেন বার্সেলোনার গোলরক্ষক হোয়ান গার্সিয়া।

দ্বিতীয়ার্ধে সমতায় ফেরে বার্সেলোনা

বিরতির পর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা জোরদার করে বার্সেলোনা। ৫৪ মিনিটে সেই চেষ্টার ফল পায় তারা। মাঝমাঠে বল পেয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ফারমিন লোপেজ পাস বাড়ান জাভি এসপার্টের উদ্দেশে। বল নিয়ে পিএসজির বক্সে ঢুকে পড়েন ১৯ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার।

সামনে থাকা লুকাস হার্নান্দেজকে কাটিয়ে কাছের পোস্ট লক্ষ্য করে জোরালো শট নেন এসপার্ট। পিএসজির গোলরক্ষক সাফোনভ বলটি ঠেকাতে ব্যর্থ হলে ১-১ সমতায় ফেরে বার্সেলোনা।

সমতায় ফেরার পর ম্যাচে উত্তেজনা আরও বাড়ে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই পিএসজি বড় ধাক্কা খায়। চোটের কারণে মাঠে বসে পড়েন মারকিনিওস ও কাভারাস্খেলিয়া। শেষ পর্যন্ত দুজনকেই তুলে নিতে বাধ্য হন কোচ লুইস এনরিকে। তাঁদের পরিবর্তে আকলিউশ ও জাবারনিকে মাঠে নামানো হয়।

লুকাস হার্নান্দেজের হেডে আবার এগিয়ে পিএসজি

বার্সেলোনা যখন ম্যাচে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছিল, তখনই গোল করে পিএসজিকে আবার এগিয়ে দেন লুকাস হার্নান্দেজ। ম্যাচের ৭২ মিনিটে দেজিরে দুয়ের কর্নার থেকে উঁচুতে লাফিয়ে হেড করেন তিনি। অ্যান্থনি গর্ডনকে পেছনে ফেলে নেওয়া তাঁর হেড সরাসরি জালে জড়ায়।

হার্নান্দেজের এই গোলটি ছিল দীর্ঘ আড়াই বছর পর তাঁর প্রথম গোল। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর এই সাফল্যে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় পিএসজি।

এর আগে ৭১ মিনিটে বার্সেলোনার সামনে সমতা ফেরানোর বড় সুযোগ এসেছিল। আশরাফ হাকিমির পাস থেকে শট নেন ফেরান তোরেস। কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা পোস্টে লেগে ফিরে আসে। সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে আবারও সমতায় ফিরতে পারত বার্সেলোনা।

ইয়ামালের গোলে সমতা, দ্রুত জবাব ভিতিনিয়ার

ম্যাচের ৭৯ মিনিটে লামিনে ইয়ামালের গোলে আবারও সমতায় ফেরে বার্সেলোনা। সদ্য মাঠে নামা ওয়ারেন জাইরে-এমেরিকে কাটিয়ে বক্সের দিকে এগিয়ে যান ইয়ামাল। এরপর কাছের পোস্ট লক্ষ্য করে শট নিলে বল জালে জড়ায়। পিএসজির গোলরক্ষক সাফোনভ এবারও তাঁকে আটকাতে পারেননি। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ২-২।

তবে বার্সেলোনার সমতায় ফেরার আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মাত্র দুই মিনিট পরই গোল করে পিএসজিকে আবার এগিয়ে দেন ভিতিনিয়া। বুক দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর সেটি মাটিতে পড়তেই জোরালো শট করেন তিনি। বল সরাসরি জালে ঢুকে গেলে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা।

শেষ দিকে ম্যাচে ফেরার জন্য বার্সেলোনা চেষ্টা চালালেও পিএসজির রক্ষণ ভাঙতে পারেনি তারা। বরং আরও একটি গোল হজম করে ম্যাচ থেকে কার্যত ছিটকে পড়ে দলটি।

ফাবিয়ান রুইজের গোলে নিশ্চিত হয় জয়

ম্যাচের ৮৬ মিনিটে পিএসজির হয়ে চতুর্থ গোলটি করেন ফাবিয়ান রুইজ। বার্সেলোনার রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে যান আশরাফ হাকিমি। এরপর গোলমুখে নিচু ক্রস বাড়ান তিনি। খুব কাছ থেকে বল জালে পাঠিয়ে পিএসজির জয় নিশ্চিত করেন রুইজ।

৪-২ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পরও আক্রমণ চালিয়ে যায় পিএসজি। তবে শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল হয়নি। যোগ করা তিন মিনিট শেষে রেফারি শেষ বাঁশি বাজালে ৪-২ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ফরাসি ক্লাবটি।

এই হারে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বার্সেলোনার টানা ১১ ম্যাচ জয়ের ধারার অবসান ঘটে।

ম্যাচের পরিসংখ্যানে যে তথ্যগুলো নজর কাড়ল

পিএসজির বিপক্ষে বার্সেলোনার রক্ষণভাগকে পুরো ম্যাচেই চাপের মুখে থাকতে হয়েছে। প্রতিপক্ষের গোলমুখে মোট ১৫টি শটের মুখোমুখি হয় তারা, যা গত ২০ বছরের মধ্যে যেকোনো প্রতিযোগিতায় এক ম্যাচে বার্সেলোনার বিপক্ষে সর্বোচ্চ।

জাভি এসপার্টের গোলও পরিসংখ্যানে জায়গা করে নিয়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বার্সেলোনার হয়ে গোল করা ১৫তম ভিন্ন কিশোর খেলোয়াড় হয়েছেন তিনি। এই পরিসংখ্যানে আয়াক্সকে ছাড়িয়ে গেছে বার্সেলোনা; তাদের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোল করেছেন ১৪ জন ভিন্ন কিশোর খেলোয়াড়।

পিএসজির দেজিরে দুয়েও গড়েছেন উল্লেখযোগ্য কীর্তি। টানা দুই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট করা ২১ বছর বা তার কম বয়সী খেলোয়াড়দের তালিকায় ২০২২ সালে নাপোলির হয়ে খভিচা কাভারাস্খেলিয়ার পর তিনিই প্রথম।

অন্যদিকে, বার্সেলোনার হয়ে টানা ১০ ম্যাচে গোল অথবা অ্যাসিস্ট করেছেন লামিনে ইয়ামাল। এই সময়ে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে তাঁর অবদান ২০টি। ২০১৮ সালে লিওনেল মেসির টানা ১২ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট করার পর বার্সেলোনার কোনো খেলোয়াড়ের এটিই দীর্ঘতম ধারাবাহিকতা।

জয়ের পরও চোট নিয়ে চিন্তায় পিএসজি

বার্সেলোনার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে পিএসজি। তবে এই জয়ের পরও দলের তিন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের চোট নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হচ্ছে কোচ লুইস এনরিকেকে।

উসমান দেম্বেলে, মারকিনিওস ও খভিচা কাভারাস্খেলিয়ার চোটের মাত্রা কতটা গুরুতর, তা দেওয়া তথ্যে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে রোববার লিগ ওয়ানে লিওঁর বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে তাঁদের অনুপস্থিতি পিএসজির জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা তৃতীয় শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা পিএসজির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের ফিটনেস ধরে রাখা। বার্সেলোনার বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয় তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ালেও চোটের সমস্যা পরবর্তী ম্যাচগুলোর পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. পিএসজি বনাম বার্সেলোনা ম্যাচে কে জিতেছে?

পিএসজি ৪-২ গোলে বার্সেলোনাকে হারিয়েছে।

২. পিএসজির হয়ে কারা গোল করেছেন?

দেজিরে দুয়ে, লুকাস হার্নান্দেজ, ভিতিনিয়া ও ফাবিয়ান রুইজ একটি করে গোল করেছেন।

৩. বার্সেলোনার হয়ে কারা গোল করেছেন?

জাভি এসপার্ট ও লামিনে ইয়ামাল একটি করে গোল করেছেন।

৪. পিএসজির কোন খেলোয়াড়েরা চোট পেয়েছেন?

উসমান দেম্বেলে, মারকিনিওস ও খভিচা কাভারাস্খেলিয়া চোটের কারণে মাঠ ছেড়েছেন।

৫. এই হারের ফলে বার্সেলোনার কোন রেকর্ডের অবসান হয়েছে?

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে বার্সেলোনার টানা ১১ ম্যাচ জয়ের ধারার অবসান হয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ