ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩

জমির দলিল তুলতে কত টাকা লাগে? জেনে নিন খরচ ও নিয়ম

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৩ ১৯:২১:৪৯
জমির দলিল তুলতে কত টাকা লাগে? জেনে নিন খরচ ও নিয়ম

জমির দলিল হারিয়ে গেলে, পুরোনো জমির মালিকানার প্রমাণ প্রয়োজন হলে কিংবা জমি কেনাবেচার কাজে নথি দরকার হলে অনেকেই সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের নকল তোলেন। তবে এই নকল সংগ্রহের খরচ নির্ভর করে দলিলের পৃষ্ঠা ও শব্দসংখ্যা, প্রযোজ্য সরকারি ফি এবং জরুরি ভিত্তিতে কপি নেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর। সরকারি ফি তালিকা অনুযায়ী, বাংলায় লেখা দলিলের নকল প্রস্তুত ও নকলনবিশের পারিশ্রমিক মিলিয়ে প্রতি ৩০০ শব্দের পৃষ্ঠা বা তার অংশের জন্য মোট ৬০ টাকা লাগতে পারে। এর সঙ্গে প্রযোজ্য কোর্ট ফি যোগ হবে।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। রেজিস্ট্রি হওয়ার পর মূল দলিল ফেরত নেওয়া এবং আগে রেজিস্ট্রি করা দলিলের সার্টিফায়েড কপি বা নকল তোলা এক প্রক্রিয়া নয়। তাই আবেদন করার আগে কোন সেবা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করলে খরচ ও সময় সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া সহজ হবে।

জমির দলিলের নকল তুলতে কত টাকা লাগে?

বাংলাদেশের কয়েকটি সরকারি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফি তালিকায় দলিলের নকল প্রস্তুতের জন্য প্রতি ৩০০ শব্দের পৃষ্ঠা বা তার অংশের ভিত্তিতে ফি নির্ধারণের তথ্য রয়েছে।

সোনাতলা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রকাশিত তালিকায় বাংলায় লেখা দলিলের ক্ষেত্রে নকল প্রস্তুতের ফি প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ টাকা এবং নকলনবিশের পারিশ্রমিক ৩৬ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রযোজ্য নকলের আবেদনে ২০ টাকার কোর্ট ফি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এই হিসাব ধরে বাংলায় লেখা ১০ পৃষ্ঠার একটি দলিলের নকল তুলতে সম্ভাব্য খরচ হতে পারে—

নকল প্রস্তুতের ফি: ১০ × ২৪ = ২৪০ টাকা

নকলনবিশের পারিশ্রমিক: ১০ × ৩৬ = ৩৬০ টাকা

কোর্ট ফি: ২০ টাকা

মোট সম্ভাব্য খরচ: ৬২০ টাকা

এটি ১০ পৃষ্ঠার উদাহরণভিত্তিক হিসাব, সবার জন্য নির্ধারিত একক খরচ নয়। দলিলের প্রকৃত পৃষ্ঠা বা শব্দসংখ্যা, ভাষা, জরুরি সেবা এবং সংশ্লিষ্ট অফিসে কার্যকর ফি অনুযায়ী মোট টাকা কমবেশি হতে পারে। আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সর্বশেষ ফি নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত।

জরুরি ভিত্তিতে দলিলের নকল তুলতে কত টাকা লাগে?

কোনো জমি বিক্রি, মামলা, ব্যাংকঋণ বা অন্য কাজে দ্রুত দলিলের নকল প্রয়োজন হলে জরুরি বা অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসে জানতে পারেন।

সোনাতলা উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রকাশিত ফি তালিকায় অগ্রাধিকারভিত্তিক নকলের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা অথবা চার পৃষ্ঠার বেশি হলে প্রতি পৃষ্ঠায় ১৫ টাকা হারে অতিরিক্ত ফির কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এই নিয়ম কীভাবে নির্দিষ্ট আবেদনে প্রয়োগ হবে, তা অফিসের কাছ থেকে নিশ্চিত করা জরুরি।

তাই জরুরি নকলের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই অঙ্ক প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। দলিলের পৃষ্ঠা ও শব্দসংখ্যা জানিয়ে আবেদন করার আগে মোট খরচ জেনে নিন।

জমির দলিলের নকল কোথা থেকে তুলবেন?

সাধারণত যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধন করা হয়েছিল, সেই অফিসে যোগাযোগ করে নকলের আবেদন করতে হয়। পুরোনো দলিলের রেকর্ড সংশ্লিষ্ট রেকর্ড রুম বা বালাম বইয়ে সংরক্ষিত থাকতে পারে। দলিলের নকল পাওয়ার জন্য নির্ধারিত আবেদন ও ফি জমা দিতে হয়।

দলিলটি কোন অফিসে রেজিস্ট্রি হয়েছিল, তা জানা না থাকলে আগে সেই তথ্য খুঁজে বের করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অফিসের সূচিবই তল্লাশি করে দলিলের তথ্য শনাক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে।

দলিলের নকল তুলতে কী কী তথ্য লাগবে?

আবেদন করার সময় দলিল শনাক্ত করার মতো তথ্য সঙ্গে রাখলে প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। যেমন—

দলিল নম্বর ও রেজিস্ট্রির সাল, জানা থাকলে

দলিলের পক্ষগুলোর নাম

জমির মৌজা, দাগ নম্বর ও খতিয়ানসংক্রান্ত তথ্য

যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়েছিল, তার নাম

আবেদনকারীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য এবং অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

সব তথ্য জানা না থাকলেও দলিল খোঁজার সম্ভাবনা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিসে কীভাবে সূচি তল্লাশি করতে হবে এবং কী তথ্য দিতে হবে, তা জেনে নিন। দলিলের নম্বর বা সাল জানা থাকলে খোঁজ করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

জমির দলিলের নকল তোলার নিয়ম

দলিলের নকল সংগ্রহের জন্য সাধারণভাবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন।

প্রথম ধাপ: সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস শনাক্ত করুন। দলিলটি কোথায় রেজিস্ট্রি হয়েছিল, তা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজনে অফিসের রেকর্ড বা সূচিবই তল্লাশির বিষয়ে খোঁজ নিন।

দ্বিতীয় ধাপ: নকলের আবেদন করুন। দলিল নম্বর, সাল ও জমির পরিচিতিমূলক তথ্য দিয়ে নির্ধারিত আবেদনপত্র পূরণ করুন। দলিল শনাক্ত করার জন্য অতিরিক্ত তথ্য প্রয়োজন হলে তা দিন।

তৃতীয় ধাপ: সরকারি ফি পরিশোধ করুন। আবেদন গ্রহণের সময় প্রযোজ্য নকল ফি, নকলনবিশের পারিশ্রমিক, কোর্ট ফি এবং জরুরি সেবার অতিরিক্ত খরচ আছে কি না, তা নিশ্চিত করুন। টাকা দেওয়ার পর রসিদ সংগ্রহ করুন।

চতুর্থ ধাপ: নকল সংগ্রহ করুন। আবেদন যাচাই ও নকল প্রস্তুতের কাজ শেষ হলে অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করুন। কপিতে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন রয়েছে কি না, তা বুঝে নিন।

মূল দলিল তুলতে কি একই খরচ লাগে?

না। রেজিস্ট্রির পর মূল দলিল ফেরত নেওয়া এবং পুরোনো দলিলের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা আলাদা বিষয়।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনের পর মূল দলিলের একটি অনুলিপি বালাম বইয়ে প্রস্তুত করা হয় এবং সূচিভুক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নিয়ম অনুযায়ী মূল দলিল ফেরত দেওয়া হয়। অফিসের প্রকাশিত সেবা-তথ্য অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়া শেষ হতে অফিসভেদে ভিন্ন সময় লাগতে পারে। কোনো ফি বকেয়া থাকলে তা রসিদের মাধ্যমে আদায় করা হতে পারে।

আপনার মূল দলিল রেজিস্ট্রির পরও ফেরত না পেলে সংশ্লিষ্ট অফিসে রেজিস্ট্রির রসিদ ও প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যোগাযোগ করুন। শুধু মূল দলিল সংগ্রহের জন্য নতুন করে সার্টিফায়েড কপি তোলার আবেদন করার প্রয়োজন আছে কি না, তা আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।

দলিলের নকল তুলতে অতিরিক্ত টাকা চাইলে কী করবেন?

দলিলের নকলের খরচ সম্পর্কে আগে থেকেই লিখিত বা সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ফি তালিকা দেখে নিন। টাকা দেওয়ার সময় রসিদ চাইুন এবং কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, তা জেনে নিন।

নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া হলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার বা জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে বিষয়টি জানান। সরকারি ফি ও প্রকৃত সেবার খরচের বাইরে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

জমির দলিল তুলতে কত টাকা লাগবে, তার উত্তর নির্ভর করে আপনি মূল দলিল ফেরত নিচ্ছেন, নাকি সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করছেন। নকলের ক্ষেত্রে প্রতি পৃষ্ঠার ফি, নকলনবিশের পারিশ্রমিক ও কোর্ট ফি যোগ করে খরচ হিসাব করা যায়। তবে সরকারি ফি তালিকা অফিসভেদে বা হালনাগাদের কারণে ভিন্ন হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সর্বশেষ ফি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিশ্চিত করে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. জমির দলিলের নকল তুলতে সর্বনিম্ন কত টাকা লাগে?

সবার জন্য একক সর্বনিম্ন খরচ বলা যায় না। দলিলের পৃষ্ঠা বা শব্দসংখ্যা, প্রযোজ্য কোর্ট ফি এবং সংশ্লিষ্ট অফিসে কার্যকর ফি অনুযায়ী মোট খরচ নির্ধারিত হয়।

২. ১০ পৃষ্ঠার জমির দলিলের নকল তুলতে কত টাকা লাগতে পারে?

একটি সরকারি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রকাশিত ফি অনুযায়ী, প্রতি পৃষ্ঠায় নকল প্রস্তুতের ২৪ টাকা ও নকলনবিশের ৩৬ টাকা এবং ২০ টাকা কোর্ট ফি ধরে ১০ পৃষ্ঠার উদাহরণভিত্তিক মোট খরচ ৬২০ টাকা হতে পারে। চূড়ান্ত অঙ্ক সংশ্লিষ্ট অফিসে যাচাই করতে হবে।

৩. জমির দলিল হারিয়ে গেলে কি নকল তোলা যায়?

হ্যাঁ। দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আবেদন করে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের চেষ্টা করা যায়। দলিল শনাক্ত করার জন্য নম্বর, সাল বা জমির পরিচিতিমূলক তথ্য কাজে লাগতে পারে।

৪. দলিলের নকল কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হবে?

সাধারণত যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়েছিল, সেখানেই আবেদন করতে হয়। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড রুম বা সূচিবইয়ের মাধ্যমে দলিল শনাক্ত করতে হয়।

৫. জরুরি ভিত্তিতে দলিলের নকল পাওয়া যায় কি?

কিছু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের প্রকাশিত ফি তালিকায় অগ্রাধিকারভিত্তিক নকলের ব্যবস্থা ও অতিরিক্ত ফির উল্লেখ রয়েছে। তবে সময় ও খরচ সংশ্লিষ্ট অফিসে নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: