ঢাকা, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

জন্মনিবন্ধন ও এনআইডিতে নামের বানান আলাদা? যা করবেন

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৪ ১৭:০৭:৩১
জন্মনিবন্ধন ও এনআইডিতে নামের বানান আলাদা? যা করবেন

জন্মনিবন্ধন সনদে একভাবে আর জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) অন্যভাবে নাম লেখা—এমন সমস্যায় পড়লে শুরুতেই বুঝতে হবে, কোন নথিতে ভুল রয়েছে। শুধু একটি নথির সঙ্গে অন্যটির বানান না মেলার কারণে তাড়াহুড়ো করে সংশোধনের আবেদন করা ঠিক নয়। শিক্ষাগত সনদ, পাসপোর্ট এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে সঠিক নাম নির্ধারণ করে তারপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

বাংলাদেশে জন্মনিবন্ধনের তথ্য সংশোধন এবং এনআইডির তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়া আলাদা। জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধকের কার্যালয় এবং অনলাইন জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থা (BDRIS) প্রাসঙ্গিক। অন্যদিকে, এনআইডির তথ্য সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। তাই দুই নথিতে নামের বানান আলাদা হলে কোনটি আগে সংশোধন করতে হবে, তা নির্ভর করবে ভুলের ধরন ও সঠিক নামের পক্ষে থাকা প্রমাণের ওপর।

প্রথমেই দেখুন, কোন নথিতে নাম ভুল

ধরা যাক, জন্মনিবন্ধনে নাম লেখা আছে ‘মো. আব্দুল করিম’, কিন্তু এনআইডিতে লেখা ‘মো. আবদুল করিম’। আবার কারও নামের ইংরেজি বানানে ‘Mohammad’ ও ‘Muhammad’ অথবা ‘Rahman’ ও ‘Rohman’-এর মতো পার্থক্য থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হবে, পার্থক্যটি কেবল বানানের, নাকি নামের কোনো অংশ বাদ পড়েছে বা পরিবর্তিত হয়েছে।

এরপর নিজের এসএসসি বা সমমানের সনদ, পাসপোর্ট, পুরোনো শিক্ষাগত নথি এবং অন্যান্য গ্রহণযোগ্য কাগজপত্রে নাম কীভাবে লেখা আছে, তা মিলিয়ে দেখতে হবে। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি-সংক্রান্ত নির্দেশনায় সংশোধনের পক্ষে প্রমাণপত্র জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আবেদনকারী এসএসসি বা সমমান পাস হলে সাধারণভাবে ওই সনদকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে কোন নথি গ্রহণ করা হবে, তা সংশোধনের ধরন ও কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে।

জন্মনিবন্ধনে ভুল থাকলে কী করবেন?

জন্মনিবন্ধন সনদে নামের বাংলা বা ইংরেজি বানান ভুল থাকলে জন্মনিবন্ধন তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন করতে হবে। এ জন্য সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন ব্যবস্থার ওয়েবসাইটে সংশোধনের আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে।

আবেদনের আগে জন্মনিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে নিজের নিবন্ধিত তথ্য যাচাই করুন। এরপর যে তথ্য সংশোধন করতে চান, তা নির্ভুলভাবে উল্লেখ করে সংশোধনের কারণ লিখতে হবে। ভুলের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কাগজপত্র বা যাচাই চাইতে পারে।

আবেদনের জন্য সরকারি পোর্টাল:

https://bdris.gov.bd/br/correction

অনলাইনে আবেদন করলেই সংশোধন নিশ্চিত হয়ে যায় না। আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক কার্যালয়ের যাচাই ও অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। তাই আবেদন করার সময় সঠিক তথ্য দেওয়া এবং প্রমাণপত্র প্রস্তুত রাখা জরুরি।

এনআইডিতে নামের বানান ভুল হলে করণীয়

জন্মনিবন্ধন ঠিক থাকলেও এনআইডিতে নামের বানান ভুল হলে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধনের জন্য আবেদন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের এনআইডি-সংক্রান্ত সরকারি ওয়েবসাইটে সংশোধনের নিয়ম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের নির্দেশনা রয়েছে।

এনআইডির নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে এসএসসি বা সমমানের সনদ, জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গ্রহণযোগ্য নথি চাওয়া হতে পারে। তবে সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে একই কাগজপত্র বাধ্যতামূলক নয়। নামের সামান্য বানান সংশোধন এবং পুরো নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রমাণের ধরন ও যাচাইয়ের মাত্রা আলাদা হতে পারে।

এনআইডি সংশোধনের সরকারি তথ্য:

https://www.nidw.gov.bd/LawsRulesNIDCorrection.php

এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত আবেদনপদ্ধতি ও ফরম দেখতে সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন:

https://ecs.gov.bd/

কোনটি আগে সংশোধন করবেন—জন্মনিবন্ধন, নাকি এনআইডি?

এ প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। যে নথিতে ভুল রয়েছে, সেটিই সংশোধনের জন্য বিবেচনা করতে হবে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সঠিক নামের পক্ষে থাকা নির্ভরযোগ্য নথিগুলো মিলিয়ে নেওয়া দরকার।

যদি জন্মনিবন্ধনে নাম ঠিক থাকে, এনআইডিতে ভুল থাকে: জন্মনিবন্ধনসহ সঠিক নামের পক্ষে থাকা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ দিয়ে এনআইডি সংশোধনের আবেদন করুন। এসএসসি বা সমমানের সনদ থাকলে সেটির তথ্যও মিলিয়ে দেখুন।

যদি এনআইডিতে নাম ঠিক থাকে, জন্মনিবন্ধনে ভুল থাকে: এনআইডি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথির সঙ্গে মিলিয়ে জন্মনিবন্ধন সংশোধনের আবেদন করুন। সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক কার্যালয় প্রয়োজন অনুযায়ী প্রমাণপত্র যাচাই করতে পারে।

যদি দুই নথিতেই ভিন্ন বানান থাকে: শিক্ষাগত সনদ, পাসপোর্ট ও অন্যান্য গ্রহণযোগ্য নথি দেখে সঠিক বানান নির্ধারণ করুন। কোন বানানটি প্রমাণিত হচ্ছে তা পরিষ্কার না হলে অনুমানের ভিত্তিতে কোনো একটি নথি সংশোধন না করে সংশ্লিষ্ট অফিসের পরামর্শ নিন।

বিশেষ করে নামের একাধিক অংশ পরিবর্তন, নামের বড় ধরনের অমিল কিংবা একাধিক সরকারি নথিতে ভিন্ন তথ্য থাকলে সাধারণ বানান সংশোধনের চেয়ে বেশি যাচাই প্রয়োজন হতে পারে।

কী কী কাগজপত্র প্রস্তুত রাখবেন?

নামের বানান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সবার ক্ষেত্রে এক নয়। তবে আবেদন করার আগে নিচের নথিগুলো কাছে রাখলে সুবিধা হতে পারে:

বর্তমান জন্মনিবন্ধন সনদের কপি।

জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।

এসএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত সনদ, যদি থাকে।

পাসপোর্ট বা নামের সঠিকতা সমর্থন করে এমন অন্যান্য গ্রহণযোগ্য নথি, যদি থাকে।

সংশোধনের কারণ ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনীয় তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলে অতিরিক্ত প্রমাণপত্র।

এগুলো সম্ভাব্য সহায়ক নথির তালিকা; সব কাগজপত্র প্রত্যেক আবেদনকারীর জন্য বাধ্যতামূলক—এমন নয়। আবেদন করার আগে জন্মনিবন্ধন বা এনআইডি সংশোধনের সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনায় নিজের ক্ষেত্রে কোন নথি প্রয়োজন, তা যাচাই করুন।

আবেদন করার আগে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন

১. প্রমাণ না মিলিয়ে নাম সংশোধন: শুধু একটি নথির সঙ্গে অন্যটির বানান মেলাতে গিয়ে ভুল নামকে সঠিক ধরে আবেদন করবেন না।

২. বাংলা ও ইংরেজি বানান আলাদা করে না দেখা: বাংলায় নাম ঠিক থাকলেও ইংরেজি বানানে সমস্যা থাকতে পারে। তাই দুই ভাষার তথ্যই পরীক্ষা করুন।

৩. একাধিক নথিতে ভিন্ন বানান রেখে দেওয়া: সংশোধনের পরিকল্পনা করার সময় শিক্ষাগত সনদ, পাসপোর্ট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথির তথ্যও মিলিয়ে দেখুন। ভবিষ্যতে নতুন নথি তৈরির সময় একই অমিল যেন আবার না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

আরও পড়ুন:জন্মনিবন্ধন ও এনআইডিতে জন্মতারিখ আলাদা, কোনটি ঠিক করবেন?

৪. দালাল বা অননুমোদিত ব্যক্তির ওপর নির্ভর করা: সরকারি পোর্টাল ও সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। আবেদন করার আগে ফি, সময়সীমা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সর্বশেষ তথ্য যাচাই করুন।

৫. আবেদন জমার রসিদ বা নম্বর হারিয়ে ফেলা: আবেদন জমা দিলে প্রাপ্তিস্বীকার, আবেদন নম্বর বা সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষণ করুন। পরে আবেদনের অবস্থা জানতে এগুলো প্রয়োজন হতে পারে।

সংশোধনে কত দিন লাগবে বা কত টাকা খরচ হবে?

জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি সংশোধনের সময় এবং ফি এক নয়। আবার সংশোধনের ধরন, আবেদন যাচাই এবং অতিরিক্ত নথির প্রয়োজন অনুসারেও প্রক্রিয়ার সময় বদলাতে পারে। তাই সব ধরনের নাম সংশোধনে নির্দিষ্ট সময় বা একই ফি লাগবে—এমন দাবি করা ঠিক নয়।

আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইটে বর্তমান ফি ও নির্দেশনা দেখে নিন। অনলাইনে তথ্য না পেলে সংশ্লিষ্ট জন্মনিবন্ধক কার্যালয় বা উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া ভালো।

জন্মনিবন্ধন ও এনআইডিতে নামের বানান আলাদা হলে আতঙ্কিত না হয়ে আগে সঠিক নামের প্রমাণ সংগ্রহ করুন। তারপর যে নথিতে ভুল রয়েছে, সেটির জন্য নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ায় সংশোধনের আবেদন করুন। সামান্য বানানের অমিল হোক বা নামের বড় ধরনের পার্থক্য—প্রমাণপত্রের সঙ্গে তথ্যের মিল রাখা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করাই ভবিষ্যতের প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. জন্মনিবন্ধন ও এনআইডিতে নামের বানান আলাদা হলে কি সমস্যা হতে পারে?

হ্যাঁ, নথি যাচাইয়ের সময় অমিলের কারণে পাসপোর্ট, শিক্ষাগত কাগজপত্র বা অন্যান্য সেবায় অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে একই ধরনের সমস্যা হবে, এমন নয়।

২. জন্মনিবন্ধন ও এনআইডির মধ্যে কোনটি আগে সংশোধন করতে হবে?

যে নথিতে ভুল রয়েছে, সেটি সংশোধনের জন্য আবেদন করতে হবে। আগে নির্ভরযোগ্য প্রমাণপত্র মিলিয়ে সঠিক বানান নির্ধারণ করুন।

৩. এনআইডির নাম সংশোধনে কি জন্মনিবন্ধন সনদই যথেষ্ট?

সব ক্ষেত্রে নয়। সংশোধনের ধরন অনুযায়ী এসএসসি বা সমমানের সনদ, পাসপোর্ট কিংবা অন্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

৪. জন্মনিবন্ধনের নাম অনলাইনে সংশোধন করা যায়?

সরকারি BDRIS পোর্টালে জন্মনিবন্ধনের তথ্য সংশোধনের আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে। আবেদন যাচাই ও অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট নিবন্ধক কার্যালয়ের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

৫. নামের বানান সংশোধনে কত টাকা লাগে?

ফি সংশোধনের ধরন ও প্রযোজ্য সরকারি নিয়মের ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সরকারি পোর্টাল বা সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে সর্বশেষ ফি জেনে নেওয়া উচিত।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: