ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩

১ টাকায় ৪ লাউ, পঞ্চগড়ে ফসল ফলিয়েও লোকসানে কৃষক

সারাদেশ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৩ ২০:২৫:০৬
১ টাকায় ৪ লাউ, পঞ্চগড়ে ফসল ফলিয়েও লোকসানে কৃষক

৪০ শতক জমিতে লাউ চাষ করতে খরচ হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। অথচ সেই জমির লাউ বিক্রি করে এখন পর্যন্ত আয় মাত্র ৩ হাজার টাকা। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার কৃষক দুলাল ইসলামের এই হিসাবই তুলে ধরছে লাউ চাষে কৃষকদের লোকসানের চিত্র। উপজেলার বাজারে কোথাও চারটি লাউয়ের দাম মিলছে মাত্র ১ টাকা, কোথাও একটি বিক্রি হচ্ছে ২ থেকে ৫ টাকায়। বিপরীতে খুচরা বাজারে একই লাউয়ের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা।

লাউয়ের ফলন ভালো হলেও বিক্রির সময় ন্যায্য দাম না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে চাষিদের জন্য। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেউ বাগানের পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন, কেউ লাউগাছ কেটে ফেলছেন, আবার কেউ ক্ষেতের ফসল গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

ফসল ফলিয়েও মিলছে না খরচের টাকা

আটোয়ারী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় লাউচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফলন ভালো হওয়ার পরও তাঁদের প্রত্যাশিত আয় হচ্ছে না। বিক্রির টাকা দিয়ে উৎপাদনে ব্যয় করা অর্থ তো উঠছেই না, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করাও সম্ভব হচ্ছে না।

মির্জাপুর ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকার কৃষক দুলাল ইসলাম জানান, ৪০ শতক জমিতে লাউ উৎপাদনে তাঁর ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। অথচ এ পর্যন্ত ফসল বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার টাকা। এত কম আয়ে শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।

একই উপজেলার আরেক কৃষক দুলাল ইসলামের অভিজ্ঞতাও একই রকম। তাঁর ভাষ্য, দুই থেকে তিন হাজার লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংস কেনার মতো টাকা পাওয়া যায় না। ন্যায্য দাম না পেয়ে তিনি বাগান কেটে ফেলেছেন। কিছু লাউ গরুকেও খাওয়াচ্ছেন। অথচ খুচরা বাজারে ওই লাউয়ের প্রতিটি বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়।

চাল-মাংস কিনতেও বিক্রি করতে হচ্ছে শত শত লাউ

লাউয়ের বর্তমান দর কৃষকদের আয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্যের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি করেছে। চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, এক কেজি মোটা চাল কেনার টাকা জোগাড় করতে প্রায় ২০০টি লাউ বিক্রি করতে হচ্ছে। আর প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ৭৫০ টাকা ধরে তা কিনতে প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় তিন হাজারটি লাউ বিক্রির অর্থ।

পরিশ্রম করে ফসল ফলানোর পরও এমন সামান্য দাম পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষিরা। তাঁদের অভিযোগ, বাজারে লাউয়ের খুচরা দাম তুলনামূলক বেশি থাকলেও উৎপাদক হিসেবে তাঁরা পাচ্ছেন খুবই কম অর্থ।

পরিচর্যা বন্ধ, গাছ কাটছেন চাষিরা

ঝলঝলি উলারচাপ এলাকার কৃষক আনসারুল ইসলাম গত ১০ দিন ধরে তাঁর লাউবাগানের পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন। কারণ, ক্ষেতের লাউ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা পিস। অন্যদিকে সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ছে, আর শ্রমিকদের প্রতিদিনের মজুরি দিতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।

আনসারুল ইসলামের মতে, উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে ফসল বিক্রি করে কৃষকের পক্ষে দীর্ঘদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। কষ্ট করে ফসল উৎপাদনের পরও যদি ন্যায্য দাম না পাওয়া যায়, তাহলে একসময় মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।

দাম না থাকায় আটোয়ারীর কিছু কৃষক পরিচর্যা বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বাগান কেটে ফেলছেন কিংবা ক্ষেতের লাউ গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন। সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে।

ফলন বেশি হওয়ায় কমেছে লাউয়ের দাম

স্থানীয় ব্যবসায়ী সলেমান আলী বলেন, এবার আটোয়ারীতে লাউয়ের আবাদ ও ফলন—দুটিই ভালো হয়েছে। তবে বাজারে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে। বাইরের বাজারেও আশানুরূপ দাম না মেলায় কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় ভালো ফলনও তাঁদের আর্থিক সুরক্ষা দিতে পারছে না। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিত করা এবং কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কেনার কার্যকর ব্যবস্থা না হলে এ ধরনের লোকসান কৃষিকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

পঞ্চগড়ে বছরে ৫৫০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড় জেলায় প্রতিবছর প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ করা হয়।

আটোয়ারী উপজেলায় এবার লাউয়ের ভালো ফলন হলেও দাম পড়ে যাওয়ায় কৃষকদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আটোয়ারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ও উত্তর

১. পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে চারটি লাউ কত টাকায় বিক্রি হচ্ছে?

কিছু এলাকায় চারটি লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ টাকায়।

২. কৃষকের কাছ থেকে কেনা লাউ খুচরা বাজারে কত টাকায় বিক্রি হচ্ছে?খুচরা বাজারে প্রতি পিস লাউয়ের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত।

৩. দুলাল ইসলাম লাউ চাষে কত টাকা খরচ করেছেন?

৪০ শতক জমিতে লাউ চাষ করতে তিনি প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ করেছেন। এ পর্যন্ত আয় হয়েছে মাত্র ৩ হাজার টাকা।

৪. আনসারুল ইসলাম কেন লাউবাগানের পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন?

লাউয়ের দাম কমে যাওয়ায় এবং উৎপাদন খরচের তুলনায় আয় কম হওয়ায় তিনি গত ১০ দিন ধরে পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন।

৫. পঞ্চগড় জেলায় প্রতিবছর কত জমিতে লাউ চাষ হয়?

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: