ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

মাথায় খুশকি কেন হয়, দূর করতে কী করবেন?

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৮ ১৩:১১:৪৩
মাথায় খুশকি কেন হয়, দূর করতে কী করবেন?

চুল আঁচড়ালে কাঁধে সাদা গুঁড়োর মতো খুশকি পড়া, মাথার ত্বকে চুলকানি কিংবা চুলের গোড়ায় ছোট ছোট আঁশ জমে থাকা—এ ধরনের সমস্যা অনেকেরই হয়। শীতকালে খুশকি বেশি চোখে পড়তে পারে, তবে শুধু শুষ্ক আবহাওয়াই এর কারণ নয়। মাথার ত্বকে অতিরিক্ত তেল, স্বাভাবিকভাবে থাকা এক ধরনের ইস্টের প্রভাব, ত্বকের সংবেদনশীলতা এবং কিছু চর্মরোগের কারণেও খুশকি দেখা দিতে পারে।

খুশকি কমাতে সব সময় দামি পণ্য বা জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত চুল পরিষ্কার রাখা, মাথার ত্বকের ধরন অনুযায়ী শ্যাম্পু ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন হলে খুশকির জন্য তৈরি বিশেষ শ্যাম্পু বেছে নেওয়া কাজে আসতে পারে। তবে দীর্ঘদিন সমস্যা চলতে থাকলে কিংবা মাথার ত্বকে লালচে ভাব, ঘা বা চুল পড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

খুশকি হয় কেন?

খুশকি হলো মাথার ত্বক থেকে মৃত ত্বককোষ তুলনামূলক বেশি দৃশ্যমান আঁশের আকারে ঝরে পড়ার একটি সাধারণ সমস্যা। এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তাই সবার ক্ষেত্রে একই কারণে খুশকি হয় না, আবার একই পদ্ধতিতে সবার সমস্যা কমেও না।

১. মাথার ত্বকে তেল ও ইস্টের প্রভাব

মাথার ত্বকে স্বাভাবিকভাবেই তেল তৈরি হয়। এই তেলের ওপর নির্ভর করে Malassezia নামের এক ধরনের ইস্ট, যা অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ত্বকেই থাকে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই ইস্টের প্রভাব, ত্বকের তেল এবং প্রদাহের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে খুশকি তৈরি হতে পারে।

এর অর্থ এই নয় যে মাথায় ইস্ট থাকলেই খুশকি হবে। ত্বকের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও সংবেদনশীলতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

২. মাথার ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া

শুষ্ক ত্বক থেকেও ছোট ছোট সাদা আঁশ ঝরে পড়তে পারে। ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়ায় কারও কারও খুশকির সমস্যা বেড়ে যায়। তবে শুষ্ক ত্বকের কারণে আঁশ ওঠা এবং তেলতেলে মাথার ত্বকে খুশকি হওয়া এক বিষয় নয়। যত্নের পদ্ধতিও তাই আলাদা হতে পারে।

৩. মাথার ত্বকে অতিরিক্ত তেল জমা

মাথার ত্বকে তেল বেশি তৈরি হলে চুল ও ত্বকে ময়লা এবং মৃত কোষ জমে থাকার প্রবণতা বাড়তে পারে। নিয়মিত পরিষ্কার না করলে কারও কারও ক্ষেত্রে খুশকি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে অতিরিক্ত তেলই খুশকির একমাত্র কারণ নয়।

৪. শ্যাম্পু বা চুলের প্রসাধনীতে সংবেদনশীলতা

নতুন শ্যাম্পু, হেয়ার ডাই, জেল, স্প্রে কিংবা অন্য কোনো প্রসাধনী ব্যবহারের পর মাথার ত্বকে চুলকানি, লালচে ভাব বা আঁশ দেখা দিলে পণ্যের কোনো উপাদানে অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন ক্ষেত্রে পণ্যটি ব্যবহার বন্ধ করে লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করা উচিত।

৫. অন্যান্য চর্মরোগ

কখনো কখনো খুশকির মতো দেখতে সমস্যার পেছনে সেবোরিক ডার্মাটাইটিস, সোরিয়াসিস, একজিমা বা মাথার ত্বকের ছত্রাকজনিত সংক্রমণ থাকতে পারে। এসব সমস্যায় শুধু সাধারণ শ্যাম্পু ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও পাওয়া যেতে পারে।

ঘরোয়া যত্নে খুশকি কমানোর উপায়

খুশকি কমাতে ঘরে বসেই কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, ঘরোয়া যত্নের অর্থ সব সময় রান্নাঘরের কোনো উপাদান মাথায় লাগানো নয়। বরং মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা, বিরক্তিকর উপাদান এড়িয়ে চলা এবং উপযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করাই বেশি কার্যকর পদ্ধতি।

১. নিয়মিত চুল ও মাথার ত্বক পরিষ্কার করুন

মাথার ত্বকে তেল বেশি তৈরি হলে বা চুল দ্রুত ময়লা হয়ে গেলে নিয়মিত মৃদু শ্যাম্পু দিয়ে পরিষ্কার করা উপকারী হতে পারে। চুলের ধরন, মাথার ত্বকের অবস্থা ও ব্যবহৃত পণ্যের ওপর নির্ভর করে কত ঘন ঘন চুল ধুতে হবে তা ঠিক করা উচিত।

শ্যাম্পু করার সময় নখ দিয়ে জোরে আঁচড়ানোর পরিবর্তে আঙুলের ডগা দিয়ে আলতোভাবে মাথার ত্বক পরিষ্কার করুন। ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন, যাতে শ্যাম্পুর অবশিষ্টাংশ জমে না থাকে।

২. প্রয়োজনে অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহার করুন

সাধারণ শ্যাম্পু দিয়ে খুশকি না কমলে খুশকি নিয়ন্ত্রণে তৈরি শ্যাম্পু ব্যবহার করা যেতে পারে। উপাদানভেদে এগুলো ভিন্নভাবে কাজ করে। যেমন:

কেটোকোনাজল (Ketoconazole): খুশকির সঙ্গে সম্পর্কিত ইস্টের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।

সেলেনিয়াম সালফাইড (Selenium sulfide): খুশকি ও মাথার ত্বকের আঁশ কমাতে ব্যবহৃত হয়।

স্যালিসাইলিক অ্যাসিড (Salicylic acid): জমে থাকা মৃত ত্বককোষ ও আঁশ আলগা করতে সাহায্য করে।

জিঙ্ক পাইরিথিওন (Zinc pyrithione): খুশকি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি উপাদান।

কোল টার (Coal tar): ত্বকের কোষ ঝরে পড়ার গতি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

সব উপাদান সবার জন্য সমান উপযোগী নয়। পণ্যের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। কিছু শ্যাম্পু ধুয়ে ফেলার আগে কয়েক মিনিট মাথার ত্বকে রেখে দিতে হয়; আবার কিছু পণ্যের নিয়ম আলাদা। জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি হলে ব্যবহার বন্ধ করে পরামর্শ নিন।

৩. চুলের প্রসাধনী বেছে ব্যবহারে সতর্ক থাকুন

চুলে অতিরিক্ত জেল, স্প্রে বা তেলজাতীয় প্রসাধনী ব্যবহার করলে কারও কারও মাথার ত্বকে তৈলাক্ত ভাব বাড়তে পারে। কোনো নির্দিষ্ট পণ্য ব্যবহারের পর খুশকি বা চুলকানি বেড়ে গেলে সেটি বন্ধ করে দেখুন উপসর্গ কমে কি না।

চুলে তেল দেওয়া নিজে থেকেই খুশকির চিকিৎসা নয়। বিশেষ করে মাথার ত্বক তেলতেলে হলে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার সমস্যাটি বাড়াতে পারে। তাই নিজের ত্বকের ধরন বুঝে পণ্য বেছে নেওয়া ভালো।

৪. মাথার ত্বকে নখ দিয়ে চুলকাবেন না

খুশকির কারণে চুলকানি হলে নখ দিয়ে আঁচড়ানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এতে ত্বকে ক্ষত তৈরি, জ্বালা বৃদ্ধি এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। চুলকানি বেশি হলে শুধু আঁশ তুলে ফেলার চেষ্টা না করে সমস্যার মূল কারণ নিয়ন্ত্রণে মনোযোগ দিন।

৫. নতুন পণ্যে সমস্যা হলে ব্যবহার বন্ধ করুন

নতুন শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, হেয়ার ডাই বা অন্য প্রসাধনী ব্যবহারের পর মাথার ত্বকে জ্বালা, লালচে ভাব কিংবা চুলকানি শুরু হলে পণ্যটি বন্ধ করুন। লক্ষণ না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। একসঙ্গে অনেক ধরনের পণ্য ব্যবহার করলে কোনটি সমস্যা তৈরি করছে তা বোঝা কঠিন হতে পারে।

লেবু, বেকিং সোডা বা ভিনেগার কি খুশকি দূর করে?

খুশকি কমানোর জন্য অনেকে মাথার ত্বকে লেবুর রস, বেকিং সোডা বা ভিনেগার ব্যবহার করেন। কিন্তু এসব উপাদান খুশকির নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। উল্টো সরাসরি ব্যবহার করলে ত্বকে জ্বালা, শুষ্কতা বা প্রদাহ বাড়তে পারে।

একইভাবে, কোনো ঘরোয়া তেল বা প্রাকৃতিক উপাদান সবার খুশকি দূর করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। মাথার ত্বকে ক্ষত থাকলে কিংবা কোনো উপাদানে সংবেদনশীলতা থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই প্রমাণভিত্তিক যত্ন ও প্রয়োজনমতো অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পুকে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো।

খুশকি কমতে কত দিন লাগে?

খুশকি কমতে কত সময় লাগবে, তা এর কারণ, তীব্রতা এবং ব্যবহৃত পণ্যের ওপর নির্ভর করে। সঠিকভাবে অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহারের পর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উন্নতি দেখা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে উপযুক্ত শ্যাম্পু খুঁজে পেতে একাধিক পণ্য চেষ্টা করার প্রয়োজন হয়।

শ্যাম্পু ব্যবহারের নিয়ম পণ্যের গায়ে লেখা নির্দেশনা অনুযায়ী অনুসরণ করতে হবে। একটি শ্যাম্পুতে কাজ না হলে নিজের মতো করে অতিরিক্ত ব্যবহার না করে ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

খুশকি কমে গেলেও পরে আবার ফিরে আসতে পারে। তাই উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে আসার পরও মাথার ত্বকের উপযোগী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

সাধারণ খুশকি সাধারণত গুরুতর সমস্যা নয়। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে এটিকে শুধু খুশকি ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।

নিয়মিত যত্ন ও উপযুক্ত অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহারের পরও সমস্যা না কমলে।

মাথার ত্বক খুব লাল, ফুলে যাওয়া, ব্যথাযুক্ত বা রক্তপাত হলে।

মাথায় বড় বড় আঁশ বা মোটা খোসা জমলে।

চুলের নির্দিষ্ট অংশে ফাঁকা হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিকভাবে চুল পড়া শুরু হলে।

মাথার পাশাপাশি মুখ, ভ্রু বা শরীরের অন্য অংশেও একই ধরনের আঁশ ও প্রদাহ দেখা দিলে।

এ ধরনের লক্ষণ সেবোরিক ডার্মাটাইটিস, সোরিয়াসিস বা অন্য কোনো ত্বকের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। প্রয়োজন হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা করে উপযুক্ত চিকিৎসা দেবেন।

খুশকি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

খুশকি হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। তাই শুধু শীতকাল, শুষ্ক ত্বক কিংবা অপরিচ্ছন্নতাকে দায়ী করে নির্দিষ্ট কোনো ঘরোয়া উপাদান ব্যবহার করাই সমাধান নয়। মাথার ত্বক নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, নিজের ত্বকের উপযোগী শ্যাম্পু ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন হলে খুশকির জন্য তৈরি চিকিৎসামূলক শ্যাম্পু বেছে নেওয়াই বাস্তবসম্মত উপায়। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. খুশকি হওয়ার প্রধান কারণ কী?

মাথার ত্বকের তেল, Malassezia নামের স্বাভাবিক ইস্টের প্রভাব, শুষ্ক ত্বক, প্রসাধনীতে সংবেদনশীলতা এবং কিছু চর্মরোগ খুশকির কারণ হতে পারে।

২. ঘরোয়া উপায়ে কি খুশকি দূর করা যায়?

নিয়মিত চুল পরিষ্কার রাখা, মাথার ত্বকের উপযোগী শ্যাম্পু ব্যবহার করা এবং জ্বালা সৃষ্টি করে এমন পণ্য এড়িয়ে চললে হালকা খুশকি নিয়ন্ত্রণে উপকার পাওয়া যেতে পারে। তবে সব ক্ষেত্রে শুধু ঘরোয়া যত্ন যথেষ্ট নয়।

৩. খুশকি দূর করতে কোন শ্যাম্পু ব্যবহার করা ভালো?

কেটোকোনাজল, সেলেনিয়াম সালফাইড, স্যালিসাইলিক অ্যাসিড বা জিঙ্ক পাইরিথিওনযুক্ত অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু কাজে আসতে পারে। কোনটি উপযোগী হবে, তা মাথার ত্বকের অবস্থা ও পণ্যের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে।

৪. লেবুর রস মাথায় দিলে কি খুশকি কমে?

লেবুর রস খুশকির নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। এটি মাথার ত্বকে জ্বালা বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে, তাই খুশকি দূর করতে সরাসরি লেবুর রস ব্যবহার না করাই ভালো।

৫. খুশকি হলে কি চুল পড়ে?

সাধারণ খুশকি সরাসরি স্থায়ী চুল পড়ার কারণ নয়। তবে তীব্র প্রদাহ, বারবার আঁচড়ানো বা মাথার ত্বকের অন্য কোনো রোগের সঙ্গে চুল পড়ার সম্পর্ক থাকতে পারে। খুশকির পাশাপাশি নির্দিষ্ট জায়গায় চুল উঠে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: