গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বাড়বে কবে, আজ কী সিদ্ধান্ত নেবে বোর্ড?
দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে যে শিল্প থেকে, সেই তৈরি পোশাক খাত এখন শ্রমিক অসন্তোষ ও উৎপাদন সংকটের মুখে। প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের এই শিল্পে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে টানা পাঁচ দিন ধরে আন্দোলন চলছে। সাভার ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছানোর ওপর পড়তে পারে বলে উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা।
এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে সরকার গঠিত ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড। বুধবার (৪ নভেম্বর) বোর্ডের প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা। ফলে একদিকে রাজপথের আন্দোলন, অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ—দুই প্রক্রিয়াই এখন তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি
বর্তমানে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই আয় দিয়ে বর্তমান বাজারে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। খাদ্যদ্রব্যের দাম, বাসাভাড়া, যাতায়াত এবং চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় বিদ্যমান ন্যূনতম মজুরি থেকে প্রায় ১৪০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি তুলেছেন শ্রমিকেরা। তাদের দাবির পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিই প্রধান যুক্তি।
মজুরি বোর্ডের সামনে একাধিক পক্ষের বাস্তবতা
নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের দায়িত্ব পাওয়া বোর্ডে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি ছাড়াও একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং একজন নিরপেক্ষ প্রতিনিধি রয়েছেন। তৈরি পোশাক শিল্পের সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করে যুক্তিসংগত মজুরি নির্ধারণ করা এই বোর্ডের কাজ।
তবে বোর্ডের কার্যক্রম যেন শুধু আলোচনা বা ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়ে শ্রমিক প্রতিনিধিদের তাগিদ রয়েছে। তাদের মতে, মজুরি নির্ধারণের সময় বর্তমান বাজারদর এবং একটি পরিবারের ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।
বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করছেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। তার বক্তব্য, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের পারিশ্রমিক এখনো অন্যতম সর্বনিম্ন। কারখানা মালিকেরা যদি শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দিতে না পারেন, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে পোশাকের বিক্রয়মূল্য বা পণ্যের ন্যায্য দাম নিয়ে নতুন করে দরকষাকষি করা উচিত।
উৎপাদন বন্ধের প্রভাব পড়ছে রপ্তানি প্রস্তুতিতে
শ্রমিক অসন্তোষের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা যাচ্ছে কারখানার উৎপাদনে। বুধবার সাভার ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন সংযোগ সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
নতুন করে সহিংসতা এবং ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় অনেক কারখানার মালিক সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখেন। আন্দোলনের কারণে শত শত কারখানায় কাজ ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানি চালান নির্ধারিত সময়ে পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এই অনিশ্চয়তা শুধু দেশীয় উৎপাদকদের জন্য নয়, বাংলাদেশের পোশাকের ওপর নির্ভরশীল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশ। এইচঅ্যান্ডএম (H&M), ইন্ডিটেক্সের জারা (Zara) এবং ওয়ালমার্ট (Walmart)-এর মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডও বাংলাদেশ থেকে তাদের বেশিরভাগ পণ্য সংগ্রহ করে।
বিশেষ করে বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের মূল উৎপাদনের সময়ে অস্থিরতা দীর্ঘ হলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তাই আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
সুইডেনভিত্তিক ফ্যাশন ব্র্যান্ড এইচঅ্যান্ডএম জানিয়েছে, কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও তাদের সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত বড় কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ও সময়মতো পণ্য সরবরাহের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হতে পারে।
মালিকদের যুক্তি: ব্যয় বাড়ছে, বাজারে প্রতিযোগিতাও তীব্র
শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবির বিপরীতে কারখানা মালিকেরা নিজেদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং কয়েকটি বড় রপ্তানি বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় শিল্পটি আগে থেকেই কঠিন সময় পার করছে।
এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতের অস্থিরতা, দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও যুক্ত হয়েছে। ফলে কারখানা পরিচালনার ব্যয় অনেক বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একবারে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি হলে অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সেই অতিরিক্ত খরচ বহন করা কঠিন হতে পারে বলে মালিকদের আশঙ্কা।
এর আগে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে বিরত থেকে মজুরি বোর্ডকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, বেআইনি আন্দোলন এবং কাজ বন্ধ রাখার পরিস্থিতি চলতে থাকলে প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতি প্রয়োগ করা হতে পারে।
শুধু মজুরি বাড়ালেই সমাধান নয়, বলছেন অর্থনীতিবিদ
শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক সেলিম রায়হান। তার মতে, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো গেলে বাড়তি মজুরি দেওয়ার পরও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব।
নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ের পাশাপাশি কারখানাগুলোর অর্থ পরিশোধের সামর্থ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক সেলিম রায়হানের মতে, শ্রমিকদের ভালো বেতন নিশ্চিত করার দায়িত্ব কেবল কারখানা মালিকদের নয়। আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্রোকারদেরও এতে সমান দায়িত্ব রয়েছে। পণ্যের ন্যায্য মূল্য দেওয়া এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার মাধ্যমে তাদেরও শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
তিনি মনে করেন, কম মজুরির শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে শিল্পের অবস্থান শক্তিশালী করতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশনেবল পোশাক উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে।
বুধবারের বৈঠকে কী গুরুত্ব পাবে
শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি, মালিকদের আর্থিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করবে সরকার গঠিত বোর্ড।
বুধবারের প্রথম বৈঠকের মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। তবে শ্রমিকদের প্রত্যাশা দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত, আর মালিকদের উদ্বেগ বাড়তি ব্যয় সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে। একই সময়ে উৎপাদন বন্ধ ও রপ্তানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্নের বিষয়টিও শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
FAQ
১. পোশাক শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবির কারণ কী?
খাদ্যদ্রব্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও চিকিৎসাসহ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন বলে দাবি করছেন শ্রমিকেরা।
২. বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন কত?
বর্তমানে তাদের নির্ধারিত ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা।
৩. নতুন মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক কবে হওয়ার কথা?
বুধবার (৪ নভেম্বর) বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
৪. শ্রমিক আন্দোলনে কোন শিল্পাঞ্চলে সংঘর্ষ হয়েছে?
ঢাকার উপকণ্ঠের সাভার ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
৫. শ্রমিক আন্দোলনে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা কি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও এইচঅ্যান্ডএম জানিয়েছে, তাদের সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এখন পর্যন্ত বড় কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। তবে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ও সময়মতো সরবরাহে চাপ বাড়তে পারে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তের পরও শেয়ারবাজারে বড় পতন
- পুরনো দলিল থেকে বর্তমান জমির মালিক বের করবেন যেভাবে
- নামজারি আছে, কিন্তু দলিল নেই—জমি কি নিজের? জানুন আইন
- Honor 600 Pro: ২০০MP ক্যামেরা ও ৭০০০mAh ব্যাটারিতে কেমন?
- নিজের নামে কোথায় কত জমি, অনলাইনে দেখবেন যেভাবে
- এইচএসসিতে ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য দুঃসংবাদ পরীক্ষা দিতে পারবে না যারা