মুখে বারবার ব্রণ হওয়ার কারণ কী, জানুন ৭টি বিষয়
মুখের ব্রণ কমে যাওয়ার কিছুদিন পর আবার নতুন করে দেখা দেওয়া অনেকের জন্যই পরিচিত সমস্যা। বিশেষ করে কপাল, গাল, থুতনি ও চোয়ালের আশপাশে বারবার ব্রণ হলে এর পেছনে শুধু ত্বকের তৈলাক্ত ভাব নয়, হরমোনের ওঠানামা, বংশগত প্রবণতা, প্রসাধনীর ব্যবহার কিংবা কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসও ভূমিকা রাখতে পারে। তাই বারবার ব্রণ হলে শুধু মুখ পরিষ্কার রাখার দিকে নজর না দিয়ে সমস্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্রণ বা অ্যাকনে (Acne) একটি সাধারণ প্রদাহজনিত ত্বকের সমস্যা। ত্বকের লোমকূপে অতিরিক্ত তেল ও মৃত কোষ জমে মুখ বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে ব্রণ তৈরি হতে পারে। পরে ওই স্থানে জীবাণুর বংশবৃদ্ধি ও প্রদাহের কারণে লালচে ফোলা, ব্যথাযুক্ত বা পুঁজযুক্ত ব্রণ দেখা দেয়। সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে একই সময়ে নতুন ব্রণ উঠতে পারে, আবার পুরোনো ব্রণ সেরে যাওয়ার পরও ফিরে আসতে পারে।
মুখে বারবার ব্রণ হওয়ার প্রধান কারণ
১. হরমোনের পরিবর্তন
বারবার ব্রণ হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হরমোনের ওঠানামা। বয়ঃসন্ধিকালে অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের মাত্রা বাড়লে ত্বকের তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ত্বকে অতিরিক্ত সিবাম বা তেল তৈরি হয়, যা লোমকূপ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
শুধু কিশোর-কিশোরীদের নয়, প্রাপ্তবয়স্কদেরও হরমোনের পরিবর্তনের কারণে ব্রণ হতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের আগে, গর্ভাবস্থায়, মেনোপজের সময় কিংবা জন্মনিয়ন্ত্রণের ওষুধ শুরু বা বন্ধ করার পর ব্রণ বেড়ে যেতে পারে। অনেকের থুতনি ও চোয়ালের আশপাশে এ ধরনের ব্রণ বেশি দেখা যায়।
২. ত্বকে অতিরিক্ত তেল তৈরি হওয়া
ত্বকের সেবাসিয়াস গ্রন্থি থেকে স্বাভাবিকভাবেই তেল বা সিবাম তৈরি হয়। এটি ত্বককে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। তবে কোনো কারণে তেল উৎপাদন বেড়ে গেলে মৃত কোষের সঙ্গে মিশে লোমকূপ বন্ধ করে দিতে পারে।
এ অবস্থায় ব্ল্যাকহেডস, হোয়াইটহেডস এবং প্রদাহযুক্ত ব্রণ দেখা দিতে পারে। যাদের ত্বক স্বাভাবিকভাবেই বেশি তৈলাক্ত, তাদের ব্রণ হওয়ার প্রবণতাও তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
৩. বংশগত প্রভাব
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ব্রণের সমস্যা থাকলে অন্য সদস্যদেরও এ ধরনের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে বাবা-মা বা নিকটাত্মীয়ের গুরুতর ব্রণ কিংবা ব্রণের কারণে দাগ হওয়ার ইতিহাস থাকলে বংশগত প্রবণতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তবে পরিবারের কারও ব্রণ থাকলেই যে সবার একই সমস্যা হবে, এমন নয়। হরমোন, ত্বকের ধরন ও অন্যান্য পরিবেশগত বিষয়ও এতে প্রভাব ফেলে।
৪. ভুল প্রসাধনী ও ত্বকের যত্নের পণ্য
সব ধরনের ময়েশ্চারাইজার, সানস্ক্রিন বা মেকআপ পণ্য সবার ত্বকের জন্য উপযোগী নয়। কিছু তেলযুক্ত বা লোমকূপ বন্ধ করে দিতে পারে এমন প্রসাধনী ব্যবহারে ব্রণ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে চুলে ব্যবহৃত তেল, জেল বা অন্যান্য তৈলাক্ত পণ্য কপাল ও চুলের গোড়ার কাছে ছোট ছোট ব্রণ তৈরি করতে পারে। তাই ত্বকের যত্নের পণ্য কেনার সময় ‘নন-কমেডোজেনিক’ (Non-comedogenic), ‘অয়েল-ফ্রি’ (Oil-free) বা লোমকূপ বন্ধ করে না—এমন উল্লেখ রয়েছে কি না, তা দেখা ভালো।
৫. মানসিক চাপ ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব
মানসিক চাপ সরাসরি ব্রণের একমাত্র কারণ নয়। তবে আগে থেকেই ব্রণের প্রবণতা থাকলে অতিরিক্ত মানসিক চাপ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। শরীরের হরমোনগত প্রতিক্রিয়া ত্বকের তেল উৎপাদন ও প্রদাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া এবং অনিয়মিত জীবনযাপনও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ব্রণের সমস্যা বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ত্বকের যত্নের পাশাপাশি নিয়মিত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
৬. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের কারণে ব্রণ দেখা দিতে পারে বা আগে থেকে থাকা ব্রণ বেড়ে যেতে পারে। যেমন কর্টিকোস্টেরয়েড, টেস্টোস্টেরন বা লিথিয়ামযুক্ত কিছু ওষুধ এ ধরনের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কোনো নতুন ওষুধ শুরু করার পর হঠাৎ ব্রণ বেড়ে গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করা প্রয়োজন। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো নির্ধারিত ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়।
৭. খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব
খাবার খেলেই সবার ব্রণ হয়—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ গ্লাইসেমিক সূচকযুক্ত খাবার এবং কিছু দুগ্ধজাত খাবারের সঙ্গে নির্দিষ্ট মানুষের ব্রণের সম্পর্ক থাকতে পারে।
অতিরিক্ত চিনি বা পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার খেলে কারও কারও ব্রণের সমস্যা বাড়তে পারে। তবে কোন খাবার সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে, তা নিশ্চিত নয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অকারণে অনেক ধরনের খাবার বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা ভালো।
যেসব অভ্যাসে ব্রণ আরও বেড়ে যেতে পারে
মুখে ব্রণ হলে দ্রুত তা দূর করার জন্য অনেকে বারবার মুখ ধোয়া, শক্ত স্ক্রাব ব্যবহার কিংবা ব্রণ চেপে বের করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এসব অভ্যাস ত্বকে জ্বালা ও প্রদাহ বাড়াতে পারে। ফলে ব্রণ আরও খারাপ হওয়ার পাশাপাশি দাগ বা স্থায়ী ক্ষত তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
এ ছাড়া কয়েকটি অভ্যাস সমস্যাকে বাড়িয়ে দিতে পারে—
দিনে বারবার সাবান বা শক্ত ক্লিনজার দিয়ে মুখ ধোয়া।
ব্রণ নখ দিয়ে খোঁটা বা চেপে পুঁজ বের করা।
ত্বকের উপযোগী নয় এমন তেলযুক্ত প্রসাধনী ব্যবহার করা।
মেকআপ না তুলে ঘুমিয়ে পড়া।
চুলের তেল বা জেল মুখের ত্বকে লেগে থাকতে দেওয়া।
ঘাম হওয়ার পর দীর্ঘ সময় মুখ পরিষ্কার না করা।
একই সঙ্গে অনেক ধরনের ব্রণের ক্রিম বা স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার করা।
ব্রণ কমাতে ত্বকের যত্ন নেবেন যেভাবে
বারবার ব্রণ হলে ত্বকের যত্নে অতিরিক্ত কিছু করার চেয়ে নিয়মিত ও কোমল পরিচর্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন সকালে ও রাতে মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা যেতে পারে। তবে ঘষাঘষি করা বা শক্ত স্ক্রাব ব্যবহার করা উচিত নয়।
ত্বকের ধরন অনুযায়ী নন-কমেডোজেনিক ময়েশ্চারাইজার ও সানস্ক্রিন ব্যবহার করা ভালো। মেকআপ করলে ঘুমানোর আগে তা ভালোভাবে তুলে ফেলতে হবে। ব্যায়াম বা অতিরিক্ত ঘামের পরও মুখ পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।
হালকা ব্রণের ক্ষেত্রে স্যালিসাইলিক অ্যাসিড বা বেনজয়েল পারঅক্সাইডযুক্ত কিছু পণ্য কাজে আসতে পারে। তবে কোন উপাদান বা পণ্য ব্যবহার করা উপযুক্ত, তা ত্বকের অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করা জরুরি। প্রয়োজনে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্রণের চিকিৎসায় ফল পেতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে; তাই দ্রুত ফল না পেয়ে বারবার পণ্য পরিবর্তন করা ঠিক নয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
সব ব্রণ ঘরোয়া যত্নে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ব্রণ যদি বারবার ফিরে আসে, দীর্ঘদিনেও না কমে, ত্বকের গভীরে বড় ও ব্যথাযুক্ত গুটি তৈরি হয় কিংবা দাগ পড়তে শুরু করে, তাহলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নারীদের ক্ষেত্রে ব্রণের পাশাপাশি মাসিক অনিয়মিত হওয়া, মুখে বা শরীরে অতিরিক্ত লোম গজানো কিংবা মাথার চুল পাতলা হওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে হরমোনজনিত সমস্যা, বিশেষ করে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS), আছে কি না তা চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তবে শুধু ব্রণ থাকলেই PCOS হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
গুরুতর ব্রণের ক্ষেত্রে চিকিৎসক ত্বকে ব্যবহারের ওষুধ, প্রয়োজনে খাওয়ার ওষুধ বা অন্য চিকিৎসা দিতে পারেন। নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড কিংবা শক্তিশালী ব্রণের ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থা বা গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে ব্রণের ওষুধ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ব্রণ নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
অনেকের ধারণা, মুখ ঠিকমতো পরিষ্কার না রাখলেই ব্রণ হয়। বাস্তবে অপরিচ্ছন্নতা ব্রণের প্রধান কারণ নয়। ত্বকের ভেতরে লোমকূপ বন্ধ হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত তেল তৈরি এবং প্রদাহের মতো প্রক্রিয়া এর সঙ্গে জড়িত। তাই বারবার মুখ ধুলেই ব্রণ চলে যাবে, এমন নয়।
একইভাবে চকোলেট বা তেলযুক্ত খাবার খেলেই সবার ব্রণ হবে—এ কথাও ঠিক নয়। খাবারের প্রভাব ব্যক্তি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। আবার ব্রণ চেপে বের করলে দ্রুত সেরে যাবে—এ ধারণাও ভুল। এতে প্রদাহ ও দাগের ঝুঁকি বাড়ে।
মুখে বারবার ব্রণ হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। হরমোনের পরিবর্তন, অতিরিক্ত তেল তৈরি, বংশগত প্রবণতা, প্রসাধনীর ব্যবহার কিংবা কিছু ওষুধের প্রভাব—সবই এতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই শুধু মুখ পরিষ্কার রাখার ওপর নির্ভর না করে ব্রণের ধরন ও সম্ভাব্য কারণ বুঝে যত্ন নেওয়া জরুরি। দীর্ঘদিনের সমস্যা, ব্যথাযুক্ত ব্রণ বা দাগ দেখা দিলে দেরি না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. মুখে বারবার ব্রণ হওয়ার প্রধান কারণ কী?
হরমোনের পরিবর্তন, অতিরিক্ত তেল তৈরি, মৃত কোষ জমে লোমকূপ বন্ধ হওয়া এবং বংশগত প্রবণতা ব্রণ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রসাধনী ও কিছু ওষুধও সমস্যা বাড়াতে পারে।
২. বারবার ব্রণ হওয়া কি হরমোনের সমস্যার লক্ষণ?
হতে পারে, তবে সব ক্ষেত্রে নয়। বিশেষ করে নারীদের মাসিকের আগে ব্রণ বেড়ে গেলে বা অনিয়মিত মাসিক ও অতিরিক্ত লোম গজানোর মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. মুখ বারবার ধুলে কি ব্রণ কমে?
না। দিনে দুইবার মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করাই সাধারণত যথেষ্ট। অতিরিক্ত মুখ ধোয়া বা জোরে ঘষলে ত্বকে জ্বালা তৈরি হয়ে ব্রণ আরও বাড়তে পারে।
৪. ব্রণ চেপে বের করলে কি দ্রুত সেরে যায়?
না। ব্রণ চেপে বের করলে প্রদাহ বাড়তে পারে এবং কালচে দাগ বা স্থায়ী ক্ষত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৫. বারবার ব্রণ হলে কখন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানো উচিত?
ব্রণ দীর্ঘদিনেও না কমলে, বড় ও ব্যথাযুক্ত গুটি হলে, দাগ পড়তে শুরু করলে অথবা ব্রণের কারণে মানসিক অস্বস্তি তৈরি হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আল-মামুন/