ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কী খাবেন? পেট পরিষ্কার রাখতে ৫ খাবার

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৯ ১৬:৩৭:০৯
কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কী খাবেন? পেট পরিষ্কার রাখতে ৫ খাবার

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে মলত্যাগে কষ্ট, শক্ত মল, পেটে অস্বস্তি কিংবা মলত্যাগের পরও পেট পুরোপুরি পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি দেখা দিতে পারে। এ সমস্যা কমাতে প্রতিদিনের খাবারে আঁশ বা ফাইবারের পরিমাণ বাড়ানো, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত শারীরিক নড়াচড়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পেঁপে, পেয়ারা, শাকসবজি, ডাল, ওটস ও লাল আটার মতো সহজলভ্য খাবার খাদ্যতালিকায় রাখলে অনেকের মল নরম হতে এবং নিয়মিত মলত্যাগে সহায়তা মিলতে পারে।

তবে সব ধরনের কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ এক নয়। শুধু একটি নির্দিষ্ট খাবার খেলেই যে দ্রুত পেট পরিষ্কার হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। খাবারের পাশাপাশি দৈনন্দিন অভ্যাস, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং শারীরিক অসুস্থতাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কোন খাবারগুলো খেতে পারেন?

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এমন খাবার বেছে নেওয়া ভালো, যেগুলোতে প্রাকৃতিক আঁশ রয়েছে। আঁশ মলের পরিমাণ ও গঠন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। তবে আঁশ বাড়ানোর সঙ্গে পর্যাপ্ত তরল পান করাও জরুরি।

১. পেঁপে, পেয়ারা ও অন্যান্য ফল

পেঁপে, পেয়ারা, কমলা, নাশপাতি, আপেল এবং অন্যান্য আঁশসমৃদ্ধ ফল নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। সম্ভব হলে ফলের রসের পরিবর্তে আস্ত ফল খাওয়া ভালো, কারণ রস তৈরি করলে অনেক ক্ষেত্রে আঁশের পরিমাণ কমে যায়।

পেয়ারা বা আপেলের মতো ফল খাওয়ার সময় ভালোভাবে ধুয়ে খোসাসহ খাওয়া যায়, যদি তা সহ্য হয়। তবে হঠাৎ অনেক বেশি ফল খেলে কারও কারও পেট ফাঁপা বা গ্যাস হতে পারে। তাই পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ানো ভালো।

২. শাকসবজি

লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, ঢেঁড়স, গাজর, মটরশুঁটি ও অন্যান্য সবজিতে আঁশ থাকে। প্রতিদিনের দুপুর ও রাতের খাবারে বিভিন্ন ধরনের সবজি রাখলে খাদ্যতালিকায় আঁশের পরিমাণ বাড়ানো সহজ হয়।

সবজি একেবারে বাদ দিয়ে শুধু ভাত, মাছ বা মাংস খাওয়ার অভ্যাস থাকলে ধীরে ধীরে সবজির পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট সবজি খেলেই সবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হবে—এমন নয়।

৩. ডাল, ছোলা ও শিমজাতীয় খাবার

মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, রাজমা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার আঁশের ভালো উৎস। নিয়মিত খাবারের সঙ্গে ডাল রাখা কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়তা করতে পারে।

যাঁদের ডাল খেলে গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা হয়, তাঁরা অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করতে পারেন। ভালোভাবে রান্না করা ডাল খাওয়া এবং পরিমাণ ধীরে বাড়ানো অনেকের ক্ষেত্রে সহনীয় হতে পারে।

৪. লাল আটা, ওটস ও পূর্ণশস্য

পরিশোধিত শস্যের তুলনায় লাল আটার রুটি, ওটস, ভুসিযুক্ত শস্য এবং অন্যান্য পূর্ণশস্যে সাধারণত বেশি আঁশ থাকে। তাই খাদ্যতালিকায় এসব খাবার রাখলে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সাহায্য মিলতে পারে।

যাঁরা নিয়মিত শুধু সাদা ভাত বা ময়দার তৈরি খাবার খান, তাঁরা ধীরে ধীরে অন্যান্য শস্যও খাবারে যোগ করতে পারেন। তবে আঁশ হঠাৎ অনেক বাড়ালে পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে।

৫. কিউই ও শুকনো আলুবোখারা

কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ে করা গবেষণায় কিউই ফল ও শুকনো আলুবোখারা বা প্রুনসের উপকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এসব খাবার সহায়ক হতে পারে। তবে গবেষণার ফল সবার ক্ষেত্রে একই হবে, এমন নয়।

কিউই বা প্রুনস সহজলভ্য না হলে উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। স্থানীয় ফল, শাকসবজি, ডাল ও পূর্ণশস্য থেকেও আঁশ পাওয়া যায়।

পানি পান কেন গুরুত্বপূর্ণ?

খাবারের আঁশ মলের গঠন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু পর্যাপ্ত তরল না পেলে আঁশের উপকার কম হতে পারে। তাই সারাদিন নিয়মিত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ। পানির পাশাপাশি স্যুপের মতো তরল খাবারও দৈনিক তরল গ্রহণে অবদান রাখতে পারে।

কতটা পানি প্রয়োজন, তা আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম, বয়স ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করে। হৃদ্‌রোগ, কিডনির সমস্যা বা অন্য কোনো কারণে চিকিৎসক তরল গ্রহণ সীমিত করতে বললে সেই নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে কোন খাবার কমাবেন?

ফাস্ট ফুড, চিপস, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং আঁশ কম থাকা খাবার বেশি খেলে খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় আঁশের ঘাটতি হতে পারে। এসব খাবারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ফল, সবজি, ডাল ও পূর্ণশস্যের পরিমাণ বাড়ানো ভালো।

তবে কোষ্ঠকাঠিন্য হলেই সব ধরনের মাংস, দুগ্ধজাত খাবার বা নির্দিষ্ট কোনো খাবার পুরোপুরি বাদ দিতে হবে—এমন সাধারণ নিয়ম নেই। ব্যক্তিভেদে কোন খাবারে সমস্যা বাড়ছে, সেটিও খেয়াল করা প্রয়োজন।

পেট পরিষ্কার রাখতে খাবারের পাশাপাশি যা করবেন

শুধু খাবার পরিবর্তন নয়, দৈনন্দিন কয়েকটি অভ্যাসও কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করতে পারে।

মলত্যাগের চাপ এড়িয়ে যাবেন না: চাপ অনুভব করলে অযথা দেরি করবেন না।

নিয়মিত হাঁটুন: নিজের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিদিন হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করুন।

নির্দিষ্ট সময় রাখুন: প্রতিদিন সুবিধাজনক সময়ে টয়লেটে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

আঁশ ধীরে বাড়ান: একসঙ্গে অনেক বেশি আঁশ না খেয়ে কয়েক দিন ধরে পরিমাণ বাড়ান।

অতিরিক্ত চাপ দেবেন না: দীর্ঘ সময় জোর করে মলত্যাগের চেষ্টা না করে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন রুটিন পরিবর্তনের পর উপকার পেতে কয়েক দিন লাগতে পারে; কারও ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় প্রয়োজন হয়।

কখন কোষ্ঠকাঠিন্য চিন্তার কারণ?

কোষ্ঠকাঠিন্য অনেক সময় সাধারণ খাদ্যাভ্যাস বা জীবনযাপনের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও কিছু লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়। মলের সঙ্গে রক্ত, পেটে স্থায়ী ব্যথা, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা দীর্ঘদিন ধরে মলত্যাগের অভ্যাস বদলে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কোষ্ঠকাঠিন্যের সঙ্গে তীব্র বা একটানা পেটব্যথা, বমি এবং গ্যাস বের না হওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু আঁশযুক্ত খাবার খেয়ে অপেক্ষা করবেন না।

আরও পড়ুন:

মাথায় খুশকি কেন হয়, দূর করতে কী করবেন?

হৃদস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে যায় কেন, কখন ডাক্তার দেখাবেন

ঘুম কম হলে পুরুষের শরীরে যে ৭ ধরনের প্রভাব পড়ে

খাবার ও জীবনযাপনের পরিবর্তনেও সমস্যা না কমলে, বারবার কোষ্ঠকাঠিন্য হলে বা কয়েক সপ্তাহ ধরে উপসর্গ চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কিছু ওষুধ ও শারীরিক সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত জোলাপ বা পেট পরিষ্কারের ওষুধ ব্যবহার করা ঠিক নয়।

কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে কোনো একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আঁশসমৃদ্ধ ফল, শাকসবজি, ডাল ও পূর্ণশস্য রাখুন। পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত হাঁটা এবং মলত্যাগের স্বাভাবিক চাপ উপেক্ষা না করার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। তবে সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে কিংবা সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে খাবার পরিবর্তনের পাশাপাশি চিকিৎসা নেওয়াই নিরাপদ।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. কোষ্ঠকাঠিন্য হলে সকালে কী খাওয়া ভালো?

সকালে পানি পান করার পাশাপাশি ওটস, লাল আটার রুটি, ফল বা আঁশযুক্ত অন্য খাবার খেতে পারেন। তবে শুধু সকালে একটি নির্দিষ্ট খাবার খেলেই সবার পেট পরিষ্কার হবে, এমন নয়।

২. পেঁপে খেলে কি কোষ্ঠকাঠিন্য কমে?

পেঁপেতে আঁশ রয়েছে। সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে এটি কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে, তবে একে নিশ্চিত বা তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে ধরা ঠিক নয়।

৩. কোষ্ঠকাঠিন্য হলে প্রতিদিন কতটা আঁশ খাওয়া উচিত?

যুক্তরাষ্ট্রের NIDDK-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের বয়স ও লিঙ্গভেদে দৈনিক প্রায় ২২–৩৪ গ্রাম আঁশ প্রয়োজন হতে পারে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে, তাই খাবার থেকে ধীরে ধীরে আঁশ বাড়ানো ভালো।

৪. পানি বেশি খেলেই কি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়?

পর্যাপ্ত পানি মল নরম রাখতে সাহায্য করে, বিশেষ করে আঁশের পরিমাণ বাড়ালে। তবে কোষ্ঠকাঠিন্যের অন্য কারণ থাকলে শুধু পানি পান করেই সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে।

৫. কত দিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?

খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনেও সমস্যা না কমলে, বারবার হলে বা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মলের সঙ্গে রক্ত, স্থায়ী পেটব্যথা, বমি বা গ্যাস বের না হওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: