ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৩০ মাঘ ১৪৩২

MD. Razib Ali

Senior Reporter

কেন আবু বকর (রা.)-কে প্রথম খলিফা নির্বাচিত করেছিলেন সাহাবিরা?

ধর্ম ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ ফেব্রুয়ারি ১২ ১২:১০:৫৫
কেন আবু বকর (রা.)-কে প্রথম খলিফা নির্বাচিত করেছিলেন সাহাবিরা?

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল উম্মাহর নেতৃত্ব নির্ধারণ। সেই সংকটময় মুহূর্তে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-কে ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করেন। কোনো আবেগ নয়, বরং সুস্পষ্ট ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও বাস্তবসম্মত কারণের ভিত্তিতেই তাকে মদিনা রাষ্ট্রের প্রধান মনোনীত করা হয়েছিল।

নিচে সেসব কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—

১. ইসলামে অগ্রগণ্যতা ও অটল ঈমান

হজরত আবু বকর (রা.) ছিলেন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। ইসলামের একদম শুরুর দিন থেকে তিনি ছিলেন নবীজি (সা.)-এর ছায়ার মতো সঙ্গী। বিশেষ করে মিরাজের অলৌকিক ঘটনার পর যখন অনেকে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল, তখন তিনি বিনা শর্তে নবীজিকে সত্যায়ন করেন এবং 'সিদ্দীক' উপাধি লাভ করেন। তার এই প্রশ্নাতীত ঈমান ও নিষ্ঠাই তাকে নেতৃত্বের দৌড়ে সবার আগে রেখেছিল।

২. নবীজির (সা.) সরাসরি ইঙ্গিত ও ইমামতি

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ অসুস্থতার সময় সাহাবিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন আবু বকর (রা.) নামাজের ইমামতি করেন। তৎকালীন ইসলামী সমাজে নামাজের ইমামতি করাকে কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। সাহাবিরা নবীজির এই নির্দেশকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে গ্রহণ করেন।

৩. হিজরতের বীরত্বপূর্ণ সঙ্গী

মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় যখন সারা আরব নবীজিকে খুঁজছিল, তখন সাওর গুহায় তাঁর একমাত্র সফরসঙ্গী ছিলেন আবু বকর (রা.)। সেই কঠিন ও ভীতিপ্রদ সময়ে তাঁর অসীম সাহস ও আত্মত্যাগ সাহাবিদের মনে নেতৃত্বের গভীর আস্থার জন্ম দিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনেও তাঁকে ‘দ্বিতীয় ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

৪. কুরাইশ বংশের মর্যাদা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা

তৎকালীন আরব সমাজে কুরাইশ বংশের এক বিশেষ প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল। আবু বকর (রা.) কুরাইশ গোত্রের একটি মর্যাদাসম্পন্ন শাখার সদস্য হওয়ায় তাঁর নেতৃত্ব সবার কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। ফলে নবগঠিত মদিনা রাষ্ট্রে গোত্রগত সংঘাত বা রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা অনেকটাই কমে গিয়েছিল।

৫. গভীর জ্ঞান ও বিচক্ষণতা

আবু বকর (রা.) ছিলেন কোরআন, সুন্নাহ এবং আরব বংশপরম্পরা সম্পর্কে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। নবীজির জীবদ্দশাতেই তিনি অনেক জটিল বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে নিজের প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। সাহাবিরা জানতেন, রাসূল (সা.)-এর পর উম্মাহর হাল ধরার মতো সবচেয়ে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি তিনিই।

৬. উম্মাহর ঐক্য ও সাহাবিদের ঐকমত্য

নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পর সাকিফা বনু সাঈদায় মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর হজরত উমর (রা.) প্রথম আবু বকর (রা.)-এর হাতে বাইআত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করেন। এরপর একে একে সব সাহাবি তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হন। এই ঐক্যই মূলত ইসলামকে বড় ধরনের বিভক্তি থেকে রক্ষা করে।

৭. অনুপম চরিত্র ও বিনয়

ব্যক্তিগত জীবনে আবু বকর (রা.) ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও দুনিয়াবিমুখ। খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর প্রথম ভাষণেই তিনি বলেছিলেন, “আমি আপনাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নই, কিন্তু আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।” তাঁর এই নির্লোভ চরিত্র ও দায়িত্ববোধ সাহাবিদের আস্থাকে আরও সুদৃঢ় করেছিল।

হজরত আবু বকর (রা.)-এর নির্বাচন ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই পরবর্তী সময়ে ইসলাম বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার ভিত্তি পায়। সাহাবিদের সেই সঠিক সিদ্ধান্তই আজ ইসলামের সোনালী ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ