ঢাকা, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

‘নগদ’-এর টাকার হিসাব ঘিরে দুদকের অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৬ ১২:৩৪:৩৫
‘নগদ’-এর টাকার হিসাব ঘিরে দুদকের অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

সরকারি ভাতার টাকা সুবিধাভোগীদের ওয়ালেটে পড়ে থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের অনুসন্ধানে বড় অঙ্কের অর্থের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রায় ১ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা বিভিন্ন ধাপে সরিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। পরে সরানো অর্থের একটি অংশ ‘নগদ’ পরিচালনাকারী থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের শেয়ার কেনায় ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।

দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়ায় ২৪ হাজার ১৫৯টি ভুয়া উদ্যোক্তা ওয়ালেট, ৬৪৮টি ভুয়া ডিএসও এবং ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের ব্যবহার শনাক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট হিসাব থেকে বের করে নেওয়া অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ৭০৯ কোটি ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার ২২৯ টাকা।

যে অর্থ ভাতাভোগীদের ওয়ালেটেই থাকার কথা

সরকারি বিভিন্ন ভাতা বিতরণের জন্য ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘নগদ’-এর মাধ্যমে মোট ৩২ হাজার ৬৫০ কোটি ৭৬ লাখ ৪৮ হাজার ২৫৪ টাকা পাঠানো হয়েছিল। সুবিধাভোগীদের মোবাইল ওয়ালেটে ই-মানি হিসেবে পৌঁছাত এই অর্থ।

কোনো ভাতাভোগী টাকা পাওয়ার পর এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে সেটি উত্তোলন না করলে নিয়ম অনুযায়ী অর্থ তার ওয়ালেটেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগ এসেছে, এমন কিছু ওয়ালেটের অর্থ পরে আর সেখানেই থাকেনি।

মৃত্যু, পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো কারণে যেসব সুবিধাভোগী অর্থ তুলতে পারেননি, সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে তাদের ওয়ালেট থেকে অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক তথ্য পেয়েছে দুদক।

একাধিক স্তরে বদলেছে টাকার অবস্থান

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অর্থ সরানোর প্রক্রিয়ায় প্রথমে ব্যবহার করা হয় ভুয়া উদ্যোক্তা ওয়ালেট। এমন ২৪ হাজার ১৫৯টি ওয়ালেটের তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব ওয়ালেটে অর্থ পৌঁছানোর পর সেটি আবার স্থানান্তর করা হতো ৬৪৮টি ভুয়া ডিএসওর ওয়ালেটে। সেখানেই প্রক্রিয়াটি থেমে থাকেনি। পরবর্তী সময়ে ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থ আরও সরিয়ে নেওয়া হয়।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান বলছে, এভাবে একাধিক ধাপে অর্থ স্থানান্তর ও বিভিন্ন হিসাবে ঘোরানোর মাধ্যমে ১ হাজার ৭০৯ কোটি ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার ২২৯ টাকা ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট হিসাব থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে।

নথিতে এসেছে ৮ ডিস্ট্রিবিউটরের নাম

৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মধ্যে অন্তত আটটির নাম দুদকের নথিতে পাওয়া গেছে। এগুলো হলো অ্যাস্থেটিক ডেভেলপমেন্ট, এআরএ ডেভেলপার, ডিজিটাল সেন্টার ডিস্ট্রিবিউশন, কল্লোল ডিস্ট্রিবিউশন, এলবি নিটওয়্যার, পাইনউড ডিস্ট্রিবিউশন, রহমান ডিস্ট্রিবিউশন ও ইউডিসি ডিস্ট্রিবিউশন।

দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন হিসাবে বিপুল অর্থ পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একাধিক হিসাবের মধ্যে অর্থ স্থানান্তর করে তা ঘোরানো হয়েছে।

সরানো অর্থের গন্তব্যে থার্ড ওয়েভের শেয়ার

অনুসন্ধানে অর্থের পরবর্তী ব্যবহার নিয়েও তথ্য পেয়েছে দুদক। অভিযোগ অনুযায়ী, সরিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের শেয়ার কেনার কাজে ব্যয় করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭টি শেয়ার কিনতে প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ অভিযোগে উঠে এসেছে, সরকারি ভাতার অর্থ সরানোর পর তা সরাসরি অর্থ হিসেবে না রেখে কোম্পানির শেয়ারে রূপান্তর করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

এ ঘটনায় থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক।

তানভীর মিশুককে ঘিরে আরও অভিযোগ

সরকারি অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি তানভীর আহমেদ মিশুকের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।

দুদক জানিয়েছে, বৈধ চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা না এনে অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে শেয়ার হস্তান্তর, শূন্য কুপন বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত মূলধন দিয়ে বিদেশি ঋণের দায় পরিশোধ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং নিজের ও স্ত্রীর নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।

কীভাবে ‘নগদ’-এর সঙ্গে যুক্ত হয় থার্ড ওয়েভ

দুদকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর একটি চুক্তির মাধ্যমে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডকে ‘নগদ’ মোবাইল আর্থিক সেবার মাস্টার এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল।

ওই চুক্তিতে রাজস্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের অংশ নির্ধারণ করা হয় ৫১ শতাংশ। অন্যদিকে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিসের অংশ ছিল ৪৯ শতাংশ।

পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এর পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ‘নগদ’-এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রশাসক নিয়োগ করে।

শেয়ার বিদেশি নামেও দেখানোর অভিযোগ

দুদকের অনুসন্ধানে শেয়ারগুলোর মালিকানা নিয়েও অভিযোগ সামনে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ভাতার অর্থ ব্যবহার করে কেনা শেয়ার পরবর্তী সময়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের নামে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।

এ ধরনের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে চৌধুরী ফ্রন্টিয়ার হোল্ডিংস, মিয়ার্স হোল্ডিংস, সেঞ্চুরি অনলাইন, চৌধুরী বেঙ্গল ফিনটেক, ব্লু ওয়াটার হোল্ডিংস, তাসিয়া হোল্ডিংস, চৌধুরী ফ্রন্টিয়ার ম্যানেজমেন্ট, ফিনটেক হোল্ডিংস, সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স ও ইএসওপি হোল্ডিংসের নাম এসেছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, এসব শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় আদালতের দ্বারস্থ দুদক

অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট শেয়ার বিক্রি বা অন্যভাবে হস্তান্তর হয়ে গেলে রাষ্ট্র আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে আদালতকে জানিয়েছে দুদক।

এই পরিস্থিতিতে তানভীর আহমেদ মিশুকসহ অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭টি শেয়ার অবরুদ্ধ করার আবেদন করে সংস্থাটি। এসব শেয়ারের মূল্য প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা।

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির শেয়ারগুলো অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন।

আদালতের নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট শেয়ার হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তর কিংবা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আদেশের কপি যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর, ‘নগদ’-এর প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোর আবেদন করা হয়েছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে অনুসন্ধান শেষে

দুদকের অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত যে তথ্য উঠে এসেছে, সেগুলো অভিযোগ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর্যায়েই রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ