ঢাকা, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

নতুন পে-স্কেলে বদলাচ্ছে বেতন-ভাতার প্রচলিত নিয়ম

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৬ ১২:৪৩:১০
নতুন পে-স্কেলে বদলাচ্ছে বেতন-ভাতার প্রচলিত নিয়ম

একই হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার নিয়মে এবার পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য। প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ মূল বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি কোন গ্রেডে কত শতাংশ ইনক্রিমেন্ট মিলবে, সেটিও নতুনভাবে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াত ও টিফিনসহ বিভিন্ন ভাতার অঙ্ক ও হারেও আসছে পরিবর্তন।

গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বৈঠকে সশস্ত্র বাহিনীর নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে।

নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হলেও পুরো বেতন কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর হচ্ছে না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আগে যে নিয়ম, এবার যে প্রস্তাব

বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সব গ্রেডেই মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় সেই একই হার আর সব গ্রেডের জন্য থাকছে না।

প্রস্তাবিত হিসাবে গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এরপর উচ্চতর গ্রেডে উঠলে হার কমবে। গ্রেড-৫-এ ৪ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও গ্রেড-৩-এ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

অর্থাৎ গ্রেডের অবস্থান অনুযায়ী বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির শতাংশও আলাদা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বেতন কাঠামোয় বড় লাফ

ইনক্রিমেন্টের নিয়ম বদলালেও নতুন কাঠামোয় মূল বেতনের অঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে ২০টি গ্রেড চালু আছে এবং নতুন ব্যবস্থাতেও এই ২০ গ্রেডই রাখা হচ্ছে।

গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আর গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে।

তবে নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাড়িভাড়ায় শতাংশ কমলেও বাড়তে পারে টাকার অঙ্ক

বাড়িভাড়া ভাতার প্রচলিত হারও নতুন করে সাজানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া দেওয়া হয়। নতুন প্রস্তাবে সেটি ৪০ থেকে ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে।

অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় বর্তমান ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশের পরিবর্তে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে এখানে শতাংশ কমলেও বিষয়টি শুধু হার দিয়ে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ নতুন কাঠামোয় মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাড়িভাড়ার শতাংশ কমার পরও প্রকৃত টাকার পরিমাণ আগের তুলনায় বেশি হতে পারে। মূল বেতন বৃদ্ধি এবং ভাতার হার পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে মোট আর্থিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

পদোন্নতি না হলেও উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ

চাকরিজীবীদের উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন নিয়মের প্রস্তাব রয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করলেও পদোন্নতি না হলে উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এই অপেক্ষার সময় কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এরপর দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পেতে একই গ্রেডে আরও ৬ বছর চাকরি করার শর্ত রাখার কথা বলা হয়েছে।

পদোন্নতিযোগ্য পদে থাকা কোনো চাকরিজীবী পদোন্নতি না পেলে পুরো চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা পাওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। আর যেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই এবং ‘ব্লকড পদ’ হিসেবে বিবেচিত, সেসব পদে কর্মরতদের জন্য তিনবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বয়সভেদে চিকিৎসা ভাতায় নতুন হিসাব

চিকিৎসা ভাতার বর্তমান কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে।

এখন সব সরকারি কর্মচারী মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। নতুন ব্যবস্থায় বয়সের ভিত্তিতে ভাতার অঙ্ক আলাদা করার প্রস্তাব রয়েছে।

৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী চাকরিজীবীদের মাসে ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সীদের ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রেও ভাতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী পেনশনভোগীদের মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

সব সরকারি চাকরিজীবীর জন্য মোবাইল ভাতা

নতুন কাঠামোয় প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা মাসে ৫০০ টাকা করে মোবাইল ভাতা পেতে পারেন। ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত ভাতা মাসে ১৫০ টাকা।

এর পাশাপাশি যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতার অঙ্কও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

একটি ভাতা কমবে, কয়েকটির হার অপরিবর্তিত

বাংলা নববর্ষ ভাতার ক্ষেত্রে বর্তমানের চেয়ে কম হার প্রস্তাব করা হয়েছে। মূল বেতনের ২০ শতাংশের পরিবর্তে এটি ১৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।

পাহাড়ি ভাতা এবং হাওড়, দ্বীপ ও চরভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশই রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এসব ভাতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে।

ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতার পরিমাণ বর্তমান হারের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

অন্যদিকে শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার ক্ষেত্রে বর্তমান হারই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

২০২৪ সালের বিশেষ প্রণোদনাও থাকছে না

নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে ২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনা বাতিল হওয়ার কথা রয়েছে। ওই প্রণোদনা প্রথমে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে তা বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়।

সামরিক বাহিনীর বেতনেও পরিবর্তন

সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও একই সঙ্গে নতুন কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে।

ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব রয়েছে। মেজর পদে এই হার ৪ শতাংশ। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

মূল বেতনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন থাকছে। নন-কমব্যাট্যান্ট (এনরোল্ড) বা এনসি (ই) এবং সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। মেজর জেনারেল ও সমপদে তা ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমপদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিমানবাহিনীর কয়েকটি বিশেষ বেতনও বাড়বে

বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো বা স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব ১৫ শতাংশ। জরিপ ভাতা ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে।

প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ সুবিধার আওতায়

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এর আওতায় আসতে পারেন।

এর পাশাপাশি প্রায় সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীও নতুন কাঠামোর সুবিধা পেতে পারেন।

সব মিলিয়ে নতুন পে-স্কেল শুধু মূল বেতন নয়, ইনক্রিমেন্ট, উচ্চতর গ্রেড এবং বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। তবে এসব পরিবর্তন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এবং নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হয়েছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ