ঢাকা, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩

পে-স্কেল এলে বেতন বাড়বে, তবে থাকছে না এই সুবিধা

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৬ ১২:৫০:০৬
পে-স্কেল এলে বেতন বাড়বে, তবে থাকছে না এই সুবিধা

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোয় একদিকে বাড়ছে মূল বেতন, চিকিৎসা ও কয়েকটি ভাতা; অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ২০২৪ সালে চালু করা বিশেষ প্রণোদনা। ফলে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ কার্যকর হলে শুধু বেতন বাড়ার হিসাবেই পরিবর্তন সীমাবদ্ধ থাকছে না, বদলে যাচ্ছে ইনক্রিমেন্ট ও বিভিন্ন সুবিধার কাঠামোও।

গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬ অনুমোদন করা হয়। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হলেও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনায় মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

মূল বেতন বাড়ছে, গ্রেড থাকছে আগের মতো

নতুন পে-স্কেলে গ্রেডের সংখ্যা বাড়ানো বা কমানোর প্রস্তাব নেই। বর্তমানের ২০টি গ্রেডই রাখা হচ্ছে। পরিবর্তনটি মূলত বেতনের অঙ্ক ও সুবিধাগুলোর কাঠামোয়।

প্রস্তাব অনুযায়ী, সর্বনিম্ন গ্রেড-২০-এ চাকরির শুরুতে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকার পরিবর্তে ২০ হাজার টাকা হতে পারে। আর গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে ২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনা আর পাওয়া যাবে না।

১০ শতাংশের প্রণোদনা আর থাকছে না

বিশেষ প্রণোদনাটি সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০২৪ সালে চালু করা হয়েছিল। তখন মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে এটি দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। পরে সেই হার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়।

নতুন জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার পর এই অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল করার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় মূল বেতন বাড়লেও বর্তমানে পাওয়া ওই বিশেষ সুবিধাটি আর অব্যাহত থাকবে না।

বার্ষিক ইনক্রিমেন্টেও বদল

এখন সরকারি চাকরির প্রতিটি গ্রেডে মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়। নতুন প্রস্তাবে সেই একই হার সব গ্রেডে রাখা হচ্ছে না।

গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশই রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এরপর গ্রেড-৫-এ হার হবে ৪ শতাংশ। গ্রেড-৪ ও গ্রেড-৩-এর জন্য ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এর জন্য ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও পদ অনুযায়ী কাছাকাছি কাঠামো রাখা হচ্ছে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং নিচের পদে ৫ শতাংশ, মেজরে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেলে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব রয়েছে।

বাড়ি ভাতার শতাংশ কমবে, কিন্তু টাকার অঙ্ক বাড়তে পারে

বাড়ি ভাতার হারেও পরিবর্তন আসছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ি ভাতা দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় সেটি ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

শতাংশের হিসাবে কম মনে হলেও মূল বেতন বাড়ানোর কারণে বাস্তবে পাওয়া বাড়ি ভাতার টাকার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যেতে পারে।

বয়স অনুযায়ী চিকিৎসা ভাতার নতুন প্রস্তাব

চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও বয়সভিত্তিক নতুন অঙ্ক নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

৫০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত বয়সীদের ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার প্রস্তাব রয়েছে।

অবসরপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের জন্য মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ৬ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার প্রস্তাব

নতুন কাঠামোর আরেকটি পরিবর্তন হলো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার প্রস্তাব।

প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের ক্ষেত্রে মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য ১৫০ টাকা মোবাইল ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

এর সঙ্গে কয়েকটি বিদ্যমান ভাতার অঙ্কও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

তবে বাংলা নববর্ষ ভাতার ক্ষেত্রে উল্টো পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। মূল বেতনের ২০ শতাংশের বদলে এটি ১৫ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে।

কিছু সুবিধা থাকছে অপরিবর্তিত

সব ধরনের ভাতায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে না। শিক্ষা সহায়তা, অ্যাক্টিং চার্জ, আপ্যায়ন, কুক ও নিরাপত্তা ভাতা, উৎসব ভাতা এবং বিশ্রাম ও বিনোদন ভাতা বর্তমান হারেই রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

পাহাড়ি এলাকা এবং হাওর, দ্বীপ ও চর এলাকার ভাতাও মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এসব ভাতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হবে।

ঝুঁকি ভাতা ও বিভিন্ন বিশেষ ভাতা ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীতে আলাদা কিছু পরিবর্তন

সামরিক সদস্যদের ক্ষেত্রেও নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একাধিক পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে।

নন-কমব্যাট্যান্ট (Enrolled) বা NC(E) এবং সমতুল্য পদে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মেজর জেনারেল ও সমতুল্য পদে বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা রয়েছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমতুল্য পদকে গ্রেড-২ এবং কর্নেল ও সমতুল্য পদকে গ্রেড-৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য করার প্রস্তাব রয়েছে।

এ ছাড়া বিমানবাহিনীর ফ্লাইং পে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কমান্ড, স্টাফ, শিক্ষাদান, যোগ্যতা, ডিস্টার্বেন্স ও স্পেশালিস্ট পে ১০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। স্কিল, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, প্যারাশুট, কমান্ডো/স্নাইপার, স্কুবা ডাইভিং ও গুড কনডাক্ট পে ১৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সার্ভে অ্যালাউন্স বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে ৩০ শতাংশ।

কারা সুবিধার আওতায় আসতে পারেন

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী সুবিধা পেতে পারেন। এর পাশাপাশি সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগীও এর আওতায় আসতে পারেন।

সব মিলিয়ে নতুন পে-স্কেলে মূল বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতায় পরিবর্তন আসছে। একই সময়ে উচ্চতর গ্রেডের ইনক্রিমেন্টের হার পুনর্নির্ধারণ এবং ২০২৪ সালের বিশেষ প্রণোদনা বাতিলের প্রস্তাব থাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের মোট বেতন-সুবিধার কাঠামোও নতুনভাবে হিসাব করতে হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ