ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

শেয়ারবাজারে এআই, অস্বাভাবিক লেনদেনে আসবে ‘রেড ফ্ল্যাগ’

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২০ ১২:৫৭:০০
শেয়ারবাজারে এআই, অস্বাভাবিক লেনদেনে আসবে ‘রেড ফ্ল্যাগ’

শেয়ারবাজারে কোনো একটি শেয়ারের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলেই শুধু সেটি নজরে আসবে না; একই সঙ্গে কারা লেনদেন করছে, কীভাবে করছে, একাধিক হিসাবের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব তথ্যও বিশ্লেষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) আগামী এক বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর স্বয়ংক্রিয় সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থায় যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার পর এআই নিজে থেকেই ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা সতর্ক সংকেত তৈরি করতে পারবে। প্রয়োজন দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট লেনদেন দ্রুত বন্ধ বা স্থগিত করার ব্যবস্থাও নেওয়া সম্ভব হবে। ফলে বাজার পর্যবেক্ষণের প্রক্রিয়ায় গতি আসার পাশাপাশি মানুষের সুযোগসন্ধানী হস্তক্ষেপ ও সম্ভাব্য পক্ষপাত কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু একটি এআই সফটওয়্যার বসানোর ওপর নির্ভর করছে না। বরং বাজারের তথ্য, বিনিয়োগকারীর পরিচয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডেটা, প্রযুক্তি ও জনবল—সবকিছুকে একটি কার্যকর ব্যবস্থার মধ্যে আনাই হবে বড় পরীক্ষা।

বাজারের আচরণ বিশ্লেষণে আসবে নতুন মাত্রা

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ) আয়োজিত এক উন্মুক্ত আলোচনায় বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানান, এক বছরের মধ্যে ডিএসইকে এআইভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থায় যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান নজরদারি পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে আরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সন্দেহজনক কার্যক্রম চিহ্নিত করার দিকে যাচ্ছে বাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামো।

বিএসইসি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় শুধু মূল্য পরিবর্তন নয়, একটি শেয়ারে কতটা লেনদেন হচ্ছে এবং কত ঘন ঘন হচ্ছে—সেটিও বিশ্লেষণ করা যাবে। একই ব্যক্তি কিংবা পারস্পরিকভাবে সংশ্লিষ্ট একাধিক হিসাবের লেনদেনের ধরনও নজরে আসবে।

একই সময়ে কেনাবেচা, সম্ভাব্য ওয়াশ ট্রেড, সার্কুলার ট্রেডিং, ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের সম্ভাব্য ধরন, ফ্রন্ট-রানিং এবং পাম্প অ্যান্ড ডাম্পের মতো কর্মকাণ্ড শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও এআই সহায়তা করতে পারে। ব্রোকার বা অনুমোদিত প্রতিনিধির অস্বাভাবিক কার্যক্রমও এই বিশ্লেষণের অংশ হতে পারে।

কোনো কোম্পানি কখন তথ্য বা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করেছে এবং সেই সময়ের সঙ্গে শেয়ারের লেনদেনের কী সম্পর্ক রয়েছে, সেটিও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। ফলে নজরদারি শুধু একটি শেয়ারের মূল্য বা লেনদেনের পরিমাণে সীমাবদ্ধ না থেকে বাজারে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্ক পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

কারা লেনদেন করছে, সেটিই বড় প্রশ্ন

এআই কোনো শেয়ারে অস্বাভাবিকতা ধরতে পারলেও কারসাজির সঙ্গে কারা জড়িত, তা জানতে হলে লেনদেনের পেছনের পরিচয় ও মালিকানার তথ্য প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখানেই কেওয়াইসি তথ্য বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রতিবেদনে ডিএসইর একজন পরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সার্ভিল্যান্স প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে গ্রাহকের কেওয়াইসি তথ্যের সমন্বয় নেই।

ধরা যাক, একটি শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে—এআই সেটি দ্রুত শনাক্ত করতে পারবে। কিন্তু এরপর বের করতে হবে শেয়ারটি কারা কিনছে, ওই ক্রেতাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং আলাদা আলাদা হিসাবের পেছনে একই প্রকৃত সুবিধাভোগী বা বেনিফিশিয়াল ওনার রয়েছেন কি না।

এই কারণে ডিএসইর ট্রেডিং তথ্যের সঙ্গে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), বিএসইসি এবং ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় তথ্য যুক্ত করা জরুরি হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারে গ্রাহকের হিসাব, লেনদেন এবং সিকিউরিটিজ হোল্ডিংয়ের তথ্য পরিবর্তন বা গোপন করার কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটিও নজরদারির মধ্যে আনতে হবে।

বর্তমান পদ্ধতিতে সংকেতের পর শুরু হয় যাচাই

বর্তমানে ডিএসইর সার্ভিল্যান্স বিভাগ রিয়েল-টাইম বাজার তথ্যের ওপর নজর রেখে অস্বাভাবিক মূল্য ও লেনদেনের গতিপ্রকৃতি শনাক্ত করে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন থেকে প্রায় এক দশক পর রিয়েল-টাইম সার্ভিল্যান্সের ভিত্তিতে কয়েকটি কোম্পানির লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।

সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, শ্যামপুর সুগার মিলস ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

তবে বর্তমান ব্যবস্থায় কোনো সংকেত পাওয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে মানবিক যাচাই প্রয়োজন হয়। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছে অপ্রকাশিত কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বা পিএসআই রয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। এরপর সন্দেহজনক লেনদেন বা কারসাজির অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করা হয়।

স্টার অ্যাডহেসিভসের শেয়ারের ঘটনাতেও এমন প্রক্রিয়া দেখা গেছে। অস্বাভাবিক লেনদেন শনাক্ত হওয়ার পর ডিএসইর সার্ভিল্যান্স প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিএসইসি তদন্ত করে। তদন্তে সিরিজ ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের চাহিদা তৈরির অভিযোগ ওঠে এবং এ ঘটনায় এফএ ট্রেডিং করপোরেশনকে জরিমানা করা হয়।

রিয়েল-টাইম তথ্য ছাড়া এআই কার্যকর হবে না

প্রস্তাবিত ব্যবস্থার জন্য প্রথম প্রয়োজন বাজারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দ্রুত পাওয়ার সক্ষমতা। ডিএসইতে দেওয়া প্রতিটি অর্ডার, সম্পন্ন লেনদেন, মূল্য, পরিমাণ এবং সময়ের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করার মতো অবকাঠামো থাকতে হবে।

এরপর বিভিন্ন উৎসের তথ্য একই ব্যবস্থায় আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান এবং বিএসইসির প্রয়োজনীয় ডেটা নিরাপদ উপায়ে সংযুক্ত করতে হবে।

শুধু নির্ধারিত একটি সীমা পার হলেই সতর্ক সংকেত তৈরি করবে—এমন মডেলের পরিবর্তে স্বাভাবিক লেনদেনের আচরণ বুঝে সেখান থেকে অস্বাভাবিক বিচ্যুতি খুঁজে বের করতে সক্ষম এআই ও মেশিন-লার্নিং ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।

আবার সতর্ক সংকেত পাওয়ার পর কর্মকর্তাদের যেন আলাদা আলাদা জায়গায় তথ্য খুঁজতে না হয়, সেই ব্যবস্থাও দরকার। একই প্ল্যাটফর্মে লেনদেন, হিসাব, মালিকানা ও কোম্পানি-সংক্রান্ত তথ্য দেখার সুযোগ থাকতে হবে।

এর সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা এবং অডিট ট্রেইলও অপরিহার্য। এআই কোনো লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করার কারণ কী ছিল এবং পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—তার রেকর্ড সংরক্ষিত থাকতে হবে।

এআই ভুলও করতে পারে, বাদ পড়তে পারে প্রকৃত কারসাজি

স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু হলেও প্রতিটি সতর্ক সংকেতকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোনো কোম্পানির শেয়ারের মূল্য দ্রুত বেড়ে যাওয়ার পেছনে বাস্তব ও যৌক্তিক ব্যবসায়িক কারণ থাকতে পারে। এআই সেটিকে সন্দেহজনক ধরে নিয়ে সরাসরি লেনদেন বন্ধ করে দিলে স্বাভাবিক বাজার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

আবার কারসাজির কৌশল যদি ধীরে ধীরে প্রয়োগ করা হয় কিংবা একাধিক ভিন্ন হিসাব ব্যবহার করা হয়, তাহলে প্রচলিত কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্নের সঙ্গে সেটি নাও মিলতে পারে। ফলে একদিকে নির্দোষ লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে শনাক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে, অন্যদিকে প্রকৃত কারসাজি এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ারের বক্তব্যেও মানুষের ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, এআইয়ের কাজ বাজার বিশ্লেষকদের সহায়তা করা, তাদের পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়া নয়। অর্থাৎ এআই দ্রুত অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করে সংকেত দেবে, এরপর বিশ্লেষকরা সংশ্লিষ্ট তথ্য পরীক্ষা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।

বিনিয়োগকারীদের সামনে সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও

নতুন সার্ভিল্যান্স ব্যবস্থা কার্যকর হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোনো শেয়ারে অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শুরু হওয়ার বিষয়ে তুলনামূলক দ্রুত সংকেত পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। সন্দেহজনক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কাও কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে অতিরিক্ত স্বয়ংক্রিয়তার ফল উল্টোও হতে পারে। ভুল সতর্ক সংকেতের ভিত্তিতে স্বাভাবিক লেনদেন থামানো হলে বাজারে অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

এ ছাড়া কেওয়াইসি তথ্য অসম্পূর্ণ বা পুরোনো হলে এআইয়ের বিশ্লেষণ দুর্বল হতে পারে। সাইবার হামলার ঝুঁকি এবং পুরোনো ডেটার ভিত্তিতে তৈরি মডেলের সীমাবদ্ধতাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

প্রযুক্তি নয়, পুরো তথ্যব্যবস্থাই হবে মূল পরীক্ষা

এক শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এআইভিত্তিক সার্ভিল্যান্স প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলেও এটিকে সম্পূর্ণ কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য পর্যায়ে নেওয়া চ্যালেঞ্জিং।

কারণ এখানে সফটওয়্যার স্থাপনের পাশাপাশি ডেটা ইন্টিগ্রেশন, কেওয়াইসি সংযোগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা, মডেল যাচাই এবং দক্ষ জনবল—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।

শেষ পর্যন্ত এআই নজরদারি কতটা কার্যকর হবে, তা শুধু প্রযুক্তির ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। বাজারের তথ্য কত দ্রুত ও নির্ভুলভাবে এক জায়গায় যুক্ত করা যাচ্ছে এবং এআই যে লেনদেনকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করছে, তার পরবর্তী তদন্ত কতটা দ্রুত ও যথাযথভাবে করা যাচ্ছে—সেটিই এই উদ্যোগের বাস্তব কার্যকারিতার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ