ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

সকালের নাস্তায় এই খাবারগুলো রাখলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ০১ ১১:১৭:৫৯
সকালের নাস্তায় এই খাবারগুলো রাখলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে

সকালের নাস্তায় শুধু পেট ভরানোর মতো খাবার রাখলেই হয় না, কী ধরনের খাবার খাওয়া হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রোটিন, খাদ্য আঁশ এবং তুলনামূলকভাবে কম প্রক্রিয়াজাত খাবার নাস্তায় রাখলে অনেকের ক্ষেত্রে ক্ষুধা কিছুটা দেরিতে ফিরে আসতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি প্রোটিন গ্রহণ স্বল্পমেয়াদে পূর্ণতার অনুভূতি বাড়াতে পারে। একইভাবে কিছু ধরনের খাদ্য আঁশও তৃপ্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই সকালে নাস্তা করার কিছুক্ষণ পরই ক্ষুধা লাগার বদলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে চাইলে ডিম, ওটস, টক দই, ডালজাতীয় খাবার, বাদাম ও ফলের মতো পুষ্টিকর খাবারকে নাস্তায় জায়গা দেওয়া যেতে পারে। তবে কোনো একটি খাবার সবার ক্ষেত্রে একইভাবে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। খাবারের পরিমাণ, মোট ক্যালরি, ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা ও দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।

কেন প্রোটিন ও আঁশযুক্ত নাস্তা বেশি তৃপ্তি দিতে পারে?

খাবারের পর পেট ভরা বা ক্ষুধার অনুভূতি শুধু খাবারের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না। খাবারে থাকা প্রোটিন ও খাদ্য আঁশও এতে ভূমিকা রাখে।

বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বেশি প্রোটিনযুক্ত খাবার কম প্রোটিনযুক্ত খাবারের তুলনায় পূর্ণতার অনুভূতি বাড়াতে পারে। একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে উচ্চ প্রোটিন গ্রহণের পর পূর্ণতার অনুভূতি বেশি পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে খাদ্য আঁশের প্রভাব সব ধরনের আঁশে এক নয়। গবেষণায় বিশেষ করে কিছু দ্রবণীয় ও সান্দ্র আঁশ এবং ওটস বা রাইয়ের মতো কিছু শস্যের আঁশ তৃপ্তি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে বলে দেখা গেছে। ২০২৬ সালের একটি systematic review-তেও ওটস ও রাইয়ের cereal fiber-এর সঙ্গে ক্ষুধা ও তৃপ্তির কিছু অনুকূল পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

১. ডিম

সকালের নাস্তায় ডিম রাখা সহজ এবং পুষ্টিকর একটি উপায়। ডিমে উচ্চমানের প্রোটিন থাকে, যা নাস্তাকে তুলনামূলকভাবে বেশি তৃপ্তিদায়ক করতে পারে।

সেদ্ধ ডিম, অল্প তেলে ভাজি বা সবজি দিয়ে অমলেট—বিভিন্নভাবেই ডিম খাওয়া যায়। তবে অতিরিক্ত তেল, মাখন বা লবণ যোগ করলে নাস্তাটির মোট ক্যালরি ও সোডিয়াম বেড়ে যেতে পারে।

প্রোটিনের সঙ্গে সবজি যোগ করলে নাস্তায় খাদ্য আঁশও বাড়ানো সম্ভব।

২. ওটস

ওটস সকালের নাস্তায় দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি পাওয়ার জন্য জনপ্রিয় একটি খাবার। এর অন্যতম কারণ হলো এতে থাকা খাদ্য আঁশ, বিশেষ করে বিটা-গ্লুকান।

গবেষণায় দেখা গেছে, ওটস ও অন্যান্য কিছু শস্যের আঁশ ক্ষুধা ও তৃপ্তির অনুভূতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ওটসের সঙ্গে দুধ বা টক দই, সামান্য বাদাম এবং একটি ফল যোগ করলে নাস্তায় প্রোটিন, আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি একসঙ্গে পাওয়া যায়।

তবে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি সিরাপ বা চকলেট-ফ্লেভারের টপিং ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যকর নাস্তাটির ক্যালরি দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।

৩. টক দই

চিনি ছাড়া বা কম চিনি দেওয়া টক দই সকালের নাস্তায় ভালো একটি বিকল্প হতে পারে। এতে প্রোটিন থাকে এবং এর সঙ্গে ফল ও বাদাম যোগ করলে নাস্তাটি আরও পুষ্টিকর হয়।

বিশেষ করে শুধু মিষ্টি দই খাওয়ার পরিবর্তে চিনি ছাড়া টক দই + ফল + সামান্য বাদাম একটি বেশি ভারসাম্যপূর্ণ নাস্তা হতে পারে।

তবে দইয়ের প্যাকেটজাত বিভিন্ন পণ্যে অতিরিক্ত চিনি থাকতে পারে। তাই কেনার সময় পুষ্টিগুণের লেবেল দেখা ভালো।

৪. ডাল ও ছোলা

বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাসে ডাল ও ছোলা সহজলভ্য হওয়ায় এগুলো দিয়েও পুষ্টিকর সকালের নাস্তা তৈরি করা যায়।

ছোলা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবারে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন এবং খাদ্য আঁশ থাকে। প্রোটিন ও আঁশ—দুটিই খাবারের তৃপ্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে, যদিও আঁশের প্রভাব খাবারের ধরন ও ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।

সকালে সেদ্ধ ছোলা, শসা, টমেটো ও অন্যান্য সবজি দিয়ে হালকা সালাদ তৈরি করা যেতে পারে। অতিরিক্ত তেল বা লবণ না দেওয়াই ভালো।

৫. বাদাম

কাঠবাদাম, চিনাবাদাম, আখরোটসহ বিভিন্ন বাদামে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও কিছু খাদ্য আঁশ থাকে। অল্প পরিমাণ বাদাম নাস্তায় যোগ করলে খাবারের পুষ্টিমান বাড়তে পারে।

তবে বাদামে ক্যালরি তুলনামূলক বেশি। তাই একসঙ্গে অনেক বাদাম খাওয়ার পরিবর্তে পরিমিত পরিমাণ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ওটস বা টক দইয়ের সঙ্গে অল্প বাদাম যোগ করা যেতে পারে।

৬. পেয়ারা, আপেল বা অন্যান্য গোটা ফল

ফলের রসের পরিবর্তে গোটা ফল খাওয়া সাধারণত বেশি উপকারী পছন্দ হতে পারে। গোটা ফলে পানি ও খাদ্য আঁশ থাকে, যা নাস্তাকে আরও তৃপ্তিদায়ক করতে সাহায্য করতে পারে।

পেয়ারা, আপেল, কমলা, নাশপাতি বা মৌসুমি ফল নাস্তায় রাখা যেতে পারে। তবে শুধু ফল খেয়ে নাস্তা শেষ করার বদলে ফলের সঙ্গে প্রোটিনের উৎস যেমন ডিম, টক দই বা বাদাম রাখলে খাবারটি তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হয়।

৭. আটার রুটি বা পূর্ণ শস্যের খাবার

সাদা ময়দার তৈরি পরিশোধিত খাবারের পরিবর্তে সম্পূর্ণ শস্য বা বেশি আঁশযুক্ত শস্যের খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে।

আটার রুটির সঙ্গে ডিম, ডাল বা সবজি খেলে নাস্তায় কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি প্রোটিন ও আঁশও যোগ হয়। ফলে শুধু রুটি বা পাউরুটি খাওয়ার তুলনায় খাবারটি বেশি ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।

তবে ‘ব্রাউন’ বা ‘মাল্টিগ্রেইন’ লেখা থাকলেই কোনো পণ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেশি স্বাস্থ্যকর—এমন নয়। সম্ভব হলে উপাদান ও পুষ্টিগুণের লেবেল দেখে পণ্য নির্বাচন করা উচিত।

শুধু একটি খাবার নয়, খাবারের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ

দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখার জন্য কোনো একটি ‘ম্যাজিক’ খাবারের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। বরং নাস্তায় প্রোটিন + আঁশ + পরিমিত স্বাস্থ্যকর ফ্যাট + প্রয়োজন অনুযায়ী পূর্ণ শস্য বা গোটা ফল—এই সমন্বয় রাখা বেশি বাস্তবসম্মত।

যেমন—

ডিম + আটার রুটি + সবজি

অথবা

ওটস + টক দই + ফল + সামান্য বাদাম

অথবা

সেদ্ধ ছোলা + সবজি + একটি গোটা ফল

এ ধরনের নাস্তায় একাধিক পুষ্টি উপাদান একসঙ্গে পাওয়া যায়।

সকালের নাস্তায় কোন ভুলগুলো ক্ষুধা দ্রুত ফিরিয়ে আনতে পারে?

শুধু মিষ্টি খাবার, চিনিযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি সিরিয়াল বা খুব বেশি পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট দিয়ে নাস্তা করলে খাবারটি সবসময় দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি দেবে—এমন নয়।

একইভাবে ‘স্বাস্থ্যকর’ মনে করে পরিমাণের দিকে নজর না দিলে বাদাম, গ্র্যানোলা, পিনাট বাটার বা অন্যান্য ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার থেকেও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ক্যালরি গ্রহণ হয়ে যেতে পারে।

তাই নাস্তায় শুধু একটি নির্দিষ্ট খাবার যোগ করার বদলে খাবারের সামগ্রিক ভারসাম্য এবং পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রোটিন বেশি খেলেই কি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকবে?

প্রোটিন তৃপ্তি বাড়াতে পারে—এমন যথেষ্ট গবেষণা রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের বিভিন্ন গবেষণা ও মেটা-অ্যানালাইসিসে বেশি প্রোটিনের সঙ্গে ক্ষুধা কমা ও পূর্ণতার অনুভূতি বাড়ার সম্পর্ক দেখা গেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে যত বেশি প্রোটিন খাওয়া হবে, তত বেশি সময় পেট ভরা থাকবে। ব্যক্তিভেদে প্রতিক্রিয়া আলাদা হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে গবেষণার সব ফল একরকম নয়।

এমনকি নাস্তায় প্রোটিন ও আঁশ বাড়ানোর একটি ছোট গবেষণায় অতিরিক্ত প্রোটিন বা আঁশের কারণে পরবর্তী খাবারে গ্রহণের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ গবেষণার ফল সব পরিস্থিতিতে এক নয়।

নাস্তাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে যা মনে রাখা দরকার

দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখার লক্ষ্য থাকলে সকালের নাস্তায়—

একটি ভালো প্রোটিনের উৎস রাখুন।

সম্ভব হলে গোটা শস্য বা আঁশযুক্ত খাবার বেছে নিন।

গোটা ফল রাখুন, ফলের রসের পরিবর্তে।

বাদাম ও বীজ পরিমিত পরিমাণে খান।

অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয় কমান।

খাবারের মোট পরিমাণ ও ব্যক্তিগত ক্যালরির প্রয়োজন বিবেচনা করুন।

শুধু ‘পেট ভরা’ নয়, নাস্তাটি যেন পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় হয়, সেদিকেও নজর দিন।

সকালের নাস্তায় ডিম, ওটস, টক দই, ছোলা, বাদাম, গোটা ফল এবং পূর্ণ শস্যের মতো খাবার রাখা অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেলে নির্দিষ্ট সংখ্যক ঘণ্টা ক্ষুধা লাগবে না—এমন বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তা নেই। প্রোটিন ও খাদ্য আঁশ তৃপ্তিতে ভূমিকা রাখলেও এর প্রভাব ব্যক্তি ও খাবারের ধরন অনুযায়ী বদলাতে পারে।

FAQ

প্রশ্ন: সকালে কী খেলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকতে পারে?

উত্তর: ডিম, ওটস, টক দই, ছোলা, বাদাম, গোটা ফল ও পূর্ণ শস্যের মতো প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।

প্রশ্ন: ওটস কি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে?

উত্তর: ওটসে খাদ্য আঁশ, বিশেষ করে বিটা-গ্লুকান থাকে। গবেষণায় ওটসসহ কিছু cereal fiber-এর সঙ্গে তৃপ্তি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

প্রশ্ন: সকালের নাস্তায় ডিম খেলে কি বেশি সময় ক্ষুধা কম থাকে?

উত্তর: ডিমের প্রোটিন তৃপ্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কতক্ষণ ক্ষুধা থাকবে তা ব্যক্তিভেদে এবং পুরো নাস্তাটির গঠন ও পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।

প্রশ্ন: শুধু ফল খেয়ে সকালের নাস্তা করা কি ভালো?

উত্তর: ফল পুষ্টিকর হলেও শুধু ফলের বদলে এর সঙ্গে ডিম, টক দই, বাদাম বা অন্য কোনো প্রোটিনের উৎস রাখলে নাস্তাটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।

প্রশ্ন: বেশি প্রোটিন খেলেই কি সারাদিন ক্ষুধা কম থাকবে?

উত্তর: এমন নিশ্চয়তা নেই। গবেষণায় প্রোটিনের স্বল্পমেয়াদি তৃপ্তিবর্ধক প্রভাব পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল সব গবেষণায় একই নয়।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ